সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা আটকে আছে প্রতিবন্ধকতায়

এসএম আলমগীর, কক্সবাজার থেকে ফিরে

অর্থনীতি

আগামীর অর্থনীতি অনেকটাই ব্লু ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল হবে। কারণ এ খাতে আসবে প্রচুর বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান হবে লাখ

2024-01-21T03:20:24+00:00
2024-01-21T03:20:24+00:00
 
  রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬,
৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
অর্থনীতি
সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা আটকে আছে প্রতিবন্ধকতায়
এসএম আলমগীর, কক্সবাজার থেকে ফিরে
প্রকাশ: রোববার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৪, ৩:২০ এএম   (ভিজিট : ১৭৪২)
সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা আটকে আছে প্রতিবন্ধকতায়
আগামীর অর্থনীতি অনেকটাই ব্লু ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল হবে। কারণ এ খাতে আসবে প্রচুর বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান হবে লাখ লাখ মানুষের। তাই সুনীল অর্থনীতি এখন বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনাময় একটি খাত। সমুদ্র থেকে আহরণ করা সম্পদ, যা অর্থনীতিতে যুক্ত হয়ে সমৃদ্ধ হতে পারে বাংলাদেশ। তবে এ সম্ভাবনার সুফল মিলছে না নানা রকম প্রতিবন্ধকতার কারণে। সেই সঙ্গে এ খাতে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ও গবেষণা না থাকায় সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজেও লাগানো যাচ্ছে না। সুতরাং এ বিষয়ে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা দূর করা দরকার বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

জানা যায়, জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ২০১২ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে মোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকায় বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। সমুদ্র বিজয়ের ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ সুনীল প্রবৃদ্ধির অপার সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র ব্লু ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতির যুগে প্রবেশ করে। এরপরই বাংলাদেশ সরকার সুনীল অর্থনীতি নিয়ে জোর তৎপরতা শুরু করে।

এই সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা ও পারিপাশির্^ক চিত্র সরেজমিনে দেখার উদ্যোগ নেয় অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য বিটের সাংবাদিকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)। গত মঙ্গলবার কক্সবাজারের একটি হোটেলে সুনীল অর্থনীতির ওপর একটি কর্মশালাও অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালায় ইআরএফ নেতারা ছাড়াও বিশেষজ্ঞরা এ খাতের সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতার নানা দিক নিয়ে কথা বলেন।  কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাইকার বিশেষজ্ঞ মো. শফিকুর ইসলাম। উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ইআরএফ সভাপতি রেফায়েতুল্লাহ মীরধা এবং সঞ্চালনা করেন ইআরএফের সহ-সাধারণ সম্পাদক মিজামুর রহমান।

পরিবেশগত সমস্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশেষজ্ঞরা সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে এবং পর্যটকদের প্লাস্টিক উপাদান ও অন্যান্য বর্জ্য নিক্ষেপ থেকে বিরত রাখার জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এবং আইন প্রণয়নের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করতে হবে।

সমুদ্র সম্পদের সম্ভাবনার বর্ণনা দিয়ে প্রধান বক্তা বলেন, ব্লু ইকোনমি সম্ভাবনাকে বাস্তবে কাজে লাগানোর জন্য একটি ব্যাপক পরিকল্পনা এবং এর কঠোর বাস্তবায়ন আবশ্যক। সামুদ্রিক মাছ সংরক্ষণ, তাজা ও বিষমুক্ত রাখতে জাইকাকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। 

বক্তারা বলেন, মালয়েশিয়া থেকে মিন অনুসন্ধানী জাহাজ এলে আমাদের সমুদ্রে কী পরিমাণ মৎস্যসম্পদ আছে তা জরিপ করা সম্ভব হবে। সমুদ্র অর্থনীতিকে কার্যকর ও ফলপ্রসূ করতে হলে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সরকারের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। অথচ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে ব্লু ইকোনমির মাধ্যমে ২০৩০ সাল নাগাদ আড়াই বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে। তবে এ জন্য দরকার ব্লু ইকোনমি নিয়ে ইতিমধ্যে প্রণীত নীতিগত সিদ্ধান্ত ও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা দূর করা।

সম্ভাবনা কাজে লাগাতে চিহ্নিত করা হয়েছে বেশকিছু খাত : ইতিমধ্যে সরকার ব্লু ইকোনমি সেল গঠন করেছে। সেই সেল ব্লু ইকোনমির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ, দফতর ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করে সমন্বয় সাধন করছে। মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দফতরের সমন্বয়ে বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও সর্বোচ্চ ব্যবহারের লক্ষ্যে বেশকিছু খাত চিহ্নিত করা হয়েছে। খাতগুলো হলো- জ্বালানি শক্তি (তেল ও গ্যাস), খনিজসম্পদ, সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ, মেরিকালচার, পর্যটন এবং বিনোদন, শিপিং, সামুদ্রিক পরিবহন এবং বাণিজ্য, জাহাজ নির্মাণ, শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ, খাদ্য নিরাপত্তা, খাদ্য এবং জীবিকা, নবায়নযোগ্য সামুদ্রিক শক্তি, মেরিন বায়োটেকনোলজি, সাবমেরিন মাইনিং, উপকূলীয় শিপিং বা ফিডার পরিষেবা, অভ্যন্তরীণ জলপথ পরিবহন, নীল শক্তি (অসমোসিস) এবং বায়োমাস, সামুদ্রিক খনিজ মাইনিং, 
কৃত্রিম দ্বীপপুঞ্জ, গ্রিনিং কোস্টাল বেল্ট, সামুদ্রিক নিরাপত্তা নজরদারি এবং সমন্বিত সামুদ্রিক স্থানিক পরিকল্পনা। এই খাতগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিহ্নিত করা হয়েছে।

শুধু তা-ই নয়, সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা দফতর কর্তৃক স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রায় চার শতাধিক কার্যক্রম বা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তা ছাড়া সুনীল অর্থনীতির যথাযথ বিকাশের লক্ষ্যে ব্লু ইকোনমি সেল কর্তৃক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ কয়েকটি হলো- বাংলাদেশের ব্লু ইকোনমির টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে আঞ্চলিক ও বৈশি^ক সহযোগিতা স্থাপন, ব্লু ইকোনমি সেলের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও একাডেমির আন্তযোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈদেশিক ও বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার মাধ্যমে ব্লু ইকোনমি সেক্টরের পরিধি বৃদ্ধি করা, বঙ্গবন্ধু সুনীল অর্থনীতি ফান্ড গঠনের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ব্লু ইকোনমি গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করা।

সমুদ্র সম্পদ ও সম্ভাবনা : আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে মোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি সমুদ্র এলাকার পাশাপাশি ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল ও চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৪৫ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে সব ধরনের প্রাণিজ-অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার নিশ্চিত হয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রে বিরোধপূর্ণ ১৭টি ব্লকের ১২টি পেয়েছে বাংলাদেশ এবং ভারতের কাছে দাবি করা ১০টি ব্লকের সবই পেয়েছে বাংলাদেশ। এসব ব্লক থেকে প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া সম্ভব। দুই বছরের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল প্রদত্ত এ রায় দুটি বাংলাদেশের জন্য ‘সমুদ্র বিজয়’ নামে আখ্যায়িত হয়েছে।

এসব সম্পদ আহরণের লক্ষ্যে ও ব্লু ইকোনমি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে পাইলট কান্ট্রি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সেভ আওয়ার সি-এর দেওয়া তথ্যে জানা যায়, বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে প্রতি বছর ৮ মিলিয়ন টন মাছ ধরা পড়ে। এর মধ্যে শূন্য দশমিক ৭  মিলিয়ন টন মাছ বাংলাদেশের মৎস্যজীবীরা আহরণ করে। বঙ্গোপসাগরে ৪৭৫ প্রজাতির মাছ, ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি মাছ, ২০ প্রজাতির কাঁকড়া, ৩৩৬ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক এবং বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক ও জৈব গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের ৫ লক্ষাধিক জেলে প্রায় ৭০ হাজার যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক নৌযানের সহায়তায় জীবিকা নির্বাহের সঙ্গে সঙ্গে মৎস্য উৎপাদনে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। বঙ্গোপসাগর থেকে প্রতি বছর প্রায় ৮ মিলিয়ন টন মাছ ধরা হলেও আমরা মাত্র শূন্য দশমিক ৭ মিলিয়ন টন মাছ ধরতে পারছি। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারলে আমাদের মাছ আহরণ আরও বাড়বে।

সময়ের আলো/আরএস/



Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: