নুহ নবীর (আ.) নৌকা ও ইউসুফ (আ.)-এর চমকপ্রদ গল্প

রায়হান রাশেদ

ইসলামের আলো

পবিত্র কোরআনের ১২তম পারা তেলাওয়াত করা হবে আজকের খতমে তারাবিতে। সুরা হুদের ৬ থেকে সুরা ইউসুফের ৫২ নম্বর আয়াত পর্যন্ত।

2025-03-09T17:54:18+00:00
2025-03-09T17:54:18+00:00
 
  বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬,
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
ইসলামের আলো
নুহ নবীর (আ.) নৌকা ও ইউসুফ (আ.)-এর চমকপ্রদ গল্প
রায়হান রাশেদ
প্রকাশ: রোববার, ৯ মার্চ, ২০২৫, ৫:৫৪ পিএম 
নুহ নবীর (আ.) নৌকা ও ইউসুফ (আ.)-এর চমকপ্রদ গল্প
পবিত্র কোরআনের ১২তম পারা তেলাওয়াত করা হবে আজকের খতমে তারাবিতে। সুরা হুদের ৬ থেকে সুরা ইউসুফের ৫২ নম্বর আয়াত পর্যন্ত। এই অংশে তাওবা-ইসতেগফার, আল্লাহর ইবাদত করা, তাঁর ইবাদতের দিকে মানুষকে আহ্বান, কোরআনের ব্যাপারে কাফেরদের সংশয়, পবিত্র কোরআন অকাট্য নির্ভুল এবং ধ্রুব সত্য, দৃঢ়তার সঙ্গে ইসলামে অটল থাকা, সৃষ্টিতত্ত্ব, পূর্ববর্তী নবি-রাসুলদের দাওয়াত, তাঁদের প্রতি নিজ সম্প্রদায়ের বিরূপ আচরণ, কাফেরদের প্রতি আল্লাহর আজাব, দ্বিতীয় মানবসভ্যতার সূচনা, জাতীয় জীবনে বিপর্যয়ের কারণ, বান্দার জন্য আল্লাহর পুরস্কার ও ইউসুফ (আ.)-এর জীবনের চমকপ্রদ গল্প ইত্যাদি বিষয়ের বর্ণনা আছে। 

আল্লাহ সবার রিজিকদাতা
রিজিক সম্পর্কিত আয়াত তেলাওয়াতের মাধ্যমে নবম তারাবি শুরু হবে। আল্লাহ বলেন, ‘ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী সবার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহরই।’ (সুরা হুদ, আয়াত : ৬ )। পৃথিবীর জলে-স্থলে, বৃক্ষে-লতাগুল্মে আর বনে, গুহা-গর্তে, আকাশে এবং পাতালে; যত জায়গা হতে পারে এবং যত জায়গায় প্রাণী থাকতে পারে, তাদের প্রত্যেকের আহারের ব্যবস্থা আল্লাহ তাআলা করে রেখেছেন। আকাশে বিচরণকারী সৃষ্টিজীবের জন্যও খাবার আছে। গভীর সমুদ্রের তলদেশে অবস্থানকারী প্রাণীও সময়মতো খাবার পাচ্ছে। গর্তের ক্ষুদ্র পিঁপীলিকা কিংবা এর চেয়ে ক্ষুদ্র প্রাণীও আহার পাচ্ছে। মায়ের উদরে জন্ম নেওয়া শিশুর খাবার, ভূমিষ্ট শিশুর জন্য মায়ের বুকে দুধের ব্যবস্থাÑসবই আল্লাহর দায়িত্বে। সবার রিজিকদাতা তিনি। কারণ তিনি সব প্রাণীর মালিক। সব প্রাণী তার দাস। তাই রিজিক নিয়ে কখনো ভয় করা যাবে না। মানুষের কাজ হচ্ছে চেষ্টা করে যাওয়া। রিজিক অনুসন্ধান করা। 

কোরআনের চ্যালেঞ্জ
কোরআন যে আল্লাহর কালাম, তা আরবের অনেকে অস্বীকার করেছিল। সুরা হুদের ১৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেছেন, যদি মানুষের বানানো হয়ে থাকে, তা হলে এর মতো অন্তত একটি সুরা বানিয়ে দেখাও। কোরআন অস্বীকারকারীদের সর্বমোট তিনবার চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে। প্রথমে পুরো কোরআনের মতো আরেকটি গ্রন্থ সৃষ্টির চ্যালেঞ্জ, তারপর ১০ সুরা, তারপর সুরা বাকারায় শুধু একটি সুরা বানিয়ে আনার চ্যালেঞ্জও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তিন তিনবারই এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে তারা অক্ষম হয়েছে। 

মানুষ দুই ধরনের
সুরা হুদের ১৫ থেকে ২৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা দুই ধরনের মানুষের পরিচয় তুলে ধরেছেন। এক. অবিশ্বাসী, দুই. বিশ্বাসী। অবিশ্বাসীদের সব ব্যস্ততা, কাজকর্ম ও চেষ্টা শুধু দুনিয়াকে ঘিরে। তারা সারাক্ষণ দুনিয়ার ভাবনায় বিভোর থাকে। প্রতিদিনই নতুন করে দুনিয়া সাজাতে চায়। তারা আল্লাহ ও পরকাল স্মরণ করে না। অপরদিকে বিশ্বাসীরা দুনিয়ার জন্য প্রয়োজনমতো জীবনধারণের ব্যবস্থায় কাজ করলেও তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকে আখেরাতের প্রতি। তারা পরকাল সামনে রেখে দুনিয়া সাজায়। আল্লাহকে পেতে জীবন গড়ে। অবিশ্বাসীদের উপমা দেওয়া হয়েছে অন্ধ ও বধিরের সঙ্গে, আর বিশ্বাসীদের উপমা দেওয়া হয়েছে চক্ষুষ্মান ও শ্রবণশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তির সঙ্গে।


নুহ (আ.)-এর নৌকা
দ্বিতীয় মানবসভ্যতার নবি নুহ (আ.)-এর আগমন, অবিশ্বাসীদের প্রতি তাঁর একাত্ববাদের দাওয়াত, তাদের অস্বীকৃতি, আজাবের ভয় দেখানো, নুহ নবি (আ.)-এর নৌকা নির্মাণ, নৌকা নিয়ে অবিশ্বাসীদের মশকরা, নৌকায় বিশ্বাসী মানুষ ও প্রতিটি সৃষ্টির জোড়ায় জোড়ায় আরোহণ, মহাপ্লাবনে পৃথিবী ধ্বংস ও নৌকায় আরোহীরা বেঁচে যাওয়ার বয়ান রয়েছে সুরা হুদের ২৫ থেকে ৪৮ নম্বর আয়াতে।
নুহ (আ.) পৃথিবীর দ্বিতীয় নবি ও প্রথম রাসুল। আদম (আ.)-এর পর তিনি নবি-রাসুল হয়ে পৃথিবীতে আসেন। মাঝখানে কেটে যায় অনেক বছর। এর মধ্যে মানুষ আল্লাহ ভুলে যায়। তিনি পথভোলা মানুষকে এক আল্লাহর পথে দাওয়াত দেন। মুষ্টিমেয় কিছু লোক ছাড়া কেউ তাঁর কথা শুনল না। তারা হত্যার হুমকি দিল। তিনি শাস্তির ভয় দেখালেন। তারা শাস্তির প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ল। আল্লাহ তাঁকে  নৌকা বানানোর আদেশ দেন। মানব ইতিহাসে তিনি প্রথম নৌকা বানালেন। (তাফসিরে ইবনে কাসির, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ২৪৪)
একদিন বিশ্বাসীদের নিয়ে তিনি নৌকায় উঠলেন। সঙ্গে নিলেন জোড়াবিশিষ্ট কিছু জীবজন্তু। (কাসাসুল আম্বিয়া, মুতাওয়াল্লি আশ-শারাবি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৫৩)। নেমে এল মহাপ্লাবন। জমিন বিদীর্ণ করে উঠে এল পানি। আসমান থেকে অঝোর ধারায় বর্ষিত হলো পানি। ধ্বংস হলো সবকিছু, বেঁচে গেলেন নুহ (আ.) ও তাঁর সাথিরা। গড়ে উঠল নতুন সমাজ। শুরু হলো দ্বিতীয় মানবসভ্যতার সূচনা। (কাসাসুল আম্বিয়া, মুতাওয়াল্লি আশ-শারাবি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৫৩)

যে দুই কারণে বিপদ আসে
সুরা হুদের ১১৬ নম্বর আয়াতের মর্ম অনুধাবন করলে বোঝা যায়, কোনো সম্প্রদায়ের ওপর তখনই আজাব নেমে আসে, যখন তাদের মাঝে দুটি মন্দ ব্যাপার ঘটে। এক. জাতিকে ফেতনা-ফাসাদ থেকে নিষেধ করার মতো দরদি ও বিচক্ষণ লোকের সংকট হওয়া। দুই. কোনো সম্প্রদায় অতিমাত্রায় ভোগ-বিলাসিতা ও গুনাহে মত্ত হয়ে যাওয়া। (৩০ মজলিসে কোরআনের সারনির্যাস, পৃষ্ঠা: ১৩২)

কোরআনের শ্রেষ্ঠ কাহিনি
মক্কায় অবতীর্ণ সুরা ইউসুফ পবিত্র কোরআনের ১২তম সুরা। এর আয়াত সংখ্যা ১১১। এ সুরায় ইউসুফ (আ.)-এর কাহিনি থাকায় এর নাম রাখা হয়েছে সুরা ইউসুফ। ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনাকে আল্লাহ নিজে ‘আহসানুল কাসাস’ বা ‘শ্রেষ্ঠ কাহিনি’ আখ্যায়িত করেছেন।


ইউসুফ (আ.)-এর গল্প
নবি ইয়াকুব (আ.)-এর ছিল ১২ ছেলে। এর মধ্যে ইউসুফ (আ.) ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন। বাবা তাঁকে বেশ ভালোবাসতেন। ইউসুফ (আ.) শৈশবে একটি স্বপ্ন দেখেন, যা ছিল তাঁর নবি হওয়ার শুভবার্তা; এ কারণে বাবা ইয়াকুব (আ.)-এর মন পড়ে থাকত তাঁর প্রতি। ইউসুফ (আ.)-এর প্রতি বাবার বিপুল ভালোবাসা অন্য ভাইয়েরা মেনে নিতে পারেননি। তাঁরা ইউসুফ (আ.)-এর ক্ষতি করতে চাইত। একদিন ইউসুফ (আ.)-কে নিয়ে জঙ্গলের এক কুয়ায় ফেলে দেন ভাইয়েরা। বাবাকে ছেলের মৃত্যুর মিথ্যা সংবাদ দিল। পুত্রশোকে দিনমান কেঁদে চলেন ইয়াকুব (আ.)। সেই কুয়ার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল এক কাফেলা। কাফেলার লোকেরা পানি ওঠানোর জন্য কুয়ায় বালতি ফেলতেই বালতিতে উঠে আসেন ইউসুফ (আ.)। তারা তাঁকে মিসরে বিক্রি করে দেয়। মিসরের প্রধানমন্ত্রী তাঁকে কিনে নেন। সেখানেই সে বড় হতে থাকে। আজিজে মিসরের স্ত্রী জুলেখা ইউসুফ (আ.)-এর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। তিনি ইউসুফ (আ.)-কে মন্দ সম্পর্কে লিপ্ত হতে প্রলোভন দেন। ইউসুফ তা প্রত্যাখ্যান করেন।
জুলেখা তাঁকে জেলে দেন, পাছে তার বদনাম হয়। সেখানে ইউসুফ (আ.) আল্লাহর পথে মানুষকে দাওয়াত দেন। অনেকে দাওয়াত গ্রহণ করেন। পরে বাদশাহর স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলার কারণে তিনি বাদশাহর সুদৃষ্টি পেতে সমর্থ হন। কারাগার থেকে তাঁর মুক্তি মেলে।
আগামীকালের তারাবিতে তেলাওয়াত করা হবে ইউসুফ (আ.)-এর নির্দোষ প্রমাণ, মিসরের মন্ত্রীর পদে আসীন, ইয়াকুবের (আ.) দৃষ্টি ভালো হওয়া, বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ ইত্যাদির বর্ণনা। 

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক


  বিষয়:   তারাবি  তারাবির সারাংশ  আজকের তারাবি  তারাবির নামাজ  রোজা  রমজান 


Loading...
Loading...
ইসলামের আলো- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: