গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গীর তুরাগ তীরে ৫৮তম বিশ্ব ইজতেমায় আম ও খাস বয়ান, তালিম ও তাসকিল, নামাজ-কালাম ও জিকির-আজকারের মধ্য দিয়ে কাটল প্রথম ধাপের তিন দিন। প্রায় ১৬০ একর জায়গায় নির্মিত বিশাল শামিয়ানার নিচে নিজ নিজ খিত্তায় কেউ বসে বয়ান শুনছেন, কেউ রান্নাবান্না, কেউ কেউ করছিলেন ওজু ও গোসলের কাজ। ইজতেমা মাঠে শনিবারের চিত্র ছিল এটি। তাবলিগের শূরায়ে নেজাম বা মাওলানা জুবায়ের অনুসারীদের প্রথম ধাপের ইজতেমার আজ আখেরি মোনাজাত। রোববার সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে রাজধানীর কাকরাইল মসজিদের খতিব ও তাবলিগের শূরা সদস্য মাওলানা জুবায়ের আহামেদ মোনাজাত পরিচালনা করবেন। আখেরি মোনাজাতে অংশ নিতে তুরাগ তীরের দিকে শনিবার সন্ধ্যার পর থেকেই যাচ্ছিলেন লাখো মুসল্লি।
শনিবার ফজরের নামাজের পর পাকিস্তানের মাওলানা খোরশেদ সাহেবের বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দ্বিতীয় দিনের কার্যক্রম। ভোর থেকে লাখো মুসল্লি জিকির-আজকার, ইবাদত-বন্দেগি ও হেদায়াতি বয়ান শুনে পার করেন। সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত হয় তালিম। এরপর ওলামাদের উদ্দেশ্যে বয়ান করেন ভারতের মাওলানা ইব্রাহিম দেওলা। তলাবাদের (মাদরাসার ছাত্রদের) উদ্দেশে নামাজের মিম্বরে বয়ান করেন ভারতের মাওলানা আকবর শরিফ। জোহর নামাজের পর বয়ান করেন মাওলানা ইসমাঈল গোদরা। আসর নামাজের পর বয়ান করেন ভারতের মাওলানা জুহায়ের। মাগরিবের পর বয়ান করেন ভারতের মাওলানা ইব্রাহীম দেওলা। আজ রোববার ফজরের পর বয়ান করবেন মাওলানা আবদুর রহমান। আখেরি মোনাজাতের পূর্বে নসিহতমূলক বক্তব্য দেবেন মাওলানা ইব্রাহীম দেওলা।
বিশ্ব ইজতেমার শুরায়ে নেজামের মিডিয়া সমন্বয়ক হাবিবুল্লাহ রায়হান বলেন, আখেরি মোনাজাতে এ ধাপে অংশগ্রহণ করছেন ৪১ জেলা ও ঢাকার একাংশের মুসল্লিরা। জুবায়েরপন্থিদের দ্বিতীয় ধাপের ইজতেমা চলবে ৩ থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এই ধাপে অংশ নেবেন ২২ জেলা ও ঢাকার বাকি অংশের মুসল্লিরা।
শনিবার রাত থেকে টঙ্গী এলাকায় গণপরিবহন বন্ধ: প্রথম পর্বের আখেরি মোনাজাত উপলক্ষে টঙ্গী এলাকায় গতকাল শনিবার রাত ১২টা থেকে গণপরিবহন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শনিবার সকাল ১০টায় বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে কমিশনার ড. নাজমুল করিম খান সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছেন। শনিবার রাত ১২টা থেকে টঙ্গী-কামারপাড়া সড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী থেকে গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস পর্যন্ত এবং আবদুল্লাহপুর থেকে আশুলিয়ার বাইপাইল পর্যন্ত যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে।
এ ছাড়া ময়মনসিংহ ও গাজীপুরগামী যানবাহনগুলোকে গাবতলী দিয়ে কোনাবাড়ী হয়ে এবং ময়মনসিংহ থেকে ঢাকাগামী যানবাহনগুলোকে ভোগড়া বাইপাস হয়ে ৩০০ ফিট রাস্তা ব্যবহার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ সময় এসব সড়কে কোনো পণ্যবাহী গাড়ি বা যানবাহন চলতে পারবে না। তবে ইজতেমা সংশ্লিষ্ট সব ধরনের যান চলাচল স্বাভাবিক থাকবে।
৪ মুসল্লির মৃত্যু : বিশ্ব ইজতেমায় শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মোট ৪ মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। ময়দানে জানাজা শেষে নিজ নিজ পরিবারের কাছে তাদের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। মারা যাওয়া তিন মুসল্লি হলেন- খুলনা জেলার ডুমুরিয়া থানার ডুমুরিয়া বাজার গ্রামের লোকমান হোসেন গাজীর ছেলে আবদুল কুদ্দুস গাজী (৬০), শেরপুর জেলার শ্রীবর্দী থানার রানী মিমুল এলাকার আবদুল্লাহ ছেলে ছাবেত আলী (৭০) ও হবিগঞ্জের বাহুবল থানার রাগবপুর গ্রামের নওয়াব আলীর ছেলে ইয়াকুব আলী (৬০)। হবিগঞ্জ সদরের রামনগর ৩নং তেগরিয়া গ্রামের মৃত দোস্ত মোহাম্মদের ছেলে রমিজ আলী (৬০)।
ইশারা বার্তায় বয়ান আয়ত্ত করেছেন শতাধিক বধির : ইজতেমায় ইশারা বার্তায় ইজতেমার বয়ান আয়ত্ত করেছেন বধিররাও। ময়দানের মূল মঞ্চের সামনে বধিরদের জন্য বিশেষ জামাত তৈরি করা হয়। সেখানেই বিশ্ব ইজতেমার বয়ান তাৎক্ষণিকভাবে শতাধিক বধিরকে ইশারা বার্তায় বোঝানো হয়েছে। কয়েকশ বধির জামাতের সদস্য বিশেষ ইশারা বার্তায় বয়ান আয়ত্ত করছেন। তাদের দেখভালের জন্য বিশেষ জামাতও তৈরি করা হয়েছে।
ইজতেমায় হাসনাত আবদুল্লাহ : বিশ্ব ইজতেমায় গেলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক। শনিবার বেলা ৩টার দিকে ইজতেমা ময়দানের বিদেশি মেহমানদের (গেট-২) দিয়ে তারা প্রবেশ করেন। ময়দান থেকে তাদের অভ্যর্থনা জানান বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব শূরায়ে নেজামের আয়োজক কমিটির মুরব্বি প্রকৌশলী মাহফুজ হান্নান। ময়দানে প্রবেশের পর তারা মুসল্লিদের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করেন। এরপর তারা ইজতেমা ময়দান পরিদর্শন করেন।
বিদেশি অতিথি : শনিবার সকাল ৭টা পর্যন্ত ৮০টি দেশের ২ হাজার ৭ জন মুসল্লি ইজতেমা ময়দানে এসেছে।
ইজতেমা ময়দানে ছিল পানির সংকট : শনিবার জোহরের নামাজের পর কয়েকটি চৌবাচ্চায় পানির সংকট দেখা দেয় বলে অভিযোগ করেছে ইজতেমায় আগত মুসল্লিরা। সকাল সাড়ে ৮টা থেকেই পানি সংকট দেখা দেয়। পানিতে ময়লা ভাসছে বলেও অভিযোগ তার। বেলা ১১টার পর থেকে চৌবাচ্চায় পানি ছিল না। ময়লা পানি দিয়েই ওজু করতে হয়েছে। পানির জন্য রান্নাবান্নার কাজে সমস্যা হচ্ছে।
অপরদিকে মহাসড়ক ও বিভিন্ন রাস্তায় এক বদনা পানি বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকা এবং এক লিটারের পানির বোতল বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়। এ ছাড়া পেপার কিনতে হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ টাকা করে।
ময়দানের মোবাইল নেটওয়ার্ক : ইজতেমা মাঠ ও আশপাশের এলাকায় অধিকাংশ সময় পাওয়া যাচ্ছে না মোবাইল নেটওয়ার্ক। কলড্রপ, ইন্টারনেটের গতিও তুলনামূলক ছিল। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ময়দানে আগত মুসল্লি ও টঙ্গীর কয়েক লাখ মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী। এতে সংবাদকর্মীরাও তথ্য আদান-প্রদানে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
উল্লেখ্য, আজ আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে ৫৮তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের প্রথম ধাপ। ৩ ফেব্রুয়ারি বাদ মাগরিব আম-বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হবে প্রথম পর্বের দ্বিতীয় ধাপ। ৫ ফেব্রুয়ারি আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে প্রথম পর্বের বিশ্ব ইজতেমা। এরপর ৯ দিন বিরতি দিয়ে আগামী ১৪, ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে সাদপন্থিদের আয়োজনে বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব।
সময়ের আলো/এএ/