শতবর্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আবাসিক সমস্যার পাশাপাশি বড় একটি সমস্যা হচ্ছে ‘গেস্টরুম সংস্কৃতি’। বিশ^বিদ্যালয়ের প্রতিটি হলেই অতিথিদের জন্য রয়েছে অতিথি কক্ষ বা গেস্টরুম। কিন্তু অতিথি থাকার পরিবর্তে এখন শিক্ষার্থী নির্যাতনকেন্দ্র হিসেবেই বেশি পরিচিত এসব গেস্টরুম রাত হলেই আতঙ্ক হয়ে ওঠে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে। সম্প্রতি গেস্টরুমে নিয়ে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের ঢাবির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, হলগুলোতে দুধরনের ‘গেস্টরুম’ কার্যক্রম চালু রয়েছে। ‘ফর্মাল’ ও ‘মিনি’। হলভেদে সপ্তাহে পাঁচ থেকে ছয় দিন মিনি এবং দুই থেকে তিন দিন ফর্মাল গেস্টরুম হয়ে থাকে। মিনি গেস্টরুমে হলের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ডাকা হয়। সেখানে তাদের তথাকথিত ‘ম্যানার’ ও ছাত্রলীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক সেøাগান শেখায় ওই হলেরই দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা। শেখানো ম্যানারের ব্যত্যয় ঘটলে পরবর্তী সময়ে আবার গেস্টরুমে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। চলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। ফর্মাল গেস্টরুমেও প্রথমে নবীন শিক্ষার্থীদের ডাকা হয়। তারপর ইমিডিয়েট সিনিয়ররা এসে তাদের সারাদিনের কর্মকাণ্ড, বিভিন্ন রাজনৈতিক সেøাগান, রাজনৈতিক নেতাদের নাম ইত্যাদি জানতে চান। উত্তরে কোনো ভুল পেলে নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয় শিক্ষার্থীদের। ইমিডিয়েট সিনিয়রদের পর গেস্টরুমে পর্যায়ক্রমে আসেন অন্যান্য বর্ষের সিনিয়ররা। সবশেষে আসেন হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক। তারা এসে পরের দিন বা পরের ফর্মাল গেস্টরুম পর্যন্ত কোন কোন কর্মসূচিতে যেতে হবে সেসব নির্দেশনা দেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বর্তমানে হলগুলোতে ছাত্রলীগের দুটো গ্রুপ রয়েছে। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের গ্রুপ। দুটো গ্রুপেই পৃথকভাবে ‘গেস্টরুম’ কার্যক্রম চলে। ফর্মাল গেস্টরুমে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক আসার দিন গান গাওয়া হয়, ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ ইত্যাদি বই পাঠ করে আলোচনা করা হয়। এদিন কার্যক্রমের ছবি তুলে প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে শেয়ার করতে বলা হয়। শেয়ার করা পোস্টে এমনভাবে ক্যাপশন লিখতে নির্দেশ দেওয়া হয় যেন গেস্টরুম সংস্কৃতিকে ‘গুজব’ মনে হয়।
এ বিষয়ে জগন্নাথ হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, হলে ফর্মাল গেস্টরুমে প্রথমে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের হিসাব নেন দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা। তারপর পালা করে একেকটা বর্ষ হিসাব নেন। একই প্রক্রিয়ায় মিনি গেস্টরুমেও শিক্ষার্থীদের হিসাব-নিকাশপর্ব চলে। ভুলত্রুটি হলে ঝাড়িটাড়ি দেন। এ ছাড়া সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক যেদিন আসেন সেদিন উপাসনালয়ে নিয়ে যাওয়া হয় সবাইকে। সেখানে বঙ্গবন্ধুর জীবনী, লেখা পড়ানো ও আলোচনা করা হয়। এই আলোচনাচক্রকেই পরে ফেসবুকে পোস্ট দিতে বলা হয়।
এদিকে গত বছরের ৫ অক্টোবর করোনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল খোলা থেকে এখন পর্যন্ত গেস্টরুমে ও ছাত্রলীগের কর্মীদের দ্বারা প্রায় ২০ জনের বেশি শিক্ষার্থী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ গত ১০ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু হলে আবু তালিব নামে এক শিক্ষার্থী নির্যাতনের শিকার হন। তিনি নির্যাতনের বিষয়ে জানাতে ১১ মার্চ রাতে ঢাবি সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন।
ঘটনার বর্ণনা দেওয়ার সময় আবু তালিব বলেন, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর আমাকে মিনি গেস্টরুম ডাকা হয়। এক পর্যায়ে সামান্য একটা ভুলের কারণে আমাকে হাতে না ধরে সিগারেট খেতে বলে। আমি খেতে না চাইলে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। যদি সিগারেট না খাই তা হলে রুমের ভেতর বসিয়ে রেখে সিগারেট খাওয়ানোর থ্রেট দেয়। বাধ্য হয়ে সিগারেট খেতে গিয়ে হাতে ধরতে চাইলে স্ট্যাম্প দিয়ে হাতে আঘাত করে। জোর করে সিগারেট খাওয়ানোর পাশাপাশি আমার শারীরিক গঠন ও হাঁটাচলা নিয়ে মাদকাসক্ত হিসেবে দোষারোপ এবং বকাবকি করে। এক পর্যায়ে সিগারেটের ধোঁয়ার কারণে আমার নিশ^াস নিতেও কষ্ট হয়।
এর আগে গত ২৬ জানুয়ারি রাতে বিজয় একাত্তর হলের শিক্ষার্থী আখতারুল ইসলামকে গেস্টরুমে ছাত্রলীগের কর্মীদের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। ওই রাতে অন্যরা গেস্টরুমে এলেও অসুস্থ থাকায় আখতার গেস্টরুমে আসেননি। পরে তাকে ডেকে এনে গেস্টরুমে না আসার শাস্তিস্বরূপ জ্বলন্ত লাইটের দিকে আধা ঘণ্টা তাকিয়ে থাকতে বলা হয়। ১০ মিনিট তাকিয়ে থাকার পর তিনি আরও অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ব্যাচমেটের সাহায্যে গণরুমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে আখতার অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাকে ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়। সেখানে ইসিজি, কোভিড টেস্ট ও প্রাথমিক চিকিৎসার পর চিকিৎসক তাকে হলে পাঠিয়ে দেন। এ ঘটনায় ২ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের তিন কর্মীকে হল থেকে ৬ মাসের জন্য বহিষ্কার করা হয়। এ ছাড়া গত ১৫ ফেব্রুয়ারি স্যার এএফ রহমান হলের গেস্টরুমে মোল্লা তৈমুর নামে এক শিক্ষার্থীকে শারীরিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে ওই হলেরই ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী রোকনুজ্জামানের বিরুদ্ধে। তিনি হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মুনেম শাহরিয়ার মুনের অনুসারী। হলের মাঠে তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলায় তাকে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী। নির্যাতনের বিষয়ে হল প্রাধ্যক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করলেও পরে হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মুনেম শাহরিয়ার মুনের মধ্যস্থতায় অভিযোগ তুলে নেন বলে জানান মোল্লা তৈমুর। একই হলে ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে রিফাত হোসাইন নামে এক শিক্ষার্থীকে নির্যাতন করা হয়।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ১৬ ফেব্রুয়ারি সকালে স্যার এএফ রহমান হল ছাত্রলীগের মধুর ক্যান্টিনের ‘রাজনৈতিক প্রোগ্রাম’ শেষ হওয়ার পর প্রথম বর্ষের ২০ জন ছাত্রকে ১০ টাকার বাদাম কিনে দেওয়া হয়। রিফাত এতে কোনো বাদাম না পাওয়ায় দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে বলেন, ‘ভাই আমি বাদাম পাইনি, বাদাম শেষ।’ এ কথা বলায় ওইদিন রাতেই তাকে গেস্টরুমে নির্যাতন করা হয়।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ১৮টি হলের মধ্যে ছাত্রীদের পাঁচটি হল এবং ছাত্রদের ফজলুল হক মুসলিম হল, শহীদুল্লাহ হল ও অমর একুশে হলে গেস্টরুম নির্যাতন তুলনামূলক কম হয়। তবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, বিজয় একাত্তর হল, স্যার এএফ রহমান হল, জগন্নাথ হলে বেশি গেস্টরুম করানো হয়।
সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা বলছেন, ছাত্রলীগ জোরপূর্বক তাদের সংগঠনে কর্মী তৈরি করতে এবং ক্যাম্পাসে দখলদারিত্ব বজায় রাখতে গেস্টরুম সংস্কৃতি চালু রেখেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাজী মুহম্মদ মহসীন হলের দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, জোর করে আমাদের রাজনৈতিক প্রোগ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। কোনো কারণে প্রোগ্রামে না গেলে গেস্টরুমে এর জন্য জবাবদিহি করতে হয়। উত্তর তাদের মনমতো না হলে চলে নির্যাতন।
গেস্টরুমের বিষয়ে ঢাবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিব সময়ের আলোকে বলেন, ছাত্রলীগে কেউ যোগ দিতে চায় না। মূলত এ কারণেই গেস্টরুম সংস্কৃতির মাধ্যমে ছাত্রলীগ তাদের ব্যানারে শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক রাজনীতি করতে বাধ্য করে। সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের (মার্কসবাদী) ঢাবি শাখার সভাপতি সালমান সিদ্দিকী বলেন, আবাসিক হলগুলোতে দখলদারিত্ব বজায় রাখতে শিক্ষার্থীদের বাকস্বাধীনতা হরণ করে গেস্টরুম সংস্কৃতি চালু রেখেছে ছাত্রলীগ। বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন ঢাবি শাখার সদস্য উমামা ফাতেমা বলেন, গেস্টরুমের মাধ্যমে ছাত্রলীগ এমনভাবে নবীন শিক্ষার্থীদের ব্রেনওয়াশ করে যে, পরবর্তী বছরে এরাই আবার নবীন শিক্ষার্থীদের গেস্টরুমে নির্যাতন করে। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক আদনান আজিজ চৌধুরী বলেন, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ট্রেনিং দেওয়া হয় গেস্টরুমের মাধ্যমে। গেস্টরুমে মূলত দুধরনের শ্রেণি তৈরি হয়। যারা গেস্টরুম কার্যক্রম পরিচালনা করে তারা শাসক আর যাদের গেস্টরুম করানো হয় তারা শোষক। গেস্টরুমে শোষকদের শেখানো হয় তোমরা এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একদিন শাসকের আসনে আসতে পারবে।
এ বিষয়ে ঢাবি শাখা হল ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের দাবি, গেস্টরুমে যে ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে তা সঠিক নয়। এখানে পরিচিতিমূলক কথা, বিশ্ববিদ্যালয়ে কীভাবে চলবেÑ এসব বিষয় এবং বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা ইত্যাদি বই পাঠ করে সবার সঙ্গে আলোচনা করা হয়।
গেস্টরুম বিষয়ে ঢাবি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে আরেকজন শিক্ষার্থীর কোনো অসম্মানজনক আচরণ ঘটলে আমরা সংশ্লিষ্ট হল প্রশাসনকে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাই। আর বাংলাদেশ ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা আছে, আমরা হলে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকব, তাদের যেকোনো সমস্যায় আমরা রাজনৈতিকভাবে সহায়তা করব। আমাদের সব কর্মীর প্রতি নির্দেশনা রয়েছে, যেন সব শিক্ষার্থীকে সম্মান এবং তার ব্যক্তিত্ব বিকাশ ও স্বাধীনভাবে বিশ^বিদ্যালয় জীবন শেষ করতে সহায়তা করা হয়। এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে কোনো কর্মী কোনো কর্মকাণ্ড করে থাকলে তার বিরুদ্ধে আমরা সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেব।
ঢাবি প্রক্টর অধ্যাপক ড. একেএম গোলাম রব্বানী এ প্রসঙ্গে সময়ের আলোকে বলেন, গেস্টরুমগুলোতে যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে সেজন্য নজরদারি বাড়াতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে বলা হয়েছে হল প্রশাসনকে। পাশাপাশি যে উদ্দেশ্যে গেস্টরুম তৈরি তার বাস্তবায়ন নিশ্চিতে হল প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।