রোজার আগে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে তোড়জোড় শুরু করেছে সরকার। বেশ কিছু নিত্যপণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার ঘোষণা আগেই দেওয়া হয়েছিল। তার আলোকে গত এক সপ্তাহ ধরে পাঁচ মন্ত্রণালয় এবং এর অধিভুক্ত বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কাজ করেছেন। সব দিক বিবেচনা করে আজ ঘোষণা দেওয়া হবে বেশ কিছু ভোগ্যপণ্যের নতুন দাম। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আজ অভ্যন্তরীণ কৃষিপণ্য ও আমদানিকৃত পণ্য মিলে অর্ধশতাধিক পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হতে পারে। সেই হিসেবে আজ থেকে ভোজ্য তেল, চিনি, আলু-পেঁয়াজ, গরু-ছাগলের মাংসসহ অনেক পণ্যের নতুন মূল্য ঘোষণা করা হবে।
জানা গেছে, আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য নির্ধারণের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ট্যারিফ কমিশন, অভ্যন্তরীণ কৃষিপণ্য উৎপাদনে কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি বিপণন অধিদফতর, চাল-আটার মূল্য নির্ধারণে খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং গরু-ছাগলের মাংস ও দুধের দাম নির্ধারণে কাজ করেছে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও প্রাণিসম্পদ অধিদফতর। এর মধ্যে ট্যারিফ কমিশন আমদানিকৃত ৮ থেকে ১০টি পণ্যের মূল্য প্রস্তাব দেবে, কৃষি বিপণন অধিদফতর দেবে ৩০টির মতো অভ্যন্তরীণ পণ্যের, প্রাণিসম্পদ অধিদফতর ৫ থেকে ৬টি এবং খাদ্য মন্ত্রণালয় ৩টির মতো পণ্যের মূল্য প্রস্তাব দিতে পারে। সব মিলিয়ে অর্ধশতাধিক পণ্যের মূল্য প্রস্তাব আজকের বৈঠকে দেওয়া হতে পারে।
বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু গতকাল সময়ের আলোকে বলেন, মঙ্গলবার আমরা সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও দফতরের সঙ্গে বসব। পরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও আলোচনা করব। সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে তবেই পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হবে। সবাই যদি একমত হয়, তবেই বৈঠকে মূল্য ঘোষণা করা হবে। যদি একমত না হওয়া যায় তা হলে হয়তো আরেকদিন বসার দরকার হতে পারে। আসলে আমরা এমন মূল্য নির্ধারণ করব, যাতে ব্যবসায়ী-ভোক্তা সবার জন্যই সুবিধা হয়। সবার মত নিয়ে ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করলেই তো আর হবে না, ঘোষিত মূল্য যাতে বাস্তবায়ন করা যায়- এমন মূল্যই বেঁধে দেওয়া হবে।
বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী সময়ের আলোকে আরও বলেন, মঙ্গলবারের টাস্কফোর্সের সভায় আমরা শুধু মূল্য নির্ধারণের বিষয়েই কথা বলব না, রোজার আগের বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করব। আইনশৃক্সক্ষলা পরিস্থিতি, পণ্যবাহী গাড়িতে চাঁদাবাজি বন্ধ করা, শুল্কসংক্রান্ত বিষয়, আমদানি পরিস্থিতি, পণ্যের মজুদ পরিস্থিতি- এ রকম অনেক বিষয়েই আমরা আলোচনা করব। আলোচনায় যদি মূল্যের বিষয়ে একমত হওয়া যায় তা হলে বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে মূল্য ঘোষণা করব।
জানা গেছে, আমদানি শুল্ক কমায় এবং বিশ্ব বাজারে দাম কমায় দেশের বাজারে ভোজ্য তেলে লিটারপ্রতি দাম কমতে পারে ৭-৮ টাকা। এতে করে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিনের মূল্য হবে ১৬১ থেকে ১৬২ টাকা। বর্তমানে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ১৬৯ টাকা। প্রতি কেজি গরুর মাংসের মূল্য হতে পারে ৭০০, আলু ২৮-৩০ এবং পেঁয়াজ ৫৫-৬০ টাকা। তবে চিনির দাম কমবে সামান্য। চিনিতে যেটুকু শুল্ক কমান হয়েছে তাতে কেজিপ্রতি দাম কমতে পারে ৫০ পয়সা থেকে ৭৫ পয়সার মতো।
মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে কৃষি বিপণন অধিদফতরের সহকারী পরিচালক (বাজার সংযোগ-১) প্রণব কুমার সাহা গতকাল সোমবার সময়ের আলোকে বলেন, আমরা ৩০টির মতো অভ্যন্তরীণ উৎপাদিত কৃষিপণ্যের মূল্য প্রস্তাব দেব টাস্কফোর্সের বৈঠকে। এ ছাড়া মূল্যের প্রস্তাব হবে তিন স্তরে- উৎপাদক, পাইকারি ও খুচরা। প্রত্যেক পর্যায়ে পণ্যভেদে সর্বনিম্ন ১ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশ ধরেই আমরা মূল্য প্রস্তাব জমা দেব। এ ছাড়া মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে পণ্যের উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন ব্যয়, খাবারের ব্যয়, শ্রমিকের মজুরি, আড়ত পর্যায়ের খরচ- এসবও বিবেচনায় আনা হচ্ছে। তবে কোনটির মূল্য কত হবে, তা টাস্কাফোর্সের বৈঠকে আলোচনার পরই চূড়ান্ত হবে।
এদিকে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের পরিচালক (উৎপাদন) ড. এবিএম খালেদুজ্জামান বলেন, আমরা মূলত মূল্য নির্ধারণ করব গরু, খাসি, ছাগল, ভেড়া, ছেলা ব্রয়লার মুরগির মাংসের এবং ফার্মের ডিম ও পাস্তুরিত দুধের। বিগত কয়েক দিন ধরে আমরা এসব নিয়ে কাজ করছি। প্রস্তাব চূড়ান্ত করে মঙ্গলবারের বৈঠকে জমা দেব।
এবার বাজার মনিটরিং ব্যবস্থাও বেশ জোরদার করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। বাজারে ভোক্তা অধিদফতর নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। এ ছাড়া সরকারের আরও কিছু সংস্থাও কাজ করছে। তবে শুধু বাজার মনিটরিং করে মূল্যবৃদ্ধি বা বাজার সিন্ডিকেট ঠেকানো যায় না। সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, ঢাকা এবং সারা দেশের সব পর্যায়ের ভোক্তাকে সেবা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জনবল নেই। এ জন্য সরকার ‘৩৩৩’ নম্বরের একটি হটলাইন চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ভোক্তারা বাজারে গিয়ে পণ্য কেনার সময় যদি কোনো বিক্রেতা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি রাখেন, তখন ‘৩৩৩’ নম্বরে কল করলে অল্প সময়ের মধ্যে সেখানে ভোক্তা অধিদফতরের টিম যাবে। এভাবে বাজার ব্যবস্থাপনা ঠিক করতে চাচ্ছে সরকার। জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও এ বিষয়ে কাজ করবেন। এভাবে একটি স্মার্ট বাজার ব্যবস্থাপনা স্থাপন করার লক্ষ্য সরকারের।
সময়ের আলো/জেডআই