সুরা আলে ইমরানের ৯২ থেকে সুরা নিসার ৮৭ নম্বর আয়াত পর্যন্ত তেলাওয়াত করা হবে তৃতীয় তারাবিতে। পারা হিসেবে চতুর্থ পারার পুরোটা ও পঞ্চম পারার প্রথম অর্ধেক। এই অংশে ইসলামের দাওয়াত, বদর যুদ্ধ, ওহুদ যুদ্ধ, উত্তরাধিকার, এতিমের অধিকার, বিয়েশাদি, পারিবারিক বিরোধ মীমাংসা, মৃত্যু, হাশর, আসমান-জমিন সৃষ্টি, দাম্পত্য জীবন, মুমিনদের বারবার পরীক্ষার কারণ, জিহাদ, আমানত আদায়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের বয়ান আছে।
পৃথিবীর প্রথম ঘর কাবা
কিবলা পরিবর্তন হওয়ার পর যখন কাবা কিবলা হিসেবে সাব্যস্ত হয়ে গেল, তখন আহলে কিতাবরা এই কথা চাউর করল, বাইতুল মুকাদ্দাস কাবা থেকে উত্তম। তাদের দাবি, বাইতুল মুকাদ্দাস ভূপৃষ্ঠের প্রথম ঘর হওয়ার মর্যাদায় ভূষিত। সুরা আলে ইমরানের ৯৬-৯৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাদের এ কথা প্রত্যাখ্যান করে কাবার তিনটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেন। যেমন—
১. কাবা ভূপৃষ্ঠের প্রথম ইবাদতের জায়গা।
২. এতে আছে প্রকাশ্য কিছু নিদর্শন, যা এর মর্যাদা প্রমাণিত করে। মাকামে ইবরাহিম, জমজম ও হাতিমে কাবা অন্যতম।
৩. হারাম এলাকায় প্রবেশকারীরা নিরাপদ।
কারা শ্রেষ্ঠ মানুষ
যাদের মধ্যে তিনটি গুণ থাকবে, তারাই শ্রেষ্ঠ মানুষ। গুণ তিনটি হলো—
এক. সৎ কাজের আদেশ করা।
দুই. অন্যায় কাজে বাধা দেওয়া।
তিন. আল্লাহর প্রতি ইমান রাখা। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১১০)
অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের লড়াই—বদর যুদ্ধ
সুরা আলে ইমরানের ১২১ থেকে ১২৯ নম্বর আয়াতে বদর যুদ্ধের আলোচনা রয়েছে। দ্বিতীয় হিজরির ১৭ রমজান মদিনার উপকণ্ঠে বদর নামক জায়গায় কাফেরদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের বদর যুদ্ধ হয়। ইসলামের ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল এক অধ্যায় বদর যুদ্ধ। মুসলমানদের প্রথম সশস্ত্র লড়াই এটি। এটি ছিল অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের লড়াই। অবিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিশ্বাসের লড়াই। এ যুদ্ধে কুরাইশ বাহিনীর ১ হাজার সশস্ত্র সেনা, ১০০টি ঘোড়া, ৭০০টি উট ছিল। মুসলমানরা ছিলেন ৩১৩ জন। ছিলেন সহায়-সম্বলহীন। তাঁদের সঙ্গে ছিল মাত্র দুটি ঘোড়া ও ৭০টি উট। মুসলিমরা এ যুদ্ধে আল্লাহর সাহায্যে অলৌকিকভাবে বিজয় লাভ করেন এবং কাফেররা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এতে কুরাইশদের ৭০ জন নিহত হয় ও ৭০ জন বন্দী হয়। মুসলিমদের ১৪ জন শহিদ হন।
আল্লাহর ভালোবাসা ও ক্ষমা পান যারা
সুরা আলে ইমরানের ১৩৪ থেকে ১৩৬ নম্বর আয়াতে কারা আল্লাহর ভালোবাসা পাবে, এর একটি তালিকা দেওয়া হয়েছে। যথা—
১. যারা সুখে-দুঃখে ব্যয় করে।
২. রাগ সংবরণ করে।
৩. মানুষকে ক্ষমা করে।
৪. পাপ বা গুনাহ করলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়।
৫. পাপ কাজে অবিচল থাকে না।
ওহুদ যুদ্ধ
সুরা আলে ইমরানের ১৪৪ থেকে ১৮০ নম্বর আয়াতে ওহুদ যুদ্ধের বিবরণ রয়েছে। তখন তৃতীয় হিজরি। মক্কার কাফেররা বদর যুদ্ধের অপমানজনক পরাজয়ের শোক মানতে পারছিল না। তাদের ঘরে ঘরে যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। আবু সুফিয়ানকে নেতা বানানো হলো। একদিন মদিনার দিকে রওনা হয় কুরাইশদের কাফেলা। তাদের দলে তিন হাজারের বেশি যোদ্ধা। এর মধ্যে ৭০০ যোদ্ধা বর্ম পরিহিত। ২০০ ঘোড়া ও ৩ হাজার উট আছে। সঙ্গে অনেক নারী; যাদের কাজ গানে গানে যোদ্ধাদের মনোবল চাঙা রাখা। এদিকে মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা মাত্র ৭০০। ৭০০ জনের ১০০ জন বর্ম পরিহিত এবং ৫০ জন অশ্বারোহী। শাওয়াল মাসে যুদ্ধ গড়াই মাঠে। শুরুতে অবিশ্বাসীরা মুসলমানদের কাছে পরাজিত হয়। মাঠ ছেড়ে পালাতে থাকে। রুমা পাহাড়ে নিযুক্ত ৫০ জন তিরন্দাজ সাহাবি কাফেরদের পালাতে দেখে জয় নিশ্চিত মনে করে গনিমতের সম্পদ সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। নবিজির নির্দেশ ‘কোনো অবস্থাতেই পাহাড় ছাড়া যাবে না’ ভুলে যান তারা। এই সুযোগে খালিদ ইবনে ওয়ালিদের (তখনো মুসলমান হননি) নেতৃত্বে কাফেরদের এক দল গিরি অতিক্রম করে মুসলমানদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। মুসলমানরা হেরে যান। তবে আগে ময়দান ছেড়েছিল কাফেররাই। এই যুদ্ধে ৭০ জন সাহাবি শাহাদত বরণ করেন। নবিজিও (সা.) আহত হন।
সফলতার চার মূলনীতি
সফলতার চারটি মূলনীতির কথা আছে এ সুরার সর্বশেষ আয়াতে। যেমন—
১. ধৈর্য ধারণ করা।
২. শত্রুর মোকাবিলায় শত্রুর চেয়ে বেশি অবিচলতা ও বীরত্ব অবলম্বন করা।
৩. শত্রু মোকাবিলায় নিজেকে প্রস্তুত রাখা।
৪. সর্বাবস্থায় আল্লাহর ভয় অন্তরে পোষণ করা।
নারীদের নিয়ে স্বতন্ত্র সুরা—সুরা নিসা
সুরা নিসা মদিনায় অবতীর্ণ। এ সুরার আয়াত সংখ্যা ১৭৬। পবিত্র কোরআনের চতুর্থ সুরা এটি। নিসা অর্থ নারী। এ সুরায় নারীর অধিকার, নারীর উত্তরাধিকার, দাম্পত্যজীবন, তালাক ও নারী সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ের আলোচনা রয়েছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এ সুরার নাম রাখা হয় সুরা নিসা।
দেনমোহর স্ত্রীর অধিকার
সুরা নিসার ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্ত্রীকে খুশি মনে মোহর দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন। মোহর স্ত্রীর অধিকার ও সম্মান। স্ত্রীকে মোহর দেওয়া আবশ্যক। বিয়ের আগে মোহর দিতে হয়। তবে স্ত্রীর সম্মতিক্রমে পরেও দেওয়া যেতে পারে। দুই পক্ষের আলাপের ভিত্তিতে মোহরানার পরিমাণ নির্ধারণ করা উত্তম। তবে বরের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় রেখে মোহর ঠিক করা শ্রেয়। সর্বনিম্ন ১০ দিরহাম কিংবা সমপরিমাণ সম্পদ মোহরানায় ধার্য করতে হবে।
উত্তরাধিকারীদের ঠকানো জঘন্য পাপ
সুরা নিসার ১১ থেকে ১৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মিরাসের বিধিবিধান বর্ণনার পাশাপাশি নারী ও শিশুর উত্তরাধিকারের অধিকার নিশ্চিত করেছেন। ইসলামের প্রায় বিধানের মূলনীতি আল্লাহ তাআলা নিজে কোরআনে বলে দিয়ে শাখাগত খুঁটিনাটি বিধান নবি (সা.)-এর মাধ্যমে মানুষকে জানিয়েছেন। কিন্তু মৃতের পরিত্যক্ত সম্পদ বণ্টনের শাখাগত প্রায় সব খুঁটিনাটি বিধান আল্লাহ নিজে সরাসরি বলে দিয়েছেন। আত্মীয়ের নাম নিয়ে বলে দিয়েছেন, কে কতটুকু পাবে। জাহেলি যুগে নারী ও শিশুদের উত্তরাধিকার হিসেবে কিছুই দেওয়া হতো না। ইসলামের মাধ্যমে নারী ও শিশুদের উত্তরাধিকারের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তাঁর সম্পদ থেকে দাফন-কাফনের ব্যবস্থা, ঋণ আদায়, স্ত্রীর দেনমোহর আদায় এবং অসিয়ত তার প্রাপককে বুঝিয়ে দেওয়ার পর তাঁর অবশিষ্ট সম্পত্তি ইসলামি ফারায়েজ আইন অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন করা আবশ্যক। এ ক্ষেত্রে কমবেশি করা যাবে না। কাউকে ঠকানো যাবে না। ইসলামি শরিয়তে মা, স্ত্রী, মেয়ে কখনও উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয় না। তাঁরা উত্তরাধিকার হিসেবে সম্পদ পাবেনই। মৃতের সম্পদ বণ্টনে আল্লাহর আইন অমান্য ও ওয়ারিশ ঠকানো পাপ। ওয়ারিশ ঠকালে ইবাদত কবুল হয় না। (সুরা নিসা, আয়াত : ১৯)
যে ১৪ শ্রেণির নারীকে বিয়ে করা যাবে না
কাকে বিয়ে করা যায় আর কাকে বিয়ে করা যায় না, এ বিষয়ে ইসলামে একটি মৌলিক নীতি আছে। সুরা নিসার ২৩ থেকে ২৫ নম্বর আয়াতে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। যে ১৪ শ্রেণির নারীকে বিয়ে করা হারাম, তাদের তালিকা এখানে দেওয়া হলো—
১. মা
২. দাদি, নানি ও তাদের ওপরের সবাই
৩. নিজের মেয়ে, ছেলের মেয়ে, মেয়ের মেয়ে ও তাদের গর্ভজাত কন্যাসন্তান
৪. সহোদর, বৈমাত্রেয় (সৎমায়ের মেয়ে) ও বৈপিত্রেয় (সৎবাবার মেয়ে) বোন
৫. বাবার সহোদর বোন এবং বাবার বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় বোন
৬. যে স্ত্রীর সঙ্গে দৈহিক মিলন হয়েছে, তার পূর্ববর্তী বা পরবর্তী স্বামীর ঔরশজাত কন্যাসন্তান, স্ত্রীর আপন মা, নানি শাশুড়ি ও দাদি শাশুড়ি
৭. মায়ের সহোদর বোন এবং মায়ের বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় বোন
৮. ভাতিজি অর্থাৎ সহোদর, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় ভাইয়ের মেয়ে ও তাদের পরের প্রজন্মের কন্যাসন্তানেরা
৯. ভাগ্নি অর্থাৎ সহোদর, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় বোনের মেয়ে ও তাদের পরের প্রজন্মের কন্যাসন্তানেরা
১০. দুধ মেয়ে (স্ত্রীর দুধ পান করেছে এমন), সেই মেয়ের মেয়ে, দুধছেলের মেয়ে ও তাদের পরের প্রজন্মের কোনো কন্যাসন্তান এবং দুধছেলের স্ত্রী
১১. দুধ মা এবং তার দিকের খালা, ফুফু, নানি, দাদি ও তাদের ঊর্ধ্বতন নারীরা
১২. দুধ বোন, দুধ বোনের মেয়ে, দুধ ভাইয়ের মেয়ে এবং তাদের গর্ভজাত যেকোনো কন্যাসন্তান। অর্থাৎ দুধ সম্পর্ককে রক্তসম্পর্কের মতোই গণ্য করতে হবে
১৩. ছেলের স্ত্রী
১৪. এমন দুই নারীকে একসঙ্গে স্ত্রী হিসেবে রাখা যাবে না, যাদের একজন পুরুষ হলে তাদের মধ্যে বিয়ে বৈধ হতো না। যেমন—স্ত্রীর বোন, খালা, ফুফু
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক