বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান। গত বছরের ৫ আগস্ট সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও বিরাজমান বাস্তবতা, দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা প্রশ্নসহ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে সময়ের আলোর সঙ্গে একান্তে কথা বলেছেন তিনি। বলেছেন, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে যে জনআকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে, তা পূরণে মনোযোগী হতে হবে। আ ন ম মুনীরুজ্জামানের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দৈনিক সময়ের আলোর ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রতিবেদক এমএকে জিলানী।
সময়ের আলো: ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের পরিস্থিতি আপনি কীভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন?
আ ন ম মুনীরুজ্জামান: ৫ আগস্ট পরবর্তী পর্যায়ে বাংলাদেশে অভ‚তপূর্ব পরিবর্তন এসেছে। আমরা স্বৈরাচারকে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়ন করতে পেরেছি। স্বৈরতন্ত্রকে আমরা স্তব্ধ করতে পেরেছি। আমরা নতুন গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। প্রথমত বাংলাদেশে গণতন্ত্রের যে আকাক্সক্ষা তা অনেক ব্যাপক এবং উঁচু। সবক্ষেত্রে হয়তো সেই আকাক্সক্ষা এত অল্প সময়ের মধ্যে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে দেখা যাচ্ছে, কয়েকটি বিশেষ বিশেষ ব্যাপারে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়াতে জনগণের মনে একটা অস্বস্তি বিরাজ করছে। বিশেষত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে পর্যায়ে আছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য বলা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে কোনো কোনো এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে। পুলিশের যে ধরনের কাজ করার কথা, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ সে ধরনের কাজ করছে না বা করতে পারছে না। তাদের কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে গিয়েছিল, সেটি আবার নতুন করে জোড়া দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও এখন পর্যন্ত তারা সম্পন্নভাবে একটি সক্ষম বাহিনীতে পরিণত হয়েছে তা বলা যাবে না। এখানে আরও কঠোরভাবে নজর দিতে হবে। এখানে যারা নেতৃত্বে আছেন তাদেরও এই বিষয়ে নতুন করে দৃষ্টি দিতে হবে। নতুন পরিস্থিতিতে যে ধরনের নেতৃত্বের প্রয়োজন সে ধরনের নেতৃত্ব পুলিশের ভেতরে বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এখন পর্যন্ত দেখতে পাইনি। সেখানে একটা বড় ধরনের ঘাটতি আছে, যা পূরণ করতে হবে। এ ছাড়া বাজারের দ্রব্যমূল্য বা জিনিসপত্রের দাম যে পর্যায়ে আছে তা নাগালের বাইরে। সেখানে মানুষের বড় ধরনের অস্বস্তি আছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভ্যুত্থান-পরবর্তী যে ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটা উচিত ছিল, তা আমরা দেখতে পাইনি। উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের মধ্যে যেমন ধরনের গতি আসার উচিত ছিল তা দেখা যায়নি। তারা গতানুগতিকভাবে ঢিলেঢালা কাজ করে যাচ্ছে। এতে দেশবাসীর আকাক্সক্ষার সঙ্গে প্রতিফলন ঘটছে না।
সময়ের আলো: সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝুঁকি কতটুকু?
আ ন ম মুনীরুজ্জামান: অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ঝুঁকির থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা। এখানে এ ধরনের ঘটনা (মব জাস্টিস, ছিনতাইসহ নানা নিরাপত্তা ঝুঁকি) যদি অহরহ ঘটতে থাকে, তা হলে অভ্যন্তরীণ যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা দরকার, সামাজিক যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা দরকার সেখানে বড় ধরনের আঘাত আসছে। এর থেকে জনমনে যে আশঙ্কা বা ভয়ভীতির সৃষ্টি হচ্ছে তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ ছাড়াও বর্তমানে বাংলাদেশে এই ধরনের ঘটনা ঘটার কারণে বর্হিবিশ্বে বাংলাদেশের যে চিত্র প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটি বাংলাদেশের যে ভাবমূর্তি থাকা দরকার তার জন্য একেবারেই সহায়ক না। বাংলাদেশের এমন ভাবমূর্তি যদি বিদেশে চলে যায়, তা হলে আমরা যে ধরনের ব্যবসা বা যে ধরনের বিনিয়োগ বিদেশ থেকে আনার চেষ্টা করছি তা কোনো সহায়ক ভ‚মিকা পালন করতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে আমি বলতে চাই যে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখা দরকার। অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতায় বিঘ্ন ঘটলে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হবে।
সময়ের আলো: কৌশলগত কারণে বৈশ্বিক পরাশক্তির দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়েছে। বাংলাদেশ এখন সম্মুখসারির দেশ। বিগত সরকারের আমলে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এখানে দেখা গেছে। অতীতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ভারতসহ বড় দেশগুলো বিবৃতি বা পাল্টা বিবৃতি দিয়েছে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার যে কথা আপনি বললেন সেখানে বর্হিবিশ্বের বিবেচনায় বাংলাদেশের সামনে দিনগুলো কেমন হতে পারে?
আ ন ম মুনীরুজ্জামান: আমাদের সামাজিক যে নিরাপত্তা থাকা দরকার তা আমাদের জনগণের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে যদি অব্যাহতভাবে সামাজিক নিরাপত্তা যদি বিঘ্নিত হতে থাকে তা হলে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি বা চ্যালেঞ্জ হয়ে আসবে। বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে (ভূ-রাজনীতিতে অবস্থানের কারণে) একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। বর্হিবিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যোগাযোগের জন্য চেষ্টা করা হবে, এটাই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পরিস্থিতি যদি একটি অস্থিতিশীল ভাবমূর্তি বিদেশে প্রকাশ পায় সেটি বাংলাদেশের জন্য কোনোভাবেই সহায়ক ভূমিকা পালন করবে না। যেমন আমাদের কৌশলগত অবস্থানের ওপর হুমকি বা চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। এ ছাড়া আমাদের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে যে ধরনের বিনিয়োগ আসার কথা তার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হতে পারে। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা সবকিছুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অতি সত্বর এগুলোকে আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে সমাধান করতে হবে।
সময়ের আলো: গত ৫ আগস্টের আগে বাংলাদেশে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর এক ধরনের উপস্থিতি ছিল বলে অনেকে মনে করেন। এই সময়ে অনেকেই বলছেন যে ‘র’ এর জায়গায় এখন পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশে তৎপর হচ্ছে। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
আ ন ম মুনীরুজ্জামান: এ ধরনের কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত বাহ্যিকভাবে দেখা যায়নি। এগুলোর অনেক কিছুই এক ধরনের ধারণা থেকে বলা হচ্ছে। আমি আশা করব এ বিষয়ে কোনো অনুমানভিত্তিক মন্তব্য না করতে। আমি চাই যে সবকিছু আমরা যেন বিশ্লেষণ করি, নিরাপত্তা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে হোক বা ক‚টনৈতিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে হোক, যাই হোক না কেন তথ্যভিত্তিক হতে হবে। কোনো অনুমান বা ষড়যন্ত্রতত্ত¡নির্ভর বিশ্লেষণ করা ঠিক হবে না। আমাদের সমস্যাগুলো আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়, যা আমাদেরই সমাধান করতে হবে। এই সমাধান করতে না পারার কারণে অন্য কারও ওপর চাপিয়ে দেওয়া একেবারেই উচিত হবে না।
সময়ের আলো: গত ৫ আগেস্টের পর বাংলাদেশে যে আমূল পরিবর্তন হয়েছে তা প্রতিবেশী দেশ ভারত এখনও শতভাগ অনুধাবন করতে পারেনি। ভারতের গণমাধ্যমগুলো বাংলাদেশ নিয়ে প্রতিনিয়ত মিথ্যা তথ্য, গুজব বা প্রপাগান্ডা ছড়াচ্ছে। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
আ ন ম মুনীরুজ্জামান: আমিও মনে করছি যে বাংলাদেশের জনগণের দ্বারা যে আমূল পরিবর্তন ঘটেছে, তা হয়তো ভারত সম্পূর্ণভাবে অনুধাবন করতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রেই ভারত যে ধরনের তথ্য সেখান থেকে ছড়াচ্ছে সেটি একটি অপতথ্যের পর্যায়ে চলে গেছে। এ কারণে আমাদের যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক থাকা দরকার, সেখানেও বড় ধরনের আঘাত আসছে। ভারতের গণমাধ্যমগুলো এ ক্ষেত্রে সহযোগিতার সম্পর্ক পালন করছে না, তারা বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বা ভুল তথ্যের ওপর নির্ভর করে যে তথ্য প্রকাশ করছে, তার থেকে এমন ভুল বা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি সঠিকভাবে অনুধাবন করাটা ভারতের পক্ষে খুবই জরুরি। কারণ শেষ পর্যন্ত এই দুটি দেশ প্রতিবেশী রাষ্ট্র। সরকার রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তবে তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ জনগণ। এই দুই দেশের জনগণের মধ্যে যে ধরনের বোঝাপড়া বা সুসম্পর্ক থাকা প্রয়োজন, তার প্রতিফলন ঘটবে জনগণের আকাক্সক্ষার ওপরে। বাংলাদেশের পরিবর্তন বাংলাদেশের জনগণ করেছে। এটি সবাইকে (বর্হিবিশ্ব) গ্রহণ করতে হবে। গ্রহণ করে নতুন চলার পথ খুঁজে বের করতে হবে। সে ধরনের পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত আমরা ভারতের কাছ থেকে সঠিকভাবে দেখতে পাইনি। প্রত্যাশা করব যে ভারত ভবিষ্যতে নতুন পথচলার ক্ষেত্রে দৃষ্টিপাত দেবে।
সময়ের আলো: গত ৫ আগস্টের আগে ভারতের সঙ্গে শিক্ষা, বাণিজ্য, চিকিৎসাসহ ব্যাপক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক ছিল। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপড়েন সৃষ্টি হলে শিক্ষা, বাণিজ্য, চিকিৎসাসহ যেসব ক্ষেত্রে ভারতের অনাগ্রহ দেখা যাচ্ছে। একটা ঘাটতির সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার বিকল্পভাবে সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে। অনেকেই বলছেন যে ভারতের ঘাটতি চীন, পাকিস্তানসহ একাধিকভাবে পূরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। আপনি কী মনে করছেন?
আ ন ম মুনীরুজ্জামান: দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো শূন্যতার সৃষ্টি হলে তা অন্য কেউ পূরণ করে ফেলে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে যে টানাপড়েন চলছে তার ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সহযোগিতার ওপর একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়েছে। আমরা সব দেশের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক রাখতে চাই।
সময়ের আলো: বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের গুরুত্ব রয়েছে এবং এই ইস্যুতে বাংলাদেশের নিজস্ব নীতি রয়েছে। বাংলাদেশ চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোডে উদ্যোগের কৌশলগত অংশীদার। আমরা ভ‚-রাজনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা করে এগিয়ে চলার নীতিতে বিশ্বাসী। সবার সঙ্গে ভারসাম্য এবং সহযোগিতার নীতি সামনের দিনে বাংলাদেশকে কেমন চ্যালেঞ্জে ফেলতে পারে?
আ ন ম মুনীরুজ্জামান: বাংলাদেশ কৌশলগত দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। বাংলাদেশ একটি মেরিটাইম নেশনও। একই কারণে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্বটা আগের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে। এই কারণে বিভিন্ন পরাশক্তি বা গুরুত্বপূর্ণ শক্তিগুলো আছে তাদের সবার নজর আগের চেয়ে বাংলাদেশের প্রতি এখন অনেক বেশি। বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের যে সম্পর্ক সেখানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। আমরা জানি যে বর্তমান বিশ্বে কৌশলগতভাবে দুটি বলয় আছে এবং বর্তমানে যে ধরনের কৌশলগত প্রতিযোগিতা চলছে, বিশেষ করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে, তাদের মাধ্যমে যে কৌশলগত বলয়ের সৃষ্টি হয়েছে তা আরও বৃদ্ধি পাবে। এ ক্ষেত্রে আমরা যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলছি তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
আশা করব ইতিপূর্বে আমরা যেভাবে ভারসাম্য রক্ষা করে চলছি, একইভাবে তা রক্ষা করে চলতে পারব। তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যে আমরা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের মুখে আমাদের যে অবস্থানের ফলে বঙ্গোপসাগরের প্রবেশ দ্বারে আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হয়ে আছি। এখানে আমাদের যে গুরুত্ব তা সম্পূর্ণভাবে আমাদের অনুধাবন করতে হবে এবং কৌশলগত জাতীয় স্বার্থে তা ব্যবহার করতে হবে। এমন পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আরও কিছু সক্রিয় পররাষ্ট্রের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, যা আমরা এখনও দেখতে পাইনি। পররাষ্ট্রনীতিতে যে ধরনের গতিশীলতা আসা দরকার তা এখনও দেখা যাচ্ছে না। আঞ্চলিকা বা প্রতিবেশীর ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তার ঝুঁকি বা চ্যালেঞ্জ সেটি হচ্ছে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার, বিশেষ করে রাখাইন রাষ্ট্রের কাছ থেকে। আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি যে রাখাইন অঞ্চল সম্পূর্ণভাবে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে বাইরে বা মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এখানে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ শহর আরাকান আর্মির দখলে চলে গেছে। একমাত্র রাখাইনের রাজধানী সিত্তে, সেটি এখন মিয়ানমার সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে শিগগির সেটিও আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। এখানে যে আমূল পরিবর্তন এসেছে আমাদের সীমান্তে বা সীমান্ত পরবর্তী রাখাইন রাষ্ট্রে সে ব্যাপারে আমাদের খুবই সচেতন বা সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ এর থেকে নানাবিধ নিরাপত্তা ঝুঁকির সৃষ্টি হতে পারে বা হতে যাচ্ছে। এই ইস্যুতে আমাদের নতুন করে চিন্তা করতে হবে। আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আমরা কীভাবে নতুন করে উন্নত করব সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। আরাকান আর্মির সঙ্গে এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো সম্পর্ক নাই, আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে। কারণ আমাদের বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। আমরা জানি যে রাখাইন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। কাজেই তাদের সঙ্গে কথা না বলার এখন কোনো সুযোগ নেই। যদিও দেরি হয়ে গেছে কিন্তু আমি আশা করব যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শিগগির আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করবে। মিয়ানমার নিয়ে পররাষ্ট্রনীতিকে ঢেলে সাজাতে হবে। ভারত ছাড়া আমাদের অন্য প্রতিবেশী রাষ্ট্র হচ্ছে মিয়ানমার, যা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। সেখানে যে ধরনের পরিবর্তন আসছে তার সঙ্গে আমাদের বাস্তব মিল রেখে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি বা রাষ্ট্রীয় নীতিগুলো ঢেলে সাজাতে হবে।
সময়ের আলো: প্রধান উপদেষ্টার হাইরিপ্রেজেন্টেটিভ খলিলুর রহমান গত বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে জানান যে আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে বাংলাদেশ। আপনি বললেন যে আরাকান আর্মির সঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক গড়া প্রয়োজন। একটু ব্যাখ্যা করবেন?
আ ন ম মুনীরুজ্জামান: বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে আরাকান আর্মি সম্পূর্ণভাবে রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলেছে। আমরা এমনটাও শুনতে পাচ্ছি যে আরাকান আর্মি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেওয়ায় এখানে হয়তো বা তারা স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করতে পারে। যদি স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা না করে তবে তারা এমন পর্যায়ে যাবে যেখানে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে তাদের একটা ক্ষীণ সম্পর্ক থাকবে কিন্তু কার্যত স্বাধীনভাবেই তারা তাদের অঞ্চল (রাখাইন) বা দেশ পরিচালনা করবে। সে ক্ষেত্রে শুধু যে পেছনের দরজা দিয়ে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা বা যে পর্যায়ে ছিলাম বা আছি সেটি হয়তো আর কাজ করবে না। এখানে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে হয়তো আরাকান আর্মির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে কারণ সেটিই বাস্তবতা। এমনও হতে পারে যে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে আর মিয়ানমার থাকবে না। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে রাখাইন থাকবে। কাজেই পুরো পরিস্থিতি আমাদের নতুন করে পর্যালোচনা করতে হবে এবং আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কী হবে তা নির্ধারণ করতে হবে।
সময়ের আলো: আপনি বললেন যে, বাংলাদেশ ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে গিয়ে সামনের দিনে বড় শক্তির দেশগুলো থেকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে। আমরা অতীতে এবং সাম্প্রতিক সময়ে দেখেছি যে যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অনেকেই বলছেন যে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বৈরিতার ফলে সামনের দিনে বাংলাদেশকে যেকোনো একটা পক্ষ বেছে নিতে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
আ ন ম মুনীরুজ্জামান: রাষ্ট্র হিসেবে আমরা যদি সংঘবব্ধ থাকি এবং আমাদের যে ধরনের জাতীয় ঐকমত্য থাকার প্রয়োজন তা যদি বজায় রাখতে পারি তা হলে রাষ্ট্র হিসেবে আমরা শক্তিশালী পর্যায়ে থাকতে পারব। আমরা সব সময়ে বলে আসছি যে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য একটি কৌশলগত স্বাধীনতা থাকার প্রয়োজন আছে। যা আমরা বজায় রাখার জন্য চেষ্টা করছি, এটিকে আরও উন্নত করতে হবে। বৈশ্বিক পরাশক্তির প্রত্যেকেরই নিজস্ব স্বার্থ আছে, আঞ্চলিক স্বার্থ আছে এবং আন্তর্জাতিক স্বার্থ আছে। একইভাবে বাংলাদেশেরও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ আছে। আমাদের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বজায় রেখে আমরা সবার সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চাই। অনেক ক্ষেত্রে এটি হয়তো কঠিন পর্যায়ে যাবে। তবে আমরা আশা করি, আমরা যদি সঠিকভাবে আমাদের নীতিমালাগুলো প্রণয়ন করতে পারি তা হলে সবার সঙ্গেই আমরা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করতে পারব। ভারত আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। কাজেই এই অঞ্চলে ভারত যে ধরনের সম্পর্ক রাখতে চায় সেখানে বাংলাদেশ অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণেই বাংলাদেশের বিষয়ে ভারত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইস্যুতে আলোচনা করে এসেছে এবং আসছে। আশা করব যে এটি এমন পর্যায়ে ভারত নিয়ে যাবে না যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে নাক গলানোর শামিল। আমরা সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে চাই। আমরা একটি স্বাধীন দেশ। আমাদের স্বাধীন দেশ হিসেবে আমাদের যেসব নীতি প্রয়োজন, তা আমরা নিজেদের স্বার্থে নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারব এবং আমরা সেভাবে এগুতে চাই।
সময়ের আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
আ ন ম মুনীরুজ্জামান: অপনাকেও ধন্যবাদ।