অর্থনীতির বড় অনিশ্চয়তা উৎপাদন খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক

অর্থনীতি

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জানিয়েছে, সার্বিকভাবে অর্থনীতির অবস্থা যথেষ্ট খারাপ। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডও ক্ষতিগ্রস্ত

2024-11-18T02:07:00+00:00
2024-11-18T02:07:00+00:00
 
  শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬,
১০ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
অর্থনীতি
অর্থনীতির বড় অনিশ্চয়তা উৎপাদন খাত
সিপিডির সংলাপ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৪, ২:০৭ এএম 
অর্থনীতির বড় অনিশ্চয়তা উৎপাদন খাত
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জানিয়েছে, সার্বিকভাবে অর্থনীতির অবস্থা যথেষ্ট খারাপ। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থনীতির বড় অনিশ্চয়তা এখন উৎপাদন খাতে।

গবেষণা এই প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, দুর্নীতি, প্রবৃদ্ধির হিসাবে গরমিলের কারণে অর্থনীতিকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হচ্ছে। বিভিন্ন রকম উদ্যোগের পরও সবচেয়ে বড় রফতানি শিল্প পোশাক খাতে উৎপাদনব্যবস্থা এখনও ভঙ্গুর রয়ে গেছে।

রোববার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে ‘বাংলাদেশে ব্যবসায়িক পরিবেশ সংস্কার : অন্তর্বর্তী সরকারের এজেন্ডা’ শীর্ষক একটি সংলাপে এসব কথা জানান বক্তারা। সংলাপের আয়োজন করে সিপিডি। এ সময় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। সংলাপে প্রধান উপদেষ্টার (উপদেষ্টা) আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত অধ্যাপক লুৎফে সিদ্দিকী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু, ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি জাভেদ আখতার, নিট শিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি আশরাফ আহমেদ ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাংলাদেশে ডুয়িং ব্যবসা করার জন্য ১৭টি সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছেÑদুর্নীতি, আমলাতন্ত্রের অদক্ষতা, মুদ্রাস্ফীতি, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, নীতির অস্থিতিশীলতা, দুর্বল শ্রমশক্তি, উচ্চ করহার, উদ্ভাবনের জন্য অপর্যাপ্ত ক্ষমতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ঝুঁকিপূর্ণ জনস্বাস্থ্য এবং শ্রমনীতির সীমাবদ্ধতা।

প্রবন্ধ তৈরিতে দেশের সেবা, কৃষি, ম্যানুফ্যাকচারিং ও নন-ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের এক দশকের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত নেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার মানদণ্ডে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা ও ভারতের চেয়ে পিছিয়ে। অর্থনীতির তুলনায় ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে।
দুর্নীতি মূল সমস্যা জানিয়ে মোয়াজ্জেম বলেন, আমরা মনে করি দুর্নীতি সর্বদাই প্রধান সমস্যা। যদিও অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর সমস্যা ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়েছে। বছরের পর বছর অদক্ষ আমলাতন্ত্র একটি প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার অস্থিরতা একটি বড় কারণ হয়ে উঠেছে। মুদ্রাস্ফীতি সবসময় বড় চিন্তার কারণ। অন্যদিকে নীতির অস্থিতিশীলতা একটি মাঝারি স্তরের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।

সংলাপে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের লক্ষ্য থেকে সরে আসছে সরকার। বিদ্যুৎ, গ্যাস, অবকাঠামো সুবিধা নিশ্চিত করে দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য অর্থনৈতিক অঞ্চলের সংখ্যা পাঁচ অথবা দশটি হবে। কবে নাগাদ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবকাঠামো নিশ্চিত করা হবে তারও একটি টাইমলাইন দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, গত এক দশকে প্রায় ৯৭টি অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৬৮টি গড়ে তোলার কথা সরকারের এবং ২৯টি গড়ে তুলবে বেসরকারি খাত। এগুলো গড়ে তোলার প্রাথমিক সময়সীমা নির্ধারণ করা হয় ২০৪১ সাল। তবে গত এক দশকে মাত্র ১০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু করা গেছে। ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর এসব অঞ্চলগুলোর ভাগ্য সুতোয় ঝুলছিল।
সিপিডির অনুষ্ঠানে চৌধুরী আশিক বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে পাঁচটি বিষয় উন্নয়নের চেষ্টা করছি। প্রথমেই আমরা সেবার মান বাড়ানোর চেষ্টা করছি। সেখানে ব্যবসায়ীদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। বিডা, বেজা, বেপজা, হাইটেক পার্ক সবকিছুকে একীভূত করার চেষ্টা করছি। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলছি, তাদের মতামত নেওয়া হচ্ছে।

অর্থনৈতিক অঞ্চলে অপর্যাপ্ত অবকাঠামো রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ইকোনমিক জোনে ব্যবসায়ীদের অবকাঠামো দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। কিন্তু সেগুলো দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ১০০টি ইকোনমিক জোন করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। আমরা এটা কমাব। কতগুলো ইকোনমিক জোন হবে সেটার ঘোষণা হবে। কিন্তু সেটা ১০ এর কম হবে বা ৫ হতে পারে। সেখানে সব অবকাঠামো নিশ্চিত করা হবে। ব্যবসায়ীরা কবে সেই অবকাঠামো পাবে সেই টাইমলাইন দেওয়া হবে।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, প্রয়োজনে বিজনেস রেগুলেটরি রিফর্ম কমিশন গঠন করা হবে। সরকারের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত স্বার্থের কোনো দ্বন্দ্ব নেই। আমরা সরকারের কাজের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনছি। আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

বিডি জবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম মাশরুর বলেন, ইলন মাস্ক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বিবেক রামাস্বামীকে ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সির দায়িত্ব দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদি আবদুল আউয়াল মিন্টুকে এ ধরনের দায়িত্ব দেওয়া হতো, আমি ঠিক জানি না আমরা সেটাকে কীভাবে নিতাম। আমলাতন্ত্রের বাইরে গিয়ে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সত্যিকারের সংস্কার করতে হলে এ ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।

ব্যবসায় প্রবেশের ক্ষেত্রে নানান বাধা বিপত্তির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, কেন পাঁচ লাখ টাকার বার্ষিক রেভিনিউ ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রতি মাসে ভ্যাট-ট্যাক্স রিটার্ন দিতে হয়। প্রথম থেকেই ব্যবসাবান্ধব শুরু করা প্রয়োজন। প্রত্যেকটি ব্যবসার প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। কিন্তু ব্যবসার শুরুতেই অনেক বাধা বিপত্তি থাকে।

তিনি বলেন, ২০০৭ সালে আমরা জাতীয় পরিচয়পত্র করলাম। অন্যদিকে ভারত ২০০৮ সালে করল আধার কার্ড। এখন এই আধার কার্ডের ওপর ভিত্তি করে তারা প্রত্যেকটি সেবা দিচ্ছে। আমরা আগে করেও সেই সুবিধাটা দিতে পারলাম না। এসব কারণে আমরা পিছিয়ে থাকছি।

এফআইসিসিআইর সভাপতি জাভেদ আখতার বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আনতে হলে দেশের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ আসলে শুধু অর্থ নয়, সেখানে জ্ঞান ও প্রযুক্তি আসে। এই জ্ঞান ও প্রযুক্তি সুরক্ষায় নীতিমালা প্রয়োজন। সুরক্ষা দিতে না পারলে বিনিয়োগ আসবে না। বছর শেষে করহারের পরিবর্তন হয়, এটা কোথাও হয় না।

ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী বলেন, স্বাস্থ্যসেবা নিতে প্রতি বছর তিন বিলিয়ন ডলার চলে যায় দেশের বাইরে। দেশে হেলথ ইন্স্যুরেন্স প্রয়োজন। দক্ষতা বাড়াতে ব্যবসায়ী সংগঠন, প্রতিষ্ঠানকে নীতিমালায় সংযুক্ত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, আমাদের প্রধান সমস্যা দুর্নীতি। কীভাবে দুর্নীতি কমানো যায় এটা নিয়ে কাজ করা দরকার। আমাদের ঘুষের ওপর ঘুষ দিতে হয়। সব ব্যবসায়ীর এনবিআর নিয়ে অভিযোগ আছে। পুরো এনবিআরকে নতুন করে সাজাতে হবে। এটা হলে দুর্নীতি ৫০ শতাংশ কমে যাবে।

ডিসিসিআইয়ের সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের প্রধান সমস্যা দুর্নীতি। বাণিজ্য বাড়াতে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। দুর্নীতি বন্ধ করতে অটোমেশন প্রয়োজন।
এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। অন্তর্বর্তী সরকার সব সংস্কার করতে পারবে না। রাজনীতি ও অর্থনীতিকে আলাদা করা যাবে না। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন থেকে একটি বিশেষ গোষ্ঠী তাদের সুবিধা নিয়েছে। এই অবস্থায় সবার আগে রাজনীতির সংস্কার করতে হবে। সরকারকেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

সময়ের আলো/আরএস/ 



Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: