জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী হাসিনা পালিয়ে দিল্লিতে আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে মিথ্যা বয়ান দেওয়ায় টানাপড়েন বেড়েই চলছে। এমন পরিস্থিতিতে ঢাকা থেকে দিল্লিকে একাধিকবার বার্তা দেওয়া হয়েছে যে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সত্যিকারের বন্ধুত্বের সম্পর্ক চায়। সবশেষ পরিস্থিতিতে ঢাকার বিশ্লেষকরা প্রত্যাশা করছেন যে টানাপড়েন ঘুচিয়ে দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র স্বাভাবিক সম্পর্কের দিকে যাচ্ছে।
ঢাকার ক‚টনীতিকরা বলছেন, ৫ আগস্টের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লিতে আশ্রয় দেওয়া, সীমান্ত বিরোধ, বাংলাদেশ নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের মিথ্যাচার মূলত এই তিন ইস্যুই দুই পক্ষের সম্পর্ক চরম নেতিবাচক জায়গায় নিয়ে যায়। এসব ইস্যুতে বাংলাদেশ একাধিকবার ভারতের ভুলগুলো নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে বার্তা দিয়ে সত্যিকারের সম্পর্ক গড়ার আগ্রহ প্রকাশ করে।
এর মধ্যে গত ডিসেম্বরে ঢাকায় দুই পক্ষের মধ্যে ফরেন অফিস কনসালটেশন বৈঠক, দিল্লিতে এনার্জি সপ্তাহের (১০-১১ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টার অংশগ্রহণ এবং দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ওমানে সম্পর্কের সমস্যা ও সমাধান কীভাবে হতে পারে তা নিয়ে ওমানে গত রোববার (১৬ ফেব্রুয়ারি) অষ্টম ইন্ডিয়ান ওশেন রিম অ্যাসোসিয়েশন (আইওরা) সম্মেলনের সাইড লাইনে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের মধ্যে আলাপ হয়। সামনে পানি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠানের জন্য চেষ্টা চলছে। সম্পর্কের মেকানিজমের আরও দুয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠানের পর আগামী এপ্রিলে বাংলাদেশ-ভারত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠান করতে চাচ্ছে ঢাকা। ঢাকা মনে করছে দিল্লি তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে এবং সামনের দিনে টানাপড়েন কাটিয়ে উভয় পক্ষ নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় একসঙ্গে কাজ করবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওমানে অনুষ্ঠিত অষ্টম ইন্ডিয়ান ওশেন রিম অ্যাসোসিয়েশন সম্মেলনের সাইড লাইনে গত ১৬ ফেব্রæয়ারি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে উভয়েই দ্বিপক্ষীয় একাধিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে আলোচনা করেন। বাংলাদেশ ও ভারত দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এই মুহূর্তে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেগুলো কাটিয়ে ওঠার বিষয় নিয়ে দুই দেশের মন্ত্রী বৈঠকে আলোচনা করেন। বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা গঙ্গা নদীর পানি চুক্তি নবায়নের গুরুত্ব উপস্থাপন করেন। এ ছাড়া বৈঠকে তিনি সার্কের (দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা) স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠান জরুরি বলে ভারতকে বার্তা দেন এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার জন্য ভারত সরকারকে অনুরোধ করেন।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ভারতীয় একটি গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বাস করে যে এগিয়ে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশ-ভারত দুই পক্ষের মধ্যে ভালো সম্পর্ক প্রয়োজন। বাংলাদেশের সরকার সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য কাজ করছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আমার খুব ভালো একটি বৈঠক হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি যে আমরা উভয়েই দুই পক্ষের বিষয়গুলো বুঝি। আমাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক এবং অধ্যাপক নাজমুল ইসলাম দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু হয়। মূলত ভারত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে অতি মাত্রায় প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করাতেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি। সবশেষ ওমানে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের আলাপ-আলোচনা ইঙ্গিত দেয় যে এই টানাপড়েন শেষের দিকে। আবার গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনে ট্রাম্প-মোদি বৈঠকে ভারত বাংলাদেশ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের তেমন পাত্তা পায়নি। ভারত এখন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাচ্ছে বলেই আভাস পাওয়া যাচ্ছে। কেননা সামনে বাংলাদেশের নির্বাচন। নির্বাচন শেষে রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসবে। ভারত নিজেদের স্বার্থেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেবে। সে জন্যই অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে এখন সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায়, যার মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে যাবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, বাংলাদেশ-ভারত দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। সম্পর্ক অনেক সময়েই ওঠানামা করেছে এবং দুই পক্ষই সহযোগিতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করেছে। এই সম্পর্কের একাধিক বহুমুখী দিক রয়েছে। বাংলাদেশের কাছে ভারত বড় একটি উন্নয়ন অংশীদার। আবার ভারতের কাছে বাংলাদেশ বড় একটি বাজার। সব ছাপিয়ে দুই পক্ষের সম্পর্ক এখন সহযোগিতার মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক পথের দিকে এগুচ্ছে। তবে এর মধ্যে রাজনৈতিক কিছু বিষয় আছে, যা সমাধানের জন্য আরও সংলাপ বা আলোচনার প্রয়োজন হবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত সাব্বির আহমেদ চৌধুরী দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, সবশেষ পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে যে আলাপ-আলোচনা হয়েছে তাতে নতুন কিছু পেলাম না। সম্পর্কে যে টানাপড়েন চলছে তার মূলে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লিতে আশ্রয় দেওয়া, সীমান্ত বিরোধ, বাংলাদেশ নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের মিথ্যাচার। সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে বহিঃসমর্পণ চুক্তির আওতায় দিল্লিকে ঢাকার কাছে ফেরত দিতে হবে। এসব বিষয় সমাধান না হলে সম্পর্কে গতি ফিরবে না। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে যেন সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়।