ব্যবসার প্রধান বাধা দুর্নীতিবাংলাদেশে ব্যবসার প্রধান বাধা দুর্নীতি। এ ছাড়া অদক্ষ আমলাতন্ত্র ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ব্যবসার পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে। তবে বিগত সময়ের চেয়ে অবকাঠামো, ঋণসহায়তা প্রাপ্তি এবং অস্থায়ী নীতি সহায়তায় বিষয়ে সামান্য কিছু উন্নতি হয়েছে।
বুধবার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যবসায় পরিবেশ ২০২৩ : উদ্যোক্তা জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ধানমন্ডিতে সংস্থাটির নিজস্ব কার্যালয়ে প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
জরিপের ফলে জানানো হয়, শতভাগ বড় ব্যবসায়ীর জন্য প্রধান সমস্যা দুর্নীতি, মাঝারি ৬১ শতাংশ ব্যবসায়ী দুর্নীতিকে সমস্যা মনে করছেন এবং ৫৬ শতাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী দুর্নীতিকে সমস্যা বলে চিহ্নিত করেছেন। আবার ছোট ছোট সরকারি সেবার ক্ষেত্রে ৮৫ শতাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমস্যায় পড়েন, যেখানে বড় ব্যবসায়ীদের সমস্যা এসব ক্ষেত্রে কিছুটা কম।
অন্যদিকে গত বছর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে অস্থিতিশীলতা বড় ব্যবসায়ীদের বেশি প্রভাবিত করেছে। ৬২ শতাংশ বড় ব্যবসায়ীর জন্য এ বিষয়টি প্রতিবন্ধকতা ছিল, যেখানে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে ছিল ৩৮ শতাংশ। রিজার্ভের কারণে বড় ব্যবসায়ীরা এলসি খুলতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছে এ সময়।
ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের সেবা, শিল্প, কৃষি এবং উৎপাদন খাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৭১ জন গত বছরের এপ্রিল থেকে জুলাইয়ে করা এ মতামত জরিপে অংশ নেন। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সহায়তায় এ জরিপ করা হয়। এ ছাড়া ডব্লিউইএফের ফিউচার অব গ্রোথ রিপোর্ট ২০২৩-এর বাংলাদেশ অংশের জন্য সিপিডি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আমাদের ব্যবসায়ীদের চ্যালেঞ্জগুলো কিন্তু পরিবর্তন হচ্ছে। আগে যেমন ঋণপ্রাপ্তি অবকাঠামোর মতো বিষয় নিয়ে তাদের অধিক চিন্তিত থাকতে হতো এখন তাদের বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতি, রিজার্ভ পরিস্থিতি নিয়ে ভাবতে হয়। এতে কিছু ব্যবসায়ীর সক্ষমতাও বেড়েছে, তবে মোটাদাগে বেশিরভাগ ব্যবসায়ীই সমস্যার মধ্যে পড়েন।
তিনি বলেন, তবে দুর্নীতিসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধকতাগুলোর কারণে সার্বিকভাবে কিন্তু আমাদের গত বছরের উৎপাদন, তার আগের বছরের উৎপাদনের তুলনায় অনেকটা কমেছে। গত বছর ব্যবসায়ীরা ভালো করেছেন, এমন সংখ্যা খুবই কম। ডলার সংকটে অনেকে কাঁচামাল কিনতে পারেননি। অনেকে আমদানি করতে পারেননি, বাজারে সরবরাহ করতে পারেননি। ৭১ জন বড় ব্যবসায়ীর মধ্যে ছোট ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ২৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ, মাঝারি ব্যবসায়ী ৩৫ দশমিক ২১ ও বড় ব্যবসায়ী ৩৫ দশমিক ২১ শতাংশ।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক শীর্ষ পর্যায়ে সদিচ্ছার প্রতিফলন আছে। নির্বাচনি ইশতেহারেও অঙ্গীকার করা হয়েছে। এর বাস্তবায়ন দরকার।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ তলানিতে আছে।ভিয়েতনাম, ভারত, ইন্দোনেশিয়া এবং থাইল্যান্ডসহ এশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায়ও বেশ পিছিয়ে আছে দেশটি। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশের সূচক ভালো বলা যাবে না।
ব্যবসায় আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে জরিপে বলা হয়েছে, ৬৬ দশমিক ২০ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করছেন আগামী দুই বছর জ্বালানি সংকটে ভুগবেন ব্যবসায়ীরা।
এ ছাড়া ৫৮ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন ব্যাংকিং খাতে নজরদারি ও তদারকির অভাব রয়েছে। ৫০ শতাংশ ব্যবসায়ী বলছেন, ডলার সংকটের কারণে তারা পণ্য আমদানি করতে পারছেন না। মোয়াজ্জেম বলেন, আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা বারবার বললেও সেটা যথাযথভাবে আমলে নেয়নি সরকার।
বৈশ্বিকভাবেই জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। সেখানে এলএনজি আমদানি বড় সংকট তৈরি করেছে। আমরা মনে করি সরকারের উচিত জ্বালানি সংকট নিরসনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রাধান্য দেওয়া।
ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশের উন্নতি করতে সিপিডি ১০টি সুপারিশ করেছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশের উন্নতিতে বিভিন্ন সরকারি কার্যালরে ১০০ দিন, ১ বছর, ৩ বছর ও ৫ বছরের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন; ন্যায়পাল কার্যালয় স্থাপন; সীমিত সময়ের জন্য খাতভিত্তিক কিছু কমিশন গঠন, যেমন ব্যাংক, শেয়ারবাজার, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার; একটি সমন্বিত আর্থিক লেনদেন খাত প্রতিষ্ঠা এবং সরকারি কেনাকাটা ব্যবস্থা আধুনিক করা ইত্যাদি।
সময়ের আলো/আরএস/