ঘাস খাও

জামিল জাহাঙ্গীর

সাহিত্য

গত সতেরো বছরে এ এলাকা একবারের জন্যও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়নি। আজ আষাঢ়ে সন্ধ্যায় হঠাৎ বজ্রপাতে অন্ধকার নেমে এলো। সদলবলে। বারবার

2024-07-12T03:39:53+00:00
2024-07-12T03:39:53+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৬ ভাদ্র ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সাহিত্য
ঘাস খাও
জামিল জাহাঙ্গীর
প্রকাশ: শুক্রবার, ১২ জুলাই, ২০২৪, ৩:৩৯ এএম 
ঘাস খাও
গত সতেরো বছরে এ এলাকা একবারের জন্যও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়নি। আজ আষাঢ়ে সন্ধ্যায় হঠাৎ বজ্রপাতে অন্ধকার নেমে এলো। সদলবলে। বারবার থেমে থেমে বৃষ্টিতে জুতো মোজা ভিজে জবজবে। শরীরটা আশ্চর্যরকম শুকনোই রয়ে গেছে। আড্ডার শেষ লোকটিও চলে গেছে। সুনসান নীরবতায় শিরশির করে সাড়া দিচ্ছে ত্বক এবং লোম। টিপটিপ ঝরা কিছুতেই থামছে না। সঙ্গে ছাতাও নেই তাই পাঁচশ তিন নম্বর পিলারে হেলান দিয়ে পকেটে মাইকেল তরিকায় হাত ঢোকালাম। স্মার্টফোনের মনিটর অন করে দেখতে চাইলাম ক’টা বাজে। ডিসপ্লে কাজ করছে না। ব্যাকপকেটে হাত দিয়ে দেখলাম মানিব্যাগ আছে কি না। বেশ পুরু মানিব্যাগ বুঝে চোখের সামনে এনে দেখলাম এত মোটা মানিব্যাগ সত্যিই আমার কি না। এটিএম কার্ড আর শনাক্তকরণ চিহ্ন দেখে নিশ্চিত হলাম। মুখ খুলতেই দেখি থরে থরে সাজানো নোটের তোড়া। একটিও বাংলা নোট নেই। সব ডলার। জর্জ ওয়াশিংটন এক হাজার টাকার হাসি দিয়ে আমার সঙ্গে তামাশা করছেন।
ঝানু স্যাকরা যেভাবে সোনার খাদ পরীক্ষা করে তেমনি করে ডলারে আঙুল ডলে ডলে নিশ্চিত হলাম এসব আসল ওয়াশিংটন। ইয়াহু মেইলে সাড়ে সাত বিলিয়ন ডলারের সেনশনটা উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। ওরা পাঠানোর খরচ বাবদ পঞ্চাশ ডলার চেয়েছিল। লিখে দিয়েছিলাম, সাড়ে সাত বিলিয়ন ডলার থেকে অ্যাডজাস্ট করে বাকিটা পাঠিয়ে দিন প্লিজ। ওরা সেই কথা রেখেছে নিশ্চয়ই।
আজ আর মালঞ্চ ট্রান্সসিলভা নয়। একটা মার্সিডিজ বেঞ্জ না হলে চলেই না। উবার কিংবা পাঠাও পাওয়ার সুযোগ নেই তাই জাদুঘরের সামনে চলে এলাম। কেউ নেই এই চত্বরে। তালগাছটা একা দাঁড়িয়ে শিমুলের সঙ্গে কথা বলছে। বৃষ্টি এখন নেই বললেই চলে। শিমুল গাছের ডাল থেকে ফোঁটা ফোঁটা জমা জল ঝরে পড়ছে। নাকের ডগায় একটা ফোঁটা পড়তেই ঠোঁটের খাঁজ বেয়ে চলে এলো জিভের ডগায়। কামিনী ফুলের ঘ্রাণ পেলাম।
একটা ঝকঝকে তকতকে পার্পল রঙের মার্সিডিজ বেঞ্জ এসে ব্রেক কষলো আমার ছায়ার মধ্যে। সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে ড্রাইভার আবুল খায়ের সালাম দিয়ে বললেন, সরি স্যার, মেট্রোস্টেশনে জ্যাম থাকায় তিন মিনিট দেরি হয়ে গেছে। বলতে না বলতেই স্বয়ংক্রিয় খুলে গেল মূল দরজা। কিছু না বলেই বসে পড়লাম। সিট বেল্ট আমাকেই জড়িয়ে নিল পরম মমতায়। 
স্যার, কোনদিকে যাব? জিজ্ঞাসায় ফিরে এলাম ফের শাহবাগে। মুখ দিয়ে বের হয়ে গেল জাহান্নামের চৌরাস্তায়।
আবুল খায়ের ভড়কে না গিয়ে বলল, স্যার ডান বাম বলে দিয়েন আমি ঠিক নিয়ে যাব। বললাম, আপাতত ইউটার্ন নিয়ে দিলকুশা চলো। কিছু ডলার ভাঙাতে হবে। মেট্রোরেল পথ ধরে দৈনিক বাংলা পর্যন্ত এসে আবার রাইট টার্ন নিয়ে রাজউকের পাশ দিয়ে বঙ্গভবনের দেয়ালের বিপরীতে টোয়েন্টিফোর মানি এক্সচেঞ্জ। বাদল ভাই হাসিমুখে বললেন, আপনি আসবেন এজন্য এখনও খোলা রাখছি নইলে এতক্ষণে বাসায় ঢুকে যেতাম।
আটচল্লিশটা এক হাজার ডলারের নোট তার হাতে দিলাম।
বললেন, আজ রেট একটু পড়তি, বৃহস্পতিবার হলে বাইশ তেইশ পাইতেন। বললাম, বৃহস্পতির দরকার কি, আজকের রেটেই দিন। একটা কাগজের প্যাকেটে টাকাগুলো ভরে পলিথিনে করে হাতে দিয়ে বললেন সাবধানে যান। রাতে এত টাকা দিয়ে কী করবেন। মানি এক্সচেঞ্জের দেয়ালঘড়িতে তখন এগারোটা তেতাল্লিশ মিনিট।
বাদল ভাইকে বললাম, রাতে এত ডলার দিয়ে কী করবেনÑ একথা কি জিজ্ঞেস করেছি আমি? দিনে টাকা দৃশ্যমান। বড় বড় পরিমাণে টাকার লেনদেন রাতে হয় এটা তো আপনিই বলেছেন। বাদল ভাই হো হো করে হাসতে লাগলেন। তরমুজবিচি রঙের দাঁতগুলো দেখা যাচ্ছে একসঙ্গে তবু হেসেই চলছেন। আবুল খায়েরের গাড়ি তখন নিজে নিজে খুলে আমাকে ডাকছে। আমিও টা-টা বলে উঠে গেলাম।
এক মিনিটও চলেনি। মেটলাইফ আর সোনালী ব্যাংকের মাঝখানে আসতেই দুইদিক থেকে দুটি প্রাডো এসে আমার মার্সিডিজ বেঞ্জকে চেপে ধরল। আবুল খায়ের এবারও সপ্রতিভ হয়ে দরজা খুলে দিল। দুইপাশ থেকে দুজন অস্ত্রধারী মুখোশ পরা আমাকে মাঝখানে চেপে রাখল। আবুল খায়েরই কথা শুরু করল। হালার পো হালা, জাহান্নামের চৌরাস্তায় যাইতে কও। দুইডা কেনু দে তো হালারে।
পলিথিনটা ওদের দিয়ে বললাম, এটার জন্যই তো তোমাদের এত হাঙ্গামা। এটা নিয়ে আমাকে নামিয়ে দাও। তোমাদের সঙ্গে তো আমার কোনো শত্রুতা নেই। কালো মুখোশ পরা লোকটা বলে উঠল, টাকা পয়সা হাতের ময়লা। তোর ব্যাগে যে টাকা আছে তা তো আমার একদিনের কামাই। টাকার জন্য তোকে অ্যাটাক করিনি। করছি ড্রাইভার জাতিকে অবজ্ঞা করার জন্য। এরপর একটানা গালির তোড়। ব্লা ব্লা ব্লা...
আবুল খায়ের অট্টহাসি দিয়ে বলে উঠল, কী স্যার বুঝছেন, কারে চাকরি দিলেন। এবার ঠেলা সামলান। ঠেলা সামলাবো নাকি মার্সিডিজ বেঞ্জ সামলাবো বুঝতে পারছি না। এমন সময় দমকা ঝলমলে আলো জ্বলে উঠল। বঙ্গভবন থেকে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট আর মেট্রোরেল স্টেশন থেকে র‌্যাবের টহল ফোর্স এসে দুই গাড়ির সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে চোখের পলকে।
পিজিআরকে বললাম, ছাগলদুটোকে ঘাস খাওয়াতে এক্সপ্রেস হাইওয়ে নিয়ে যাচ্ছি। র‌্যাবের সদস্য বললেন, সঙ্গে বুঝি ড্রাইভার?
বললাম, হ্যাঁ। আপনি আমাদের সঙ্গে আসুন। ওদের ঘাস ওরাই খাক। দ্রুত পলিথিনসমেত র‌্যাবের গাড়িতে উঠে আবুল খায়েরকে তলব করলাম। সে কাচুমাচু করতে করতে পাশে এসে দাঁড়ালো। দুই হাত জোড় করে বললাম, আবুল খায়ের।
জি জি জি স্যার।
টিস্যু আছে?
জি স্যার।
নিয়ে এসো। আবুল খায়ের টিস্যু নিয়ে এলো বিদ্যুৎগতিতে। বললাম, আমার জুতোর তলায় আঠা লেগে আছে। মুছে দাও।
আবুল খায়ের চেষ্টা করছে আঠা মুছতে। সারা জীবনের সঞ্চিত শক্তি দিয়ে প্রাণপণে মুছছে তো মুছছেই।
বললাম, আবুল খায়ের এখন কী মাস?
স্যার, আষাঢ় মাস।
দাগ ওঠে?
না স্যার।
ঠিক আছে যাও। ওদের নিয়ে ঘাস খাও...।

সময়ের আলো/আরএস/ 

Advertisement
Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: