মেট্রোরেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) সব ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করার অভিযোগ রয়েছে সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন সিদ্দিকের বিরুদ্ধে। ডিএমটিসিএলে একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তার বাইরে কথা বলার কেউ সাহস পাননি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সূত্র। তা ছাড়া তার অযোগ্যতার কারণে মেট্রোরেলের কাজ নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে বেশি লাগে। এতে করে ব্যয়ের পরিমাণ বেড়ে যায় বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
অভিযোগ আছে যে, এমডি পদের জন্য যে যোগ্যতা থাকার কথা সেগুলোর কোনোটাই ছিল এমএএন সিদ্দিকের। এ ছাড়া তার পছন্দের লোকদের মেট্রোরেলে বসিয়েছেন যাদের মেয়াদ ছিল অনির্দিষ্টকালের জন্য। নিজের সুবিধার জন্য বাসার কাছে ভাড়া অফিসে কাজ করেছেন তিনি। অন্যদিকে দেশে র্যাপিড পাস থাকার পরও বিদেশ থেকে অধিক দামে এমআরটি পাস কিনেছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়। অথচ এগুলো দেশেই তৈরি করা সম্ভব বলে জানান পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে জানা যায়। এ ছাড়া বিগত সরকারের সময় ক্ষতিগ্রস্ত মেট্রোরেলের স্টেশন সংস্কার করতে ৩৫০ কোটি টাকা এবং এক বছর সময় লাগতে পারে বলে দাবি করা হয়েছিল। তবে মাত্র দেড় কোটি টাকার মধ্যেই চালু করা হয়। এসবের পেছনে এমএএন সিদ্দিকের হাত ছিল বলেও অভিযোগ আছে।
অভিযোগ রয়েছে, এমএএন সিদ্দিক অনৈতিকভাবে নিয়োগ যোগ্যতার নিয়মকে পরিবর্তন করে সেটিকে সম্পূর্ণরূপে আমলাতান্ত্রিক ছকে গড়ে তোলেন। ২০ বছরের অভিজ্ঞতাকে বাদ দিয়ে নিজের জন্য চালু করেন আমলা পদ্ধতি। সে ছাড়াও আরও ২৭ জন পছন্দের লোককে নিয়োগ দেন সেখানে। জাইকার নিয়ম না মেনেই কাজ করতেন তিনি। নির্দিষ্ট সময়ে মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি। সময় বেশি লাগায় খরচও বেড়ে যায় আর এতে করে বাড়াতে হয়েছে ভাড়ার
পরিমাণ। সাবেক এই এমডি যেসব শূন্যতা তৈরি করে গেছে তা পূরণ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তার অন্যতম ভরসা ছিলেন আওয়ামী লীগ সরকরের সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তা ছাড়া বুয়েটের পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক পরিচালনা পরিষদ বোর্ডের সদস্য হওয়ার এক দিনের মধ্যে তাকে সরিয়ে দেন সাবেক এই এমডি। এর জন্য কোনো নোটিসও দেওয়া হয়নি বলে জানা যায়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ডিএমটিসিএলের প্রতিষ্ঠাকালে জাইকা জানিয়েছিল এমডি পদের জন্য সিভিল বা মেকানিক্যাল প্রকৌশলীতে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে যাদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন প্রার্থীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানায়। কিন্তু ২০১৭ সালে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব পদ থেকে অবসর নেওয়া সিদ্দিককে সেই বছরের ২৬ অক্টোবর একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে এমডি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের অনুমোদিত একটি অফিস আদেশের মাধ্যমে উচ্চ বেতনের এই পদে নিয়োগ পান তিনি। তবে এমডি পদে তার কোনো মেয়াদের তথ্য উল্লেখ করা ছিল না।
অভিযোগ রয়েছে, তার কারণে দীর্ঘদিন নিজস্ব ভবনে স্থানান্তরিত হতে পারেনি ডিএমটিসিএলের অফিস। প্রবাসী কল্যাণের ভবন থেকে মাত্র ৭০০ মিটার দূরে রাজধানীর বেইলি রোডের সরকারি অফিসার্স কোয়ার্টার গুলফিশানে থাকতেন সিদ্দিক। নিজের সুবিধার জন্য প্রবাসী কল্যাণ ভবনটি ভাড়া নিয়ে অফিসের কার্যক্রম চালিয়েছেন। এতে করে শুধু অফিস ভাড়া বাবদই মাসে খরচ হতো কয়েক লাখ টাকা। উত্তরার দিয়াবাড়িতে বিশাল জায়গায় মেট্রোরেলের নিজস্ব ভবন থাকলেও এতদিন ভাড়া কার্যালয়ে অফিস করেছেন সিদ্দিক। ফলে ডিএমটিসিএলের গচ্চা দিতে হয়েছে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রবাসী কল্যাণ ভবন ভাড়া নিয়েছে মেট্রোরেল পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ। এমআরটি লাইন-১-এর জন্য ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত ভাড়া দিতে হয়েছে ২ কোটি ৪০ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। তা ছাড়া সাউদার্ন রুটের জন্য ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ভাড়া দিতে হয়েছে ২ কোটি ৬১ লাখ ১৮ হাজার টাকা। এ ছাড়া মেট্রোরেল লাইন-৬-এর জন্য ২০২১ সালের অক্টোবর থেকে গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত ভাড়া দিতে হয়েছে ২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। এতে করে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে প্রবাসী কল্যাণে অফিস ভাড়া নেওয়ার জন্য ডিএমটিসিএলের ব্যয় হয় প্রায় ৭ কোটি ৩৬ লাখ ৮৭ হাজার টাকা প্রায়।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করে জানান, মেট্রোরেল মোট কত টাকার টিকেট কিনেছিল সেটি নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। বিভিন্ন কোম্পানির মাধ্যমে ধাপে ধাপে জাপান থেকে কেনা হয় এমআরটি পাস। এতে করে পকেট ভারী হয় ডিএমটিসিএল এমডির। সাবেক এমডি প্রতিটি ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। মেট্রোরেলের কাজের নামে পরিবার নিয়ে বিভিন্ন দেশে ঘোরার অভিযোগও রয়েছে তার নামে। যে কার্ড দেশে তৈরি করা যায় সেটি তিনি নিজের স্বার্থের জন্য বিদেশ থেকে এনেছেন বলে জানায় বিশেষজ্ঞরা। তারা আরও জানান, তিনি কখনো আইনের তোয়াক্কা করতেন না। নিজের মতো করে কাজ করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমলারা কাজ করার ক্ষেত্রে কখনো কাউকে গ্রাহ্য করেন না। আমলাদের সহযোগীর ভূমিকায় থাকার কথা কিন্তু তারা এখন কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছেন।
ডিএমটিসিএলের টিকেট কেনার ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ জানিয়ে নাম না প্রকাশ করার শর্তে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) এক কর্মকর্তা সময়ের আলোকে বলেন, মেট্রোরেলসহ পরিবহনের সব ক্ষেত্রে র্যাপিড কার্ড ব্যবহার করা যায়। অথচ মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ নিজেদের মতো করে আবারও এমআরটি পাস তৈরি করিয়েছেন। র্যাপিড পাস আর এমআরটি পাস একই কাজ করে। তবে তারা কেন নতুনভাবে এমআরটি পাস করিয়েছেন-সেটিই বুঝে আসে না।
এমআরটি পাসটি আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও একক যাত্রীর টিকেটগুলো ডিএমটিসিএলের অধীনে রয়েছে। ডিএমটিসিএলের এমডিও জানতেন-র্যাপিড পাস দিয়ে মেট্রোরেলের কাজ করা সম্ভব। তাদের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বাড়তি ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ। ডিএমটিসিএল প্রায় ১০ লাখ র্যাপিড পাস কিনেছিল যা দিয়ে এখনও চলছে। বর্তমানে আমাদের কাছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার কার্ড অবশিষ্ট আছে। প্রতিটি কার্ড তৈরিতে প্রায় ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা করে খরচ হয়েছে। তবে ঠিক কত টাকা ব্যয় হয়েছে সঠিকভাবে বলা কঠিন। এখন ঠিকই র্যাপিড পাস দিয়ে তাদের কাজ চালাচ্ছে।
টিকেটের বিষয়ে জানতে চাইলে এমআরটি লাইন-৬-এর প্রকল্প পরিচালক মো. জাকারিয়া সময়ের আলোকে বলেন, মেট্রোরেলের একক যাত্রার টিকেট কেনা হয়েছে ৩ লাখ ১৩ হাজার। তা ছাড়া এমআরটি পাস কেনা হয়েছে ৭ লাখ ৩৮ হাজার। অর্থাৎ মোট ১০ লাখ ৫১ হাজার টিকেট কেনা হয়েছে। আমাদের প্রতিটি একক টিকেট গড়ে প্রায় ১৫০ টাকা খরচ হয়েছে। মেট্রোরেলের এসব টিকেট কেনা হয়েছে জাপানিজ কোম্পানি নিপপোল সিগন্যাল কোম্পানির কাছ থেকে। সবকিছু পরিচালনা করেছেন ডিএমটিসিএলের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন সিদ্দিক। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে নতুন করে কোনো টিকেটের কার্যক্রম করা হয়নি। সবই হয়েছে বিগত সরকারের সময়। টিকেট কয়েকটি ধাপে আনার কারণে আমাদের কাছে সঠিক হিসাব নেই।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (বর্তমান) মোহাম্মদ আবদুর রউফ সময়ের আলোকে বলেন, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই প্রবাসী কল্যাণ ভবন বাদ দিয়ে ডিএমটিসিএলের নিজস্ব অফিসে কাজ করে যাচ্ছি। তবে প্রবাসী কল্যাণ ভবনের অফিসটি একটু সুবিধার ছিল-অস্বীকার করার কিছু নেই। সেখানেই আমাদের সব ধরনের কাজ হতো। সাবেক এমডির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের সত্যটা কতটুকু আমার জানা নেই। মেট্রোরেলের টিকেটগুলো বিভিন্ন ধাপে ধাপে কেনা হয়েছে-তাই সঠিক দাম বলা সম্ভব না। শুরুর দিকে র্যাপিড পাসের কার্ড না থাকায় এমআরটি পাস আনা হয়েছে। তবে দুটির কাজ একই। আগামীতে আর এমআরটি পাস আনা হবে না। ফলে র্যাপিড পাস দিয়েই চলবে কাজ। এখন প্রায় চার লাখ এমআরটি পাস যাত্রীদের কাছে রয়েছে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক সময়ের আলোকে বলেন, সরকার চেয়েছিল সব ধরনের পরিবহনের সুবিধা একটি কার্ডেই পাবে যাত্রীরা। তাই ২০১৩ সালে র্যাপিড পাস এটি তৈরি করে তৎকালীন সরকার। অথচ একটি কার্ড চলমান থাকার পরেই এমআরটি পাস নিয়ে আসার সিদ্ধান্তটি সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। এ ধরনের কার্ড বানানো খুব জটিল কিছু নয়। আমরা ইচ্ছে করলেই তা বানানো সম্ভব। যারা এগুলোর দায়িত্বে ছিলেন তারা অদূরদর্শী ছিলেন। যার ফলে সাধারণ মানুষের এখন ভোগান্তি হয়। ডিএমটিসিএলের সাবেক এমডি সিদ্দিক নিজেই সবকিছু করেছেন স্বার্থ হাসিলের জন্য। অথচ র্যাপিড পাস তৈরি করার সময় তিনি নিজেও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এতে করে দ্বিগুণ টাকা খরচ হয়েছে। জনগণের টাকা এভাবে খরচ করার কারণে অবশ্যই তাকে জবাবদিহি করতে হবে।
এমএএন সিদ্দিক একক আধিপত্য বিস্তার করে পুরো মেট্রোরেলকে পরিচালনা করতেন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, মেট্রো তৈরির আগেই জাইকা এমডি হওয়ার জন্য যোগ্যতা কেমন লাগবে তার একটি মাপকাঠি দিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সেটি তিনি নিজের মতো করে নিয়েছেন। ৩৩ হাজার ৪৭১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা খরচ করে মেট্রোরেল তৈরি করলেও সেখানে ছিল এমএএন সিদ্দিকের একক অধিপত্য। তিনি যা ভালো মনে করেছেন তাই করেছেন। যেখানে সবার প্রযুক্তির দক্ষতা থাকার দরকার সেখানে আমলা নির্ভরতা তৈরি করা হয়। তা ছাড়া আমি প্রথম ডিএমটিসিএল মিটিংয়ে পরিচালনা বোর্ডে বুয়েটের পক্ষ থেকে ছিলাম। প্রায় তিন বছর থাকার পর লাভবান হতে পারছে না বলেই আমাকে সরানোর ব্যবস্থা করে। যা ছিল সম্পূর্ণ অনৈতিক। প্রতিটি পদে নিজের কর্তৃত্ব চালিয়ে গেছেন। যদিও এই কাজের জন্য তিনি ছিলেন অযোগ্য।
উল্লিখিত সব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চেয়ে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন সিদ্দিকের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের অনেক চেষ্টা করার পর তিনি কল ধরেন। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, আমি এখন গণমাধ্যমে কথা বলি না। তাই কিছু বলতে পারব না। কারণ আমি মেট্রোরেলের দায়িত্বে নেই।