আজকের তারাবিতে সুরা তওবার ৯৪ থেকে সুরা হুদের ৫ নম্বর আয়াত পর্যন্ত পড়া হবে; কোরআনের ১১তম পারা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশেষ গুণ, কপটদের নিন্দা, সত্য সাক্ষ্যদানকারীদের পুরস্কার, সত্যবাদীদের সংস্পর্শে থাকার নির্দেশ, মুনাফিকদের থেকে দূরত্ব বজায়, মসজিদ নির্মাণ, তাকওয়া অর্জন, জ্ঞান ও গবেষণার গুরুত্ব, মুহাম্মাদ (সা.)-এর অনুসরণ, কিয়ামতের ঘটনা, বিশ্বাসীদের গুণাবলি, কোরআন আল্লাহর কালাম, বিপদ কেটে গেলে আল্লাহকে ভুলে যাওয়া, দ্বীনের ব্যাপারে ছলচাতুরীর পরিণাম, কোরআনের মুজেজা, নুহ (আ.), মুসা (আ.) ও ইউনুস (আ.)-এর ঘটনাসহ বিভিন্ন বিষয়ের বর্ণনা রয়েছে এই অংশে।
সাহাবিদের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টি
সাহাবিরা যুগের শ্রেষ্ঠ মানুষ। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি তাদের একনিষ্ঠ ভালোবাসা, ইসলামের জন্য ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গ ছিল অনন্য। আল্লাহ তাদের প্রতি খুশি হয়েছেন। তাদের জন্য যথেষ্ট হয়েছেন। জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন তাদের। আল্লাহ বলেন, ‘আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম ও অগ্রগামী এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে সুন্দরভাবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে।’ (সুরা তওবা, আয়াত : ১০০)
যে মসজিদ পুড়িয়ে দিয়েছিলেন মহানবী (সা.)
রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন তাবুক যুদ্ধে যাচ্ছিলেন। পথ চলতে চলতে জুআওয়ান নামক স্থানে এলেন। কুবায় মসজিদে জিরার নির্মাণকারীরা নবীজি (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, দুর্বলদের জন্য এবং বৃষ্টির রাতে নামাজ পড়ার জন্য আমরা একটি মসজিদ নির্মাণ করেছি। আমরা চাই যে আপনি তাতে আসবেন এবং নামাজ পড়ে মসজিদটি উদ্বোধন করে দেবেন।’ তিনি বললেন, ‘আমি সফরে যাচ্ছি। ফেরার পথে তোমাদের এখানে যাব, ইনশা আল্লাহ।’
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরছিলেন। ভাবলেন, যাওয়ার পথে সেই মসজিদ উদ্বোধন করবেন। তখন আল্লাহ সুরা তওবার ১০৭ আয়াত নাজিল করেন, ‘আর যারা মসজিদ তৈরি করেছে ক্ষতিসাধন, কুফরি আর মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে, আর যে ব্যক্তি আগে থেকেই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে তার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের নিমিত্তে, তারা অবশ্যই শপথ করবে যে আমাদের উদ্দেশ্য সৎ ছাড়া নয়। আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন, তারা নিশ্চিত মিথ্যাবাদী।’
রাসুলুল্লাহ (সা.) আর দেরি করলেন না। সঙ্গে সঙ্গে দুই সাহাবিকে এই মসজিদ ধ্বংসের জন্য পাঠালেন। নবিজি (সা.) তখনো মদিনায় পৌঁছাননি; মসজিদটি তাঁরা পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেন। ইসলামের ইতিহাসে মসজিদটি ‘মসজিদে জিরার’ নামে পরিচিত। (তাফসিরে ইবনে কাসির, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা : ৪৪)
চারটি উদ্দেশ্যে অবিশ্বাসীরা মসজিদে জিরার নির্মাণ করেছিল—
১. পাশে অবস্থিত মসজিদে কুবার ক্ষতি করার জন্য।
২. আল্লাহর সঙ্গে কুফরি করতে।
৩. বিশ্বাসীদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে।
৪. মুসলিমদের বিরুদ্ধে বহিঃশত্রুর আক্রমণের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।
মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ তৈরি, সামাজিক অবক্ষয় ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, লোকদেখানো, আধিপত্য বিস্তার, কালো টাকা সাদা বা মানুষের প্রশংসা কিংবা পাপ লুকানোর জন্য মসজিদ নির্মাণ করা ভয়াবহ অপরাধ ও গুনাহের কাজ।
বিশ্বাসীদের ৯ বৈশিষ্ট্য
সুরা তওবার ১১২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের কিছু গুণের কথা বলে সুসংবাদ দিয়েছেন। যথা—
১. তারা তওবাকারী
২. ইবাদতকারী
৩. আল্লাহর প্রশংসাকারী
৪. রোজাদার
৫. রুকুকারী
৬. সিজদাকারী
৭. ভালো কাজের আদেশদাতা
৮. মন্দ কাজে বাধাদানকারী
৯. আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা হেফাজতকারী
জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব
দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমান নারী-পুরুষের জন্য আবশ্যক। মানুষের দুনিয়া ও আখেরাতের জীবনে সুখ, শান্তি, সফলতা ও উন্নতির জন্য যতগুলো শাস্ত্রের জ্ঞানচর্চা দরকার, ইসলাম সেই সমুদয় শাস্ত্রের জ্ঞানচর্চাকে উৎসাহিত করে। নবীজি (সা.)-এর নির্দেশে সাহাবিরা বিদেশি ভাষা শিখেছেন। অনেক সাহাবি সাহিত্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, হস্তশিল্প, কৃষি ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেছেন। নবিজির যুগে মসজিদে নববির বারান্দায় দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের জন্য নিবেদিত একদল মানুষ পড়ে থাকতেন। সেখানে তাঁরা দিন-রাত কাটাতেন। ইসলামের ইতিহাসে যাঁরা ‘আসহাবে সুফফা’ নামে পরিচিত।
আল্লাহতায়ালা চান না যে, সবাই একই কাজ করুক। একই বিষয়ে পারদর্শী হোক। তিনি চান, একেকজন একেক বিষয়ে পারদর্শী হয়ে উঠুক। কিছু লোক জ্ঞান অর্জনে লেগে থাকুক। তাবুক যুদ্ধে যখন মুসলমানরা সবচেয়ে বড় যুদ্ধের মুখোমুখি হচ্ছেন, সবাইকে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য নবীজি আদেশ দিয়েছেন, তখন আল্লাহ বলেন, ‘আর সমস্ত মুমিনের অভিযানে (একসঙ্গে যুদ্ধে) বের হওয়া সঙ্গত নয়। তাই তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হলো না, যাতে দ্বীনের জ্ঞান লাভ করে এবং সংবাদ (জ্ঞান) দান করে স্বজাতিকে, যখন তারা তাদের কাছে প্রত্যাবর্তন করবে, যেন তারা (গুনাহ থেকে) বাঁচতে পারে।’ (সুরা তওবা, আয়াত : ১২২)
নবী ইউনুসের নামে সুরার নামমক্কায় অবতীর্ণ সুরা ইউনুস কোরআনের ১০ নম্বর সুরা। এর আয়াত সংখ্যা ১০৯। এ সুরায় ঈমানের মৌলিক আকিদা-বিশ্বাস, পবিত্র কোরআনের মাহাত্ম্য ও মানুষের প্রতি চ্যালেঞ্জ, কিছু উপদেশ ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলি সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। সুরার একটি অংশে ইউনুস (আ.)-এর ঘটনার বর্ণনা রয়েছে, সে দৃষ্টিকোণ থেকে এ সুরার নাম রাখা হয় সুরা ইউনুস।
যে কারণে আজাব থেকে বেঁচে গেল এক জাতিএ সুরার ৯৮ নম্বর আয়াতে রয়েছে ইউনুস (আ.)-এর জাতির লোকেরা তওবা করে আল্লাহর আজাব থেকে বেঁচে যাওয়ার গল্প। কোরআনে ইউনুস (আ.)-এর তিনটি নাম পাওয়া যায়—ইউনুস, জুননুন ও সাহিবুল হুত। ইউনুস (আ.) বর্তমান ইরাকের মসুল নগরীর কাছে নিনাওয়া বা নিনেভা জনপদের অধিবাসীদের নবী ছিলেন। তিনি তাদের আল্লাহর পথে ডাকলেন। আখেরাতের বিষয়ে সতর্ক করলেন। জাতির লোকেরা তাঁর কথা শুনল না। তিনি হতাশ হয়ে পড়লেন। তিন দিনের মধ্যে আল্লাহর আজাবের সতর্কবার্তা দিয়ে এলাকা ছাড়লেন। এ ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষা করলেন না। ইউনুস (আ.) চলে যাওয়ার পর লোকজন ভয় পেয়ে বসল। তারা সবাই মিলে আল্লাহর কাছে তওবা করল। খাঁটি তওবার ফলে আল্লাহ তাদের ওপর থেকে আজাব সরিয়ে নেন। (তাফসিরে কুরতুবি, খণ্ড : ৮, পৃষ্ঠা : ৩৮৪)
এদিকে ইউনুস (আ.) ভাবলেন, তার জাতি হয়তো এর মধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু যখন জানলেন, তারা তওবা করে ভালো হয়ে গেছে, তখন ভয়ে দেশে না ফিরে ভিন্ন দেশের উদ্দেশে মানুষবোঝাই নৌকায় চড়লেন। নৌকা মাঝনদীতে পৌঁছামাত্র প্রচণ্ড ঝড় শুরু হলো। এটা দেখে নৌকার মাঝি বলল, একজনকে নদীতে ফেলে দিতে হবে, অন্যথায় সবাইকে ডুবে মরতে হবে। লটারি হলো। লটারিতে পরপর তিনবার ইউনুস (আ.)-এর নাম আসে। অবশেষে তিনি নদীতে নিক্ষিপ্ত হন। সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর হুকুমে বিরাটকায় এক মাছ এসে তাঁকে গিলে ফেলে। মাছের পেটে তিনি বেঁচে ছিলেন। পরে একসময় মাছ থেকে নদীর পাড়ে উগরে দেয়। (তাফসিরে কুরতুবি, খণ্ড : ১৫, পৃষ্ঠা : ১২৫)
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক