হাসিনার হাতেই ছিল ইসির সব ক্ষমতা

জাতীয়

ভোটাধিকার, সুশাসন ও মানবাধিকার প্রশ্নে দুই দশকের বেশি সময় ধরে সোচ্চার সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার।

2025-02-20T18:31:24+00:00
2025-02-20T18:35:13+00:00
 
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
হাসিনার হাতেই ছিল ইসির সব ক্ষমতা
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫, ৬:৩১ পিএম  আপডেট: ২০.০২.২০২৫ ৬:৩৫ পিএম
হাসিনার হাতেই ছিল ইসির সব ক্ষমতা
ভোটাধিকার, সুশাসন ও মানবাধিকার প্রশ্নে দুই দশকের বেশি সময় ধরে সোচ্চার সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে প্রথম দিকে যে ৬টি কমিশন গঠন করেছে, সেখানে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনপ্রধানের দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের একজন সদস্যও তিনি। সম্প্রতি সময়ের আলোর সঙ্গে নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে তাদের করা সুপারিশ, ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম ও পরিকল্পনাসহ দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সহ-সম্পাদক মো. অলিউল ইসলাম

প্রশ্ন : নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের কিছু সুপারিশ নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনের সমালোচনা করেছেন। এ বিষয়ে আপনাদের মতামত কী?
বদিউল আলম মজুমদার : হ্যাঁ, আমি অবগত আছি। এ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশন দায়িত্বপ্রাপ্ত। এটি তাদেরই এখতিয়ার, ইংরেজিতে যেটিকে বলা হয় ‘কস্টোডিয়ান’। কিন্তু অতীতে নির্বাচন কমিশন এই কাজটি অনেক কারণে করতে পারেনি। এটি যেন আর না হয়, কমিশন যেন অন্যায় থেকে দূরে থাকে, সেভাবেই আমরা সুপারিশ করেছি। ইসির আপত্তি আমার কাছে বোধগম্য নয়। আমার মনে হয় এ নিয়ে তাদের নতুন করে ভাবার অবকাশ আছে।

আপনাদের সুপারিশ, প্রস্তাব নিয়ে ইসির সঙ্গে কি কোনো আলাপ হয়েছে?
সম্প্রতি কিছু আলাপ-আলোচনা হয়েছে। তবে সুপারিশের বিষয়ে তাদের অভিযোগ নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। সব আপনাদের সামনেই আছে। আপনারাই বিবেচনা করুন।

অতীতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করতে পারেনি কেন?
একটি কারণ সঠিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্ট দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের নিয়োগ দেওয়াই হয়েছে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে কাজ করার জন্য। তাই তারাও ঠিক সেভাবেই কাজ করেছে। আরেকটি কারণ, দলীয় পক্ষপাতদুষ্টের বাইরেও নির্বাচন কমিশনের কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। তাদের ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তারা যদিও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান সাংবিধানিকভাবে, ফলে তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার কথা। কিন্তু কার্যত যেটি হয়েছে, যেকোনো আর্থিক প্রস্তাব তারা অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দিয়েছে। এখানে অর্থ মন্ত্রণালয়ই শেষ কথা। নির্বাচন কমিশন প্রস্তাব দিয়েছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ঠিক তেমনিভাবে আমি যতটুকু দেখেছি এবং জানি, আইনকানুন, বিধিবিধানের বিষয়েও তারা প্রস্তাব দিয়েছে, কিন্তু আইন মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ দুই মন্ত্রণালয়ই নির্বাহী বিভাগের অংশ। অর্থাৎ নির্বাহী বিভাগেরই শেষ কথা ছিল। পরোক্ষভাবে তারা নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে ছিল। নিয়ন্ত্রণ তো আর বলে দিতে হবে না যে, এই কর, ওই কর। অর্থকরী নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে, কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এটি করা হয়। আমরা এর অবসান ঘটানোর চেষ্টা করেছি, যাতে তারা নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে না থাকে।

সেটি কীভাবে?
আমরা যেটি করার চেষ্টা করেছি সেটি হচ্ছে, উচ্চ কক্ষের একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি, যা হবে সর্বদলীয় এবং স্পিকারের অধীনে। এই কমিটির দায়িত্ব থাকবে, কমিশনের যে প্রস্তাব- আইনকানুন, বিধিবিধান কিংবা আর্থিক প্রস্তাব তারা পর্যালোচনা করবে।

এই পর্যালোচনার মানে কি?
এই পর্যালোচনা মানে তারা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কথা বলবে, আলাপ-আলোচনা করবে এবং এর ভিত্তিতে তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবে, যেন এটি কার্যকর করে। এই কমিটি নির্বাচন কমিশনকে নিয়ন্ত্রণ করবে না, ধরবে না এবং দৈনন্দিন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করবে না। এটি বিশেষ সংসদীয় কমিটির উদ্দেশ্যও নয়। এই কমিটির উদ্দেশ্য ইসিকে সহায়তা করা, যেন তারা নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে না থাকে।

তা হলে কমিশন সংসদীয় কমিটির কাছে দায়বদ্ধ?
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কেউই দায়বদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয়। অতীতে সব ক্ষমতা ছিল রাজার হাতে। নির্বাহী ক্ষমতা, আইন প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা, বিচারিক ক্ষমতাসহ সব ক্ষমতাই রাজার হাতে ছিল। এই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়েই কিন্তু এর অপব্যবহার হয়েছে এবং মানুষের অধিকার হরণ হয়েছে। এ জন্যই কিন্তু আমরা রাজতন্ত্র থেকে বেরিয়ে এসে ক্ষমতার বিভাজন করে, বিভক্ত করে, ক্ষমতার বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সের’ জন্য। আমাদের দেশে স্বৈরাচার সৃষ্টি হলো কেন? কারণ সব ক্ষমতা শেখ হাসিনার হাতে কুক্ষিগত হয়ে গিয়েছিল। হাসিনা নির্বাহী বিভাগের প্রধান ছিল। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি ছিল ঠুঁটো জগন্নাথ। বিচার বিভাগ, আইন সভা, নির্বাচন কমিশন সবগুলো প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা হাসিনার হাতে ছিল। সবমিলিয়ে এটি হয়ে গিয়েছিল রাজকীয় ব্যবস্থা। এ জন্যই আমাদের ভোটাধিকার হরণসহ এসব অন্যায়, অপরাধ, অপকর্ম হয়েছে। কোনো প্রতিকার ছিল না। আমাদের একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে ক্ষমতার মধ্যে চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স থাকতে হবে এবং পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর নজরদারিত্বের কাঠামো থাকতে হবে। 

নজরদারিত্ব মানে কি? 
এর মানে ক্ষমতাকে বিভাজন করে একে অন্যের ওপর নজরদারিত্ব করবে, যাতে কেউ ক্ষমতা কুক্ষিগত কিংবা অপব্যবহার করে মানুষের অধীকার হরণ করতে না পারে। আমাদের সংবিধানে বলা আছে, জনগণ সব ক্ষমতার মালিক। আমাদের সবাইকে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হবে।

তা হলে ইসি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ হবে কীভাবে?
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণই সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। এই সিদ্ধান্ত তারা নিজেরা নেয় না, প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নেয়। অতএব জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করে জনগণের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে। ইলেকশন কমিশন মনে করছে, তাদের নির্দেশ দেবে। এটি আমাদের সংসদীয় ব্যবস্থা সম্পর্কে সঠিক ধারণা নয়। তাদের নির্দেশ দেওয়ার কোনো ক্ষমতাই নেই। এই যে আমাদের গত তিনটি নির্বাচন কমিশন, তারা কিন্তু এই বিতর্কিত, জালিয়াতির নির্বাচনগুলো করেছে। তাদের কোনোরকম দায়বদ্ধ করার কোনো সুযোগ আছে? তারা যখন দায়িত্বে ছিল তখন কিন্তু সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে তাদের রাষ্ট্রপতির কাছে যাওয়ার সুযোগ ছিল। এটি করার চেষ্টা আমরা করেছি, কিন্তু পারিনি। অর্থাৎ ওটিও কাজ করেনি। অর্থাৎ তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। এ জন্যই তাদের বিরুদ্ধে যদি গুরুতর অভিযোগ উঠে, তা হলে সেটি ওই উচ্চ কক্ষের কমিটি রাষ্ট্রপতির কাছে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলবে। এখন ইসি যদি কোনো অন্যায় না করে, তা হলে এটি তো প্রয়োগই হবে না। বস্তুত এটি হচ্ছে গার্ডরেইল। সিঁড়িতে যে রকম গার্ডরেইল বানায়, যাতে কেউ পড়ে না যায়, তেমনি এটি করা হয়েছে যাতে তারা অন্যায় করে পড়ে না যায়। তারা যেন অন্যায় থেকে দূরে থাকে।

ইসিকে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে হলে তাদের কী ধরনের আর্থিক স্বাধীনতা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
আমরা বলেছি, ইসির নির্বাচন সংক্রান্ত ব্যয় হবে প্রজাতন্ত্রের যে কনসোলিডেটেড ফান্ড, তাতে দায় যুক্ত হবে। অর্থাৎ তারা যা চাইবে, ওটাই পাবে। সে রকম একটি আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার। এখন আছে, তাদের যে পারিশ্রমিক ও দফতরের অর্থকড়ি প্রজাতন্ত্রের কনসোলিডেটেড অ্যাকাউন্টের সঙ্গে দায়যুক্ত। কিন্তু আমরা বলেছি, নির্বাচন সংক্রান্ত সব ব্যয় যুক্ত। আমরা তাদের আর্থিক স্বাধীনতা যাতে নিশ্চিত হয়, সেই প্রস্তাব আমরা করেছি। তারা যাতে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে না থাকে, সেই প্রস্তাব করেছি। একই সঙ্গে আমরা প্রস্তাব করেছি, তারা যাতে অন্যায় থেকে দূরে থাকে। কারণ অন্যায় করলে এর পরিণতি আছে। এর একটি তদন্ত হতে পারে। সে জন্য আমরা এটি করেছি।

ইসির আইনগত স্বাধীনতা কতটুকু থাকা প্রয়োজন?
আমরা আরপিওতে নির্বাচন কমিশনকে ক্ষমতায়িত করেছি। যদি তারা মনে করে নির্বাচনটি সঠিক হবে না, যেমন ২০১৪ ও ২০২৪ সালে এটি পরিষ্কার ছিল যে, একতরফার নির্বাচন হচ্ছে। তখন আমরা নির্বাচন কমিশনকে ক্ষমতা দেওয়ার সুপারিশ করেছি যে, তারা রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে একটি রেফারেন্স পাঠিয়ে নির্বাচন নিয়ে আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট থেকে ৯০ দিনের জন্য নির্বাচন স্থগিতের সম্মতি পেতে পারে। একই সঙ্গে আমরা বলেছি যে, ধরুন একটি নির্বাচন হলো। নির্বাচন কমিশনের কিন্তু দায়িত্ব সুষ্ঠু নির্বাচন করার। এখন নির্বাচনের পর রিটার্নিং অফিসাররা ফলাফল ঘোষণা করল। কমিশন ওই ফলাফলের ভিত্তিতে গেজেট প্রকাশ করল। এখন এই নির্বাচনগুলো সঠিক হলো কি না হলো, নির্বাচন কমিশনকে এর দায় নিতে হবে। তারা তো এখন বলে রিটার্নিং অফিসাররা করেছে। কাজেই এটিই ফলাফল। কিন্তু নির্বাচন কমিশনকে দায় দিতে হবে। নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত বা সৃষ্টি করা হয়েছে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য। তাদের বলতে হবে যে, নির্বাচন সঠিক হয়েছে, সুষ্ঠু হয়েছে, অবাধ হয়েছে, গ্রহণযোগ্য হয়েছে কিংবা হয়নি। এই সার্টিফিকেশন... এই যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সব স্টেটেই নির্বাচন হয়। তারপর একটি কংগ্রেস হয় তাদের ওখানে। সেই প্রতিনিধি পরিষদে সব সার্টিফাই করতে হয়। আমরা তো ওখানেও যাচ্ছি না। আমরা বলেছি, তারাই সার্টিফাই করুক নির্বাচন সঠিক হয়েছে কি না।

ঐকমত্য কমিশনের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। আপনি এই কমিটির একজন সদস্য। অভ্যুত্থানের ছয় মাস পর সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে আসার সম্ভাবনা কতটুকু দেখেন?
ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার বিষয়টি খুবই জটিল। এটি দুর্ভাগ্যজনক যে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি অনৈক্য সৃষ্টি হয়, তা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। আমরা আশা করি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে যেই উদ্দেশে আমাদের এতগুলো প্রাণহানি ঘটল, এতগুলো মানুষ আহত হলো, তাদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে আমরা কতগুলো মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারব।

আপনারা রাষ্ট্র গঠনে সুপারিশমালা প্রণয়ন করেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কারের বদলে ক্ষমতায় যাওয়া নিয়েই বেশি ব্যস্ত, যা নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর রেহমান সোবহানদের সংস্কার প্রচেষ্টাকালেও দেখা গেছে। এই পুনরাবৃত্তির মধ্য দিয়ে আসলেই কী কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসবে?
এটি যদিও দুর্ভাগ্যজনক, তবে রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতা যাওয়ার জন্যই রাজনীতি করে। ফলে তাদের রাজনীতি স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতাকেন্দ্রিক হবে। আর পরিবর্তন যে নেই, তেমনটিও নয়। একটি পরিবর্তন তো হয়েছে। সরকারে থেকে জনবিরোধী কাজ করে যে পার পাওয়া যাবে না, এই উপলব্ধি আমাদের সবার মাঝেই এসেছে। হাসিনারা ধরে নিয়েছিল যাই তারা করে, পার পেয়ে যাবে। কিন্তু এটি আবার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অন্যায় করলে মানুষ প্রতিবাদ করবে এবং তা চরম ঝুঁকি নিয়ে হলেও। আমাদের এ ইতিহাস মনে রাখতে হবে। ইতিহাস ভুললে চলবে না।

জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচনের আলোচনা হচ্ছে। একজন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ হিসেবে আপনার কী মত?
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকারের আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে এর সিদ্ধান্ত হবে। আমার মনে হয়, আমরা যে জরিপ করেছি, জনগণ জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চায়। বিরাট জনগোষ্ঠী এটি চায়। তারা নিজেদের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে মনে করে। এখন এটি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঠিক হবে।

অনেকে অভিযোগ করছেন, আগে স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের উদ্দেশ্য বিএনপিকে অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল করে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়কদের নতুন দলকে জাতীয় নির্বাচনে সুবিধা দেওয়া। যেহেতু স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনকেন্দ্রিক নিজ দলের মধ্যে একাধিক প্রার্থী দাঁড়ায়, তারা নিজের মধ্যে মারামারি করে, এমনকি নিহত হওয়ার ঘটনাও অমূলক নয়-
আমাদের একটি ভূমিকা থাকবে নির্বাচন নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর ব্যাপারে সহায়তা করার। আমরা কোনো দলের, কোনো পক্ষের প্রতিনিধিত্ব করছি না। আমরা চেষ্টা করব জনগণের স্বার্থে, জনগণের কল্যাণে এবং আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করার জন্য ভূমিকা রাখতে। আমি আশা করি, এ ব্যাপারে আমরা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারব।

আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ বা জাতীয় নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক চলছে। কেউ কেউ দাবি করছেন, আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ভারতকে সরাসরি আমাদের রাজনীতিতে নাক গলানোর আমন্ত্রণ জানানো। অন্যদিকে জাতিসংঘসহ পশ্চিমা দূতাবাসগুলো দল নিষিদ্ধ করার বিরোধিতা করেছে। আপনাদের মূল্যায়ন কী?
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হবে কি না তা প্রথমত নির্ভর করবে সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর। আর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে কি
পারবে না, এই সিদ্ধান্ত আলটিমেটলি নির্বাচন কমিশনকে নিতে হবে। নির্বাচন কমিশনের বিধিবিধান, আইনকানুনের আলোকে এটি ঠিক হবে। এখন সময়ই বলে দেবে আওয়ামী লীগের ভাগ্যে কি ঘটে। এ নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার কোনো এখতিয়ার আমাদের নেই।

গত ছয় মাসে অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা আপনার দৃষ্টিতে কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে?
একটি জিনিস কি, আমার মনে হয়, মানুষের আকাক্সক্ষা এত আকাশচুম্বী ছিল যে, আমরা ব্যর্থতা দেখি, দেখতে পাই। তবে সফলতাও আছে। আবার বিরাট বিরাট ব্যর্থতা আছে। কারণ আমরা যখন আকাশচুম্বী আকাক্সক্ষার সঙ্গে তুলনা করি, অনেক ক্ষেত্রেই সরকার ব্যর্থ। আমরা হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর এমন একটি অবস্থায় অধঃপতিত হয়েছিলাম। অনেক ক্ষেত্রে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ দেখাতে পারছে না, এটি যেমন সত্য, তেমনি আমাদের চিন্তা করতে হবে আমাদের আকাশচুম্বী আকাক্সক্ষা এবং একই সঙ্গে এটি কোনো মানুষের পক্ষে এগুলো সমাধান করা কি সহজ হতো? আমার মনে হয় না। হয়তো এই সরকার যা করছে, তার চেয়ে ভালো করতে পারত। কিন্তু এগুলো সমাধান করা কি অত সহজ? আমার মনে হয়, কারও পক্ষেই সম্ভব হতো না।

সরকারের কোন বিষয়গুলো প্রাধান্যে থাকা উচিত বলে আপনার মনে হয়? আমরা দেখছি অভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসাসেবার জন্য রাস্তায় নামতে হচ্ছে।
এটিও সরকারের একটি বড় ধরনের ব্যর্থতা। এই জিনিসটি তারা সঠিকভাবে সুরাহা করতে পারেনি। সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করতে পারেনি। তাদের যেই সহায়তা দেওয়া উচিত ছিল, তাদের পাশে দাঁড়ানোর কথা ছিল, সেটি সঠিকভাবে করতে পারিনি। এটি সত্য। এখন আমাদের এই সংকট কাটিয়ে উঠতে হবে। আশা করি, সরকার এটি সঠিকভাবে করবে।

কিন্তু এমনটা কি হওয়ার কথা ছিল? নিহত-আহতদের রক্তের ওপর এই সরকার দাঁড়িয়ে। তাদের আর্থিক প্রণোদনার বিষয়টি সরকারের অগ্রাধিকারে থাকবে না কেন?
এটি সর্বাগ্রে করার দরকার ছিল। দুর্ভাগ্যবশত সেখানে অপরাগতা প্রদর্শিত হয়েছে। সরকারের যেই তৎপরতা প্রদর্শনের দরকার ছিল, সেটি করেনি।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাস্তাঘাটের অবস্থা কেমন দেখছেন?
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে বড় একটি সমস্যা। আমাদের এর থেকে ভালো কিছু করতে হবে যেন পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে। একই সঙ্গে এটিও ঠিক যে, আমাদের প্রায় দুই লাখের মতো পুলিশ। এদের একটি বিরাট অংশই স্বৈরাচারী সরকারের দোসর হিসেবে গুরুতর, ভয়ানক ভূমিকা পালন করেছে। এদের অনেকেই পলাতক। বস্তুত পুরো বাহিনীটিই ভেঙে পড়েছে। এই বাহিনীকে সংস্কার করে কার্যকর করা সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। এখনও সেই কাক্সিক্ষত মাত্রায় করতে পারেনি। এখানে আরও যেটি হয়েছে, যারা অভিজ্ঞ ছিল, তারা হয় পালিয়ে গেছে কিংবা জেলে আছে, কেউ কেউ ওএসডি হয়ে আছে। আবার যাদের বাইরে থেকে আনা হয়েছে, অতীতে যারা বঞ্চিত ছিল, তাদের অনেক ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার ঘাটতি আছে। প্রত্যাশা করি, সরকার এগুলো কাটিয়ে উঠতে পারবে।

সরকারের দোসরের কথা যদি বলেন, একটু আগে আপনি বিবিএসের জরিপের কথা বলছিলেন। এই বিবিএসের জরিপ মাঠ পর্যায়ে যারা পরিচালনা করে, তারাই বিগত হাসিনার আমলে সরকারের মনোভাবের প্রতিফলন জরিপে ঘটাত। ওই লোকেরা কি রাতারাতি বদলে গেছে?
আমার মনে হয় না, আমাদের জরিপে বানোয়াট ফলাফল দিয়েছে। অনেক প্রশ্নের উত্তরের ফলাফল আমাদের কাছেও সঠিক মনে হয়েছে। আমরা তো মানুষের সঙ্গেও কথা বলেছি বিভিন্ন জায়গায়। আবার কিছু কিছু প্রশ্নের উত্তরের ফলাফলে আমরা যেমনটি মনে করেছিলাম, সে রকম হয়নি। তাই আমার মনে হয় না, জরিপ নিয়ে সমস্যা আছে। আমার মনে হয়েছে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা পেশাদারিত্ব প্রদর্শন করেছে।

গত তিনটি নির্বাচন যারা আয়োজন করেছে, সেসব সরকারি কর্মকর্তারা কিন্তু এখনও বহাল তবিয়তে এবং তাদের অনেকেই বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়সহ বড় বড় করপোরেশনগুলোতে কর্মরত।
আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছি। ২০১৮ সালের রাতের ভোট যারা আয়োজন করেছে, তদন্ত করে তাদের বিচারের আওতায় আনার কথা বলেছি। সরকার ইতিমধ্যে ২০১৮ সালের নির্বাচনে দায়িত্বে থাকা ৩৩ জন সাবেক ডিসিকে ওএসডি করেছে। এছাড়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলেছি, শুধু ২০১৮ সালের নির্বাচনই নয়, তার আগের ও পরের নির্বাচনে যারা অনিয়ম করেছে, তাদেরও বিচারের আওতায়, তদন্তের আওতায় আনা দরকার। বস্তুত যারাই অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত, তাদের সবাইকে বিচারের সম্মুখীন করতে হবে।

আপনাদের এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের সম্ভাবনা দেখেন?
আমরা তো প্রস্তাব করেছি। এখন সবাই মিলে কি সিদ্ধান্ত নেয়, কতটুকু জায়গায় ঐকমত্য হয়, দেখা যাক।

গত ১৫ বছরে নির্বাচন কমিশনের মাঠ পর্যায়ে যেসব কর্মকর্তা ছিল, তারাও বহাল তবিয়তে। তারা আগে যেভাবে দলদাসের পরিচয় দিয়েছে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে হঠাৎ করেই কি নিরপেক্ষ হতে পারবে?
হ্যাঁ, গত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে জালিয়াতি হয়েছে। এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অনেক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। একই সঙ্গে কিছু কিছু আমলাও নির্বাচন কমিশন নিয়ন্ত্রণ করেছে। তাদের ইসিতে নিয়োগই দেওয়া হয়েছে জালিয়াতি করার জন্য। আমাদের আরপিওর ৭৩ থেকে ৯০ ধারায় নির্বাচনি অপরাধের শাস্তির কথা বলা হয়েছে। কারও বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শাস্তি বা বিচারের কিংবা মামলা হওয়ার কথা আমরা শুনিনি। তদন্ত করে এদের সবাইকে বিচারের আওতায় আনা দরকার। আমরা আরও প্রস্তাব করেছি যে, মামলার যে সময়সীমা, তা শিথিল করে দেওয়া, যেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আমরা দেখছি মাজারে হামলাসহ মেয়েদের ফুটবল খেলা বন্ধ করে দেওয়া, নায়িকাদের দোকান উদ্বোধনে বাধা আসছে। সরকার থাকার পরও এসব কর্মকা- কীসের ইঙ্গিত বহন করে?
এগুলো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিছু স্বার্থান্বেষী মহল সুযোগ নিচ্ছে। এগুলো অবসান হওয়া দরকার। যত দ্রুত অবসান হয়, ততই মঙ্গল আমাদের সবার জন্য।

আমাদের সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
আপনাদেরও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: