আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) নতুন সভাপতি হয়েছেন জাপান গার্ডেন সিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ওয়াহিদুজ্জামান। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নতুন বাজেট নিয়ে তিনি মুখোমুখি হয়েছিলেন সময়ের আলোর।
নতুন বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতি বছরের ন্যায় এবারও আসছে নতুন বাজেট। একজন উদ্যোক্তা হিসেবে এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা হিসেবে আমি মনে করি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট হওয়া দরকার ব্যবসাবান্ধব ও জনবান্ধব। এবারের বাজেট নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা অনেক।
আবাসন খাতের জন্য আমরা অনেক প্রস্তাব জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে জমা দিয়েছি। আশা করব বাজেটে আমরা তার প্রতিফলন দেখতে পাব। বিশেষ করে আমরা এবারের বাজেটে অপ্রদর্শিত আয় বিনা প্রশ্নে বিনিয়োগ করার সুযোগ রাখার দাবি জানিয়েছি। আমরা এখন পর্যন্ত যে তথ্য জানতে পেরেছি, তাতে বোঝা যাচ্ছে নতুন বাজেটে অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হবে আবাসন খাতের জন্য।
তিনি বলেন, বাজেটে অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হলে অনেকেই অনেক কথা বলেন, কিন্তু আমি মনে করি যারা এর সমালোচনা করেন-তারা না বুঝেই সমালোচনা করেন। কারণ বিনা প্রশ্নে আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দিলে টাকা পাচার বন্ধ হবে। তার চেয়ে বড় কথা হলো-দেশে এখন এক রকম অর্থনৈতিক সংকট চলছে। এ অবস্থায় বাজারে টাকা আসার দরকার আছে। যাদের হাতে বেশি টাকা আছে তাদের অনেকেই হয়তো দেশে বিনিয়োগ না করে দেশের বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন। দেশের টাকা যাতে দেশেই থাকে তার জন্য বিনিয়োগের সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হলো এ আবাসন খাত। এ টাকা যদি মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে দেশের বাইরে না দিয়ে দেশে বিনিয়োগ হয় তা হলে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। দেশে যদি এ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া না হয় তা হলে এ টাকা নিয়ে দেশের বাইরে সেকেন্ড হোম বানাবে অনেকেই। তাই আমি বলব-এ বিষয়ে অহেতুক বিতর্ক না করে বাস্তবভিত্তিক চিন্তাভাবনা করা দরকার।
রিহ্যাব সভাপতি বলেন, আবাসন খাতের রেজিস্ট্রেশন ফিসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় এখনও অনেক বেশি আমাদের দেশে। এ জন্য নতুন বাজেটে আমরা রেজিস্ট্রেশন ফিসহ অন্যান্য চার্জ কমানোর প্রস্তাব দিয়েছি। আবাসন খাতের রেজিস্ট্রেশন ফি সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। রেজিস্ট্রেশন ফিসহ সবকিছু মিলিয়ে আমাদের দেশে ৩৩ শতাংশ ফি কর্তন করা হয়। ফ্ল্যাটের মূল্যের ওপরই এই হারে ফি কর্তন করা হয়। এত উচ্চহারে ফি দিয়ে কতজন লোক ফ্ল্যাট কিনতে পারবে। অথচ সার্কভুক্ত দেশগুলোতে রেজিস্ট্রেশনসহ সব ফি কর্তন করা হয় মাত্র ৭-৮ শতাংশ। এই উচ্চ ফি কমিয়ে আনলে ক্রেতার যেমন সাশ্রয় হবে, তেমনই সরকারও লাভবান হবে। কারণ খরচ কমলে ফ্ল্যাট বিক্রি বাড়বে। এতে দেখা যাবে বেশি হারে ফি কর্তনের মাধ্যমে সরকার যত রাজস্ব পাবে তার চেয়ে বেশি রাজস্ব পাবে ফ্ল্যাট বিক্রির হার বাড়লে। অথচ রেজিস্ট্রেশন ফিসহ সব খরচ এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যে, ক্রেতারা ফ্ল্যাট কিনতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। তাই এবারের বাজেটে এই ব্যয় কমানোর জোর দাবি রয়েছে আমাদের।
এ ছাড়া আমি মনে করি আবাসন খাতে রেজিস্ট্রেশন ফি বেশি না ধরে এনবিআর যদি করের আওতা বাড়ায় তা হলে সঠিক সিদ্ধান্ত হবে। দেখা যাচ্ছে যে ট্যাক্স দিচ্ছেন তার ওপরই আরও বোঝা বাড়ানো হচ্ছে। আর যারা মোটেই ট্যাক্স দিচ্ছেন না তারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছেন। এটি তো ঠিক হলো না। তাই ট্যাক্স না বাড়িয়ে করনেট বাড়ানো দরকার বাজেটে।
রিহ্যাব সভাপতি মো. ওয়াহিদুজ্জামান আবাসন খাতের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি নতুন বাজেটে এ খাতের সহযোগী শিল্পগুলোর ওপর থেকেও বাড়তি করের বোঝা কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, আবাসন শিল্পের সঙ্গে সহযোগী হিসেবে ২০০টিরও অধিক শিল্প রয়েছে। রড, সিমেন্টের মতো যত সহযোগী শিল্প পণ্য রয়েছে-এগুলোর দামও এখন অনেক বেড়েছে। স্বর্ণের ভরি যেভাবে হঠাৎ করেই লাখ ছাড়িয়ে গেছে, তেমনই প্রতি টনের রডের দামও লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই যে এসব পণ্যের দাম বেড়েছে তারও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আবাসন শিল্পের ওপর। তাই আসন্ন বাজেটে এসব পণ্যের দামও যাতে কমে তার জন্য পদক্ষেপ দরকার, সে সঙ্গে এসব পণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বেশি নেওয়া হচ্ছে কি না-সেগুলো যাচাইয়ের জন্য মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা দরকার।
ব্যাংকিং খাতে অব্যবস্থাপনা চলছে উল্লেখ করে রিহ্যাব সভাপতি বলেন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ব্যাপক অভাব দেখা দিয়েছে। এর জন্য দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আমরা যারা উদ্যোক্তা-তাদের সবাইকেই ভুগতে হচ্ছে। তাই ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে হবে। আসলে ব্যাংকিং খাতকে একেবারে ঢেলে সাজাতে হবে। এ খাতের অব্যবস্থাপনার কারণেই ব্যাংক ইন্টারেস্টের হার বেড়ে গেছে। আবাসন খাতের ক্রেতারা ব্যাংক থেকে যারা ঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কেনেন তাদের উচ্চ হারে সুদ দিতে হচ্ছে। তাই আমি মনে করি ব্যাংকিং খাত নিয়ে সরকারকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে সংকটগুলো সমাধান করা দরকার।
আবাসন খাতের সংগঠনের এই শীর্ষ নেতা বলেন, আসন্ন বাজেটে যেন আবাসন খাতের জন্য একটি বিশেষ তহবিল রাখা হয়। এ সরকারের আমলেই হোম লোন স্কিম চালু ছিল। এখান থেকে ঋণ নিয়ে মধ্যবিত্ত-বিশেষ করে যারা ফিক্সড ইনকামের লোক তারা ঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কিনতেন। এখান থেকে স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নিতে পারতেন তারা। এক হাজার কোটি টাকার একটি ফান্ড ছিল ওই হোম লোন স্কিমের জন্য। পরে সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নতুন বাজেটে আবারও আমরা এক হাজার কোটি টাকার ওই ফান্ড চালুর দাবি জানিয়েছি।
আবাসন খাতের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে রিহ্যাব সভাপতি ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, আসলে ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত করোনার ধাক্কা গেছে। এর পর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ও ফিলিস্তিন-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী একটি অস্থিরতা চলছে। এর নেতিবাচক প্রভাব আমাদের আবাসন শিল্পের ওপরও পড়েছে। বলা যায়, এ খাত লম্বা একটা ক্রান্তিকাল পাড়ি দিয়ে এসেছে। সে অবস্থা থেকে এখন আমরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় আছি। এ অবস্থায় আবাসন খাতকে আরও মজবুত অবস্থায় নিতে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। বিশেষ করে ড্যাপের মাধ্যমে যে নতুন বিধিবিধান তৈরি করা হচ্ছে-সেগুলো আবাসন খাতের ঘুরে দাঁড়ানোর পথে বাধার সৃষ্টি করছে। তাই আমি মনে করি ড্যাপের সংশোধন প্রয়োজন। এতে ফারের যে বিধান রাখা হয়েছে সেটিই এখন আবাসন খাতের বড় বাধা। ফারের বৈষম্যের কারণে কোনো এলাকায় দশ তলা বিল্ডিং করছে, আবার কোনো এলাকায় চার-পাঁচ তলার বেশি বিল্ডিং করা যাচ্ছে না। এ বৈষম্যকে দূর করা দরকার। তা না হলে আগামী দিনে আবাসন খাতের উদ্যোক্তাদের ব্যবসা করা দুষ্কর হয়ে পড়বে এবং দেশের আবাসন খাতও বেশ সংকটে পড়বে।
সময়ের আলো/আরএস/