আনুষ্ঠানিকভাবে মার্জার বা একীভূত হওয়ার কার্যক্রম শুরু করেছে পদ্মা ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক। এ লক্ষ্যে সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকে একীভূত হওয়ার বিষয়ে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে পদ্মা ও এক্সিম ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তবে কবে নাগাদ একীভূত চূড়ান্ত হবে, পদ্মা ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানত ঝুঁকিতে পড়বে কি না, পদ্মা ব্যাংকের কর্মীদের চাকরি থাকবে কি না, ঋণ গ্রহীতাদেরও কোনো ঝামেলাই পড়তে হবে কি না এবং যাদের কারণে ডুবল পদ্মা ব্যাংক তাদের কোনো শাস্তি হবে কি না, এমন অনেক প্রশ্ন উঠছে।
যদিও চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের পর এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার এসব প্রশ্নের অনেকগুলোরই জবাব দিয়েছেন। তবুও অর্থনীতিবিদ, সাবেক ব্যাংকার এবং কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যতটা সহজে বলা হচ্ছে কোনো জটিলতা হবে না আসলে বিষয়টি তত সহজ নয়। দুই ব্যাংক একীভূত হওয়ার জন্য চুক্তি করলেও চূড়ান্তভাবে একীভূত হতে কমপক্ষে ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। আবার এক্সিম ব্যাংক পদ্মা ব্যাংকের সব দায়দেনা কাঁধে নিলেও যদি এক্সিম ব্যাংকের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকে তা হলে পদ্মা ব্যাংকের সব গ্রাহকের টাকা ফেরত পাওয়াও কঠিন হবে। এ রকম নানাবিধ জটিলতা দেখা দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এদিকে দুর্বল পদ্মা ব্যাংক একীভূত করা হলেই যে সফলতা আসবে সে নিশ্চয়তাও নেই বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও সাবেক ব্যাংকাররা। তাদের যুক্তি, ১৪ বছর আগে দেশে দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক একীভূত হয়ে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল) নামে পথচলা শুরু করলেও ব্যাংকটি এখনও সফল হতে পারেনি, বরং নানা সংকটে ধুঁকছে। তাই দুর্বল ব্যাংক একীভূত করা মানেই সংকট সমাধান নয়, বরং পদ্মা ব্যাংকের মতো দুর্বল ব্যাংকে একীভূত করে ব্যাংকটি থেকে অর্থ লোপাট করে যারা ডুবিয়েছে তাদের দায়মুক্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নই রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও কোম্পানি আইনবিশারদ ব্যারিস্টার এএম মাসুম সময়ের আলোকে বলেন, ‘যদিও বলা হচ্ছে পদ্মা ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানত নিয়ে কোনো ঝুঁকি নেই বা ব্যাংকটির কর্মীদের চাকরিও যাবে না। আমিও প্রত্যাশা করি, তেমনটি যেন না হয়। তারপও একটি ‘কিন্তু’ রয়ে যায়। প্রথমত পদ্মা ব্যাংককে এক্সিম ব্যাংক একীভূত করার মধ্য দিয়ে ওই ব্যাংকের সব দায়দেনা এক্সিম ব্যাংকের কাঁধে বর্তাবে। যদি পদ্মা ব্যাংকের কোনো গ্রাহক মনে করেন তার আমানত তুলে নেবেন, তা হলে এক্সিম ব্যাংককে তা দিতে হবে। কিন্তু কথা হচ্ছে এক্সিম ব্যাংক কি পদ্মা ব্যাংকের সব গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে পারবে। সব গ্রাহকের অর্থ ফেরত দেওয়ার মতো টাকা যদি এক্সিম ব্যাংকের কাছে না থাকে তা হলে তো সবাই টাকা ফেরত পাবে না। আবার সব কর্মীর যে চাকরি থাকবে তারও নিশ্চয়তা নেই। কারণ একীভূত হওয়ার পর পদ্মা ব্যাংকের যে ৬০টি ব্রাঞ্চ রয়েছে তার সব নাও রাখা হতে পারে। কাজেই যেসব ব্রাঞ্চ বন্ধ হবে সেখানকার কর্মীদের চাকরি চলে যেতে পারে। তবে চূড়ান্তভাবে একীভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যে চাকরি চলে যাবে বিষয়টি তেমন নয়, বছর তিনেক সময় দেওয়া হতে পারে।’
দুই ব্যাংকের চূড়ান্ত একীভূত কত দিনের মধ্যে হবে সেটিও নির্ভর করছে মূলত এক্সিম ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বা এ ব্যাংকের শীর্ষ কর্তাদের মর্জির ওপর। কারণ একীভূত হওয়ার জন্য তারা সবে চুক্তি করল। এরপর একীভূত হওয়ার জন্য হাইকোর্টে আবেদন করতে হবে। হাইকোর্ট যতদিন চূড়ান্ত রায় না দেবে ততদিন একীভূত হওয়া যাবে না। এ ছাড়া পদ্মা ব্যাংকের দায়দেনা, সম্পদ, খেলাপি ঋণ এবং যারা ব্যাংকটিকে ডুবিয়েছেন তারা কত টাকা লোপাট করেছেন, তার সঠিক চিত্র তুলে আনতে সার্বিক অডিট করতে হবে। এটিও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।’
তিন সংস্থার সমন্বয়ে একীভূত হবে ব্যাংক : সোমবারের চুক্তির পর সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, কোনো ব্যাংক অন্য ব্যাংকে মার্জার (একীভূত) করতে হলে তিন সংস্থার (বাংলাদেশ ব্যাংক, আদালত ও বিএসইসি) সমন্বয়ে লাগে। ব্যাংকের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর আমরা কোর্টে যাব, এরপর আমাদের সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের অনুমতির প্রয়োজন হবে। এভাবেই সব ব্যাংকের মার্জার প্রক্রিয়া সামনের দিকে এগোবে।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার, ডেপুটি গভর্নর, এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার, পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আফজাল করিম উপস্থিত ছিলেন।
মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক জানান, ঋণখেলাপি যেই হোক তাদের পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। চুক্তি হলো, এখন দুটি অডিট ফর্ম নিয়োগ করা হবে। অডিটের মাধ্যমে ব্যাংকের পরিচালকদের দায়দেনাও উঠে আসবে। আইনি প্রক্রিয়া ফলো করে সামনের দিকে এগোবে। যত দ্রুত সম্ভব দুটি ব্যাংকে মার্জ করে ঘোষণা দেওয়া হবে। তখন পদ্মা ব্যাংক এক্সিম ব্যাংকে পরিণত হবে। তখন চাইলে পদ্মা ব্যাংকের গ্রাহক এক্সিম ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে পারবেন।
এক প্রশ্নের উত্তরে মুখপাত্র বলেন, দেশের কোনো ব্যাংক এখনও দেউলিয়া হয়নি। ব্যাংকের পর্যায়ে কাজ শেষ হলে আদালত এবং বিএসইসির কিছু কাজ আছে। এসব প্রক্রিয়া শেষ হলে যত দ্রুত সম্ভব কাজ শেষ করে ঘোষণা দেওয়া হবে।
যা বললেন এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান : এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পর পদ্মা ব্যাংকের আমানতকারীদের ক্ষতি হবে না, আমানত যেমন আছে তেমনই থাকবে। এ ছাড়া পদ্মা ব্যাংকের যে জনবল, তাদেরও ক্ষতি হবে না। শেয়ারহোল্ডারদেরও ক্ষতি হবে না। কিন্তু পদ্মা ব্যাংকের অনিয়মের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়ার পর এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, ‘পদ্মা নদীতে এক্সিম ব্যাংকের জাল পড়েছে; এখন ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ উঠবে। দুই ব্যাংক একীভূত হয়ে আরও শক্তিশালী হবে। দেশের ও অর্থনীতির স্বার্থে পদ্মার মতো দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করেছে এক্সিম ব্যাংক।’ কিন্তু পদ্মা ব্যাংকে অনিয়মের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তাদের কী হবে, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, এটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিষয়।
পদ্মা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালকদের কী হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান বলেন, যে ব্যাংক দুর্বল, সেই ব্যাংকের পরিচালকরা থাকবেন না। তারা শেয়ারহোল্ডার হিসেবে থাকবেন। পদ্মা ব্যাংক নামে কিছু থাকছে না। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করব, কীভাবে তাকে সম্মানের সঙ্গে রাখা যায়।’
পদ্মা ব্যাংকের সব ধরনের দায়দেনা এক্সিম ব্যাংক গ্রহণ করবে বলে জানিয়েছেন নজরুল ইসলাম মজুমদার। উভয় ব্যাংকেরই সম্পদ ও দায় আছে; কোনো নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে তা মূল্যায়ন করা হবে বলে তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, যেসব মন্দ ঋণ আছে, তা হয়তো ফেরত আসবে না, তবে এখন থেকে ব্যাংকটি কীভাবে ভালোভাবে পরিচালনা করা যায়, এক্সিম ব্যাংক তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে। বাংলাদেশ ব্যাংক দুটি ব্যাংককে নীতিগত সহায়তা দেবে, সেই সহায়তার আলোকে বাকি সবকিছু পরিচালিত হবে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু হয়নি।
দুই ব্যাংকের একীভূত কি সরকারের চাপে হচ্ছে, না কি আপনারা নিজে থেকেই করছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাব ছিল, চাপ ছিল না। সরকার বলেছে, এক্সিম ব্যাংক ভালো ব্যাংক; তারা অর্থনীতির স্বার্থে এটি করতে পারে কি না।’
এর আগেও একীভূত হয়েছিল সরকারি দুই ব্যাংক : ১৪ বছর আগে এভাবেই একীভূত হয়েছিল সরকারি দুই ব্যাংক। অপরিকল্পিতভাবে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান একীভূত করার সিদ্ধান্ত কতটা ভুল হতে পারে, তার বড় উদাহরণ সরকারি মালিকানাধীন বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল) পিএলসি। দেড় যুগ আগে দেশের দুটি বিপর্যস্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক (বিএসবি) ও বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থাকে (বিএসআরএস) একীভূত করে গঠন করা হয়েছিল বিডিবিএল, যা ২০১০ সালের ৩ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে।
বিএসবি-বিএসআরএস একীভূত হয়ে নতুন নামে বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু পুরোনো খেলাপি ঋণের বোঝা বয়ে বেড়ানোর পাশাপাশি নতুন করে দেওয়া ঋণও খেলাপি হয়ে গেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসাসফল হতে পারেনি; বরং আরও ধুঁকছে। ব্যাংকটিতে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যবেক্ষক নিয়োগ করার পরও এর কোনো উন্নতি ঘটেনি। এটি ব্যাংকিং ব্যবসার পরিবর্তে শেয়ার ব্যবসা ও ভবন ভাড়াবাবদ পাওয়া আয়ের ওপর নির্ভর করেই কোনোমতে টিকে আছে।
অর্থনীতিবিদরা যা বললেন : বেসরকারি দুই ব্যাংকের একীভূত হওয়ার বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর মোস্তাফিজুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, পদ্মা ব্যাংক এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হলেও আমানতকারীদের আমানত ঝুঁকিতে পড়বে বলে আমি মনে করি না। কারণ এখানে বাংলাদেশ ব্যাংক রেফারির ভূমিকায় থাকবে। টাকা ফেরত না দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমানতকারীদের পক্ষে দাঁড়াতে পারবে। তবে আমি মনে করি মার্জার বা একীভূত করার মতো উদ্যোগ নিয়ে পদ্মা ব্যাংককে যারা ডুবিয়েছে তাদের দায়মুক্তির একটি ব্যবস্থা করা হলো কি না, সে প্রশ্ন রয়ে যায়। আমরা অনেক আগে থেকেই বলে আসছিলাম, দেশে এত ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন ছাড়াও ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ায় এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেও আমরা মনে করি।
সময়ের আলো/জেডআই