স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এসে ছোটগল্পে নিরীক্ষা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর এ পর্বের একেবারেই স্বতন্ত্র ধারার গল্পকার হলেন শহীদুল জহির। তিনি প্রবণতার দিক থেকে বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ধারাবাহিক। শহীদুল জহির নিজেও এক সাক্ষাৎকারে সেটা স্বীকার করে বলেছেন, ‘আমার গল্প বাংলা সাহিত্যের যে ঐতিহ্য আছে সেগুলো থেকেই আসা এবং বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে আসতে পারে। এটা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ হতে পারে।’ সময়ের সাহসী কথাশিল্পী শহীদুল জহির।
জাদুবাস্তবরীতির একনিষ্ঠ সাধনা করে অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তার জাদুবাস্তবতা নিয়ে বিভিন্ন মত থাকলেও শহীদুল জহির ও জাদুবাস্তবতা সমার্থক নিঃসন্দেহে। প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘পারাপার’ তাকে পরিচিতি দেয়নি। কিন্তু পরবর্তীকালে তার জাদুবাস্তবতার কারুকাজে ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ উপন্যাস ও ‘ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প’ ছোটগল্প লেখায় যে পরিবর্তন আসে, তাতে পাঠক-সমালোচক চমকে ওঠেন। সাড়া পড়ে আমাদের শিল্প-সাহিত্যের জগতে। জাদুবাস্তবতা হলো একটি সর্বভুক ও সর্বভুজ শিল্পধরন। প্রাচীনকালের বাচিক গল্প, লোককথা, রূপকথা, লোকশ্রুতি, ধাঁধা থেকে শুরু করে আধুনিক কালের উদ্ভট, ব্যাখ্যাহীনতা, পরাবাস্তবতা, প্রবল রহস্যময় অধিবিদ্যা, গোলকধাঁধা ইত্যাদি সমন্বয়ে গড়ে ওঠা চমকপ্রদ এই শিল্পপ্রয়াসে লুকিয়ে থাকে পারিপার্শ্বিক পরিমণ্ডল। এখানে শিল্পী যেন জাদুকর। জাদুর ইন্দ্রজালে বাস্তবকে উধাও করেন। পাঠক বা শ্রোতা প্রবেশ করেন জাদুর ইন্দ্রজালে বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে অন্য কোনো কল্পনার রাজ্যে। স্বাদ ও অভিজ্ঞতা লাভ করেন ভিন্ন কিছুর। এ রীতির গল্প উপন্যাস পাঠান্তে পাঠক বাস্তবে ফিরে এলে প্রথমে ঠিক বুঝতে পারেন না গল্প বা উপন্যাসটির গূঢ়ার্থকথা। তবে গল্প বা উপন্যাসটি যে অন্যরকম তা উপলব্ধি করতে পারেন ঠিকই। শহীদুল জহির যখন লেখালেখির জগতে তখন বিশে^ সাহিত্যজগতের বড় তারকা হলো গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। তার দ্বারা তিনি কিছুটা প্রভাবিত হয়েছেন। গদ্যে সৈয়দ শামসুল হকের প্রভাবও লক্ষ করা যায় তার লেখায়। এমনকি কমলকুমার মজুমদার, জেমস জয়েস ও ইলিয়াসের প্রভাবও তাঁর ভেতর আছে।
পরবর্তীকালে তিনি নিজেই গল্প বলার একটি স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করেছেন, যেটা ‘শহীদুল জহিরীয় ধারা’ হিসেবে চিহ্নিত। তার শক্তি জাদুবাস্তবতার সঙ্গে রূপকথা বা টেলধর্মী আখ্যান নির্মাণের দক্ষতা। লেখক হিসেবে শহীদুল জহির কাঠামো বিষয়ে সচেতন ছিলেন। তিনি ঐতিহ্যগত নির্মাণশৈলী থেকে বের হতে চেয়েছেন। তার ছোটগল্পের কাহিনীতে বহির্জীবন এবং অন্তর্লোক একরেখায় এসে মিলিত হয়। ফলে অন্তর্বয়ান ও বহির্বয়ান একই সঙ্গে ঘটে। গল্পে ‘অথবা/ হয়তো/ কিংবা/ বা’ ইত্যাদি শব্দের পৌনঃপুনিক ব্যবহারের ভেতর দিয়ে কতগুলো সম্ভাব্য বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে সেগুলো বাতিল করার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে। শহীদুল জহির অধিকাংশ সময় ঘটে যাওয়া গল্প লেখেন। সেই গল্পটা আবার তিনি নির্মাণ করেন সমষ্টির বয়ানে। অর্থাৎ মহল্লা বা ডাউনটাউনের লোকজন সেই গল্পের কথক। তিনি তাদের মুখে গল্পটা তুলে দিয়ে নিজে কিছুটা দূরে সরে যান। অনেকটা পাঠকের অবস্থানে অবস্থান করেন। ফলে তিনি গল্পে কথা বলার ধরন মিশিয়ে যে-কথন তৈরি করেন সেখানে আখ্যান বা অবয়ব বলে কিছু থাকে না।
ঐতিহ্যগত নির্মাণশৈলীটা ভেঙে পড়ে। এ জন্য তাকে উত্তরকাঠামোবাদী লেখক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। প্রচলিত কাঠামো ভাঙার ক্ষেত্রে শহীদুল জহির তাঁর গল্পে চিত্রকলার কিউবিক এবং বিমূর্তকরণ ফর্ম ব্যবহার করেছেন। ফলে গল্পটা পাঠককে নিজের মতো করে সেই বিচ্ছিন্ন কোলাজকে মিলিয়ে নিতে হয়। ফলে যেমন দুর্বোধ্যতার সৃষ্টি হয় তেমনি পাঠকভেদে তৈরি হয় ভিন্ন ভিন্ন পাঠ। এক সাক্ষাৎকারে শহীদুল জহির এই ফর্মের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘মার্কেজের লেখা পড়ে আমার মনে হয়েছে, এখানে চিত্রকল্পের ফর্ম আছে। পিকাসোর গুয়েরনিকা যে ফর্মে আঁকা, এটা হচ্ছে কিউবিক ফর্ম। একটা জিনিস ভেঙে ভেঙে ছড়িয়ে দেওয়া আছে। সেই ছবিতে ঘোড়ার মাথা একদিকে, পা একদিকে; বিষয়টা হচ্ছে, ঘোড়াটা বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। আমারও মনে হয়েছে লেখাগুলো যখন যেভাবে খুশি লেখা।’
শহীদুল জহিরের গল্পে প্রমিত ভাষা ব্যবহারের মধ্যে টেক্সট ও ডায়ালগে কথ্য বা আঞ্চলিক ভাষারীতি ব্যবহার করেছেন। যেমন ক্রিয়াপদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায়, যায়া (গিয়ে/যেয়ে), হয়া (হয়ে), হারায়া (হারিয়ে), শিখায়া (শিখিয়ে), দিয়া (দিয়ে) প্রভৃতি। এটা তার ক্ষণিক নিরীক্ষা নয়, তার সাহিত্যের মূল স্রোতেই এই ভাষারীতি চোখে পড়ে।
শহীদুল জহির সাহিত্যে বাস্তবের মতো হুবহু চরিত্র নির্মিতি ও ব্যবহৃত ভাষাপ্রয়োগে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি ভাষার দিক থেকে সাহিত্যকে আলাদা একটি নির্মাণ হিসেবে দেখতে চাননি। তিনি সচেতনভাবে শব্দসংকোচন বা শব্দসম্প্রসারণ করেননি। যে শব্দ তার চারপাশে মুখে মুখে প্রচলিত ছিল, তিনি তা-ই কুড়িয়ে নিয়েছেন। মার্কসীয় দর্শনের কোনো লেখক লিখছেন জাদুবাস্তবতার কৌশল অবলম্বন করে। সাধারণত এমনটি ঘটে না। কারণ যারা লেখালেখির ভেতর দিয়ে সমাজ-কাঠামোর পরিবর্তন ঘটাতে চান বা লেখালেখিকে মুভমেন্ট হিসেবে নেন, তারা যতটা সম্ভব কমিউনিকেটিভ থাকার জন্য সরল ও ঐতিহ্যগত টেকনিক অবলম্বন করেন। কিন্তু শহীদুল জহির তা করেননি। তিনি বক্তব্যের দিক দিয়ে সমাজ ও রাজনীতিসচেতন লেখক বটে। সেই অর্থে তার সব গল্পই পলিটিক্যাল বা সোশ্যাল এলিগরি।
শহীদুল জহির নিজের একাকিত্ববোধ থেকে ঠিক তার বিপরীত অবস্থানে অর্থাৎ সমষ্টির কাছে ফিরে যেতে চেয়েছেন। এটা তার নিজের একান্ত আকুতি হয়ে থাকতে পারে। হতে পারে তিনি ব্যক্তিকেন্দ্রিক আধুনিকতার বিপক্ষে। তবে এর সরল একটা উত্তর তিনি নিজে দিয়েছেন আহমাদ মোস্তফা কামাল গৃহীত এক সাক্ষাৎকারে- ‘এটা (সমষ্টির বয়ান ব্যবহার করা) আমি করি, কারণ এমন অনেক কিছুই বলা হয় বা করা হয়, যেটা আমি পরে অস্বীকার করতে চাই- লেখক হিসেবে। ...লেখক হিসেবে আমি সবকিছুর দায়িত্ব নিতে পারব না জেনেই জনশ্রুতির ওপর নির্ভর করি, সমষ্টিক আকারে বর্ণনা করি।
শহীদুল জহির জাদুবাস্তবতার লেখক কি না সেই প্রশ্ন তোলা উচিত হবে না। কারণ স্পষ্টতই তাঁর লেখায় জাদুবাস্তবতার উপকরণ আছে। তিনি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সচেতনভাবে জাদুবাস্তবতার বিষয়টি তাঁর গল্প-উপন্যাসে এনেছেন এবং সেটা তিনি গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ থেকে গ্রহণ করেছেন। তিনি বলছেন, ‘জাদুবাস্তবতার ব্যাপারটা তো আমি মার্কেজের কাছ থেকে পেয়েছি। এবং এটা আমি গ্রহণ করেছি দুটো কারণে। প্রথমত, চিন্তার বা কল্পনার গ্রহণযোগ্যতার যে পরিধি সেটা অনেক বিস্তৃত হতে পারে বলে আমি মনে করি। দ্বিতীয়ত, আমি আসলে বর্ণনায় টাইমফ্রেমটাকে ভাঙতে চাচ্ছিলাম।’ প্যারিস রিভিউতে এক সাক্ষাৎকারে জাদুবাস্তবতার কৌশল নিয়ে মার্কেস নিজে বলছেন, ‘যখন আপনি বলবেন হাতি আকাশে উড়ছে, মানুষ আপনাকে বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আপনি যদি বলেন, ৪২৫টি হাতি আকাশে উড়ছে লোকজন আপনাকে বিশ্বাস করলেও করতে পারে।’
মার্কেস যেটা বোঝাতে চাচ্ছেন সেটা হচ্ছে অবাস্তব ঘটনাকে বিশ্বাসযোগ্য বা বাস্তব করে তুলতে হলে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনার ভেতর চলে যেতে হবে। পাঠক তখন ধরে নেবেন বিষয়টি সত্যিই ঘটছে বা ঘটেছে।
পরাবাস্তবতার সঙ্গে জাদুবাস্তবতার মৌলিক পার্থক্য হলো পরাবাস্তবের জগৎ ব্যক্তির ভেতরে তৈরি হয় আর জাদুবাস্তবের জগৎ সৃষ্টি হয় বাইরে, সমষ্টির চারপাশের মধ্যে। ব্যক্তি এখানে গুরুত্বপূর্ণ; আবার ব্যক্তির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সমষ্টিগত মানুষ। ব্যক্তি থেকে সমষ্টিতে প্রবেশের এ এক অভিনব শিল্পরীতি। একসময় মার্কসবাদী সাহিত্য যে সমষ্টি চেতনার বিকাশ ঘটিয়েছে, জাদুবাস্তবরীতি সেই সমষ্টিগত চৈতন্যকে নূতন মাত্রা দান করেছে। যে কারণে ‘পারাপার’ পর্বের মার্কসবাদী শহীদুল জহির জাদুবাস্তবরীতিকে আত্তীকরণ করতে পেরেছেন খুব সহজেই এবং পরবর্তীকালে এ রীতিতে সাহিত্যচর্চা করেছেন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই। শহীদুল জহিরে জাদুবাস্তবতার যে রূপায়ণ ঘটেছে, তা অবশ্যই তার স্বদেশ ও রাজনৈতিক চেতনার সঙ্গে সর্বাত্মকভাবে সংযুক্ত।
শহীদুল জহিরের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ উপন্যাসে আশির দশক, ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’ উপন্যাসে সত্তরের দশক এবং ‘মুখের দিকে দেখি’ উপন্যাসে নব্বইয়ের দশক প্রেক্ষাপট হয়েছে। স্বাধীনতার পরের প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছে তার ছোটগল্পগুলোও। একমাত্র ‘কাঁটা’ গল্পে সাম্প্রদায়িকতার অভিঘাত ও সংখ্যালঘুদের জীবনবাস্তবতা ধরতে গল্পকার আশির দশকের পাশাপাশি আশ্রয় নিয়েছেন চৌষট্টি ও একাত্তরে। সে হিসেবে চৌষট্টি থেকে পুরো নব্বই পর্যন্ত কিংবা আরও কিছু পরের সময়কাল পল্লবিত হয়েছে তার কথাশিল্প।
সময়ের আলো/আরএস/