২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন রাজনৈতিক দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এটি শুধু একটি স্বৈরাচারী সরকারের পতন নয়, বরং রাষ্ট্রের বিদ্যমান কাঠামোর ওপর জনগণের সরাসরি চ্যালেঞ্জ। শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ সাড়ে পনেরো বছরের শাসনের অবসান ঘটেছে এক গণজাগরণের মাধ্যমে, যার নেতৃত্বে ছিল শিক্ষার্থীরা। তবে এটি কেবল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ছিল না; শ্রমিক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা, ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে দেশের সব ধরনের নাগরিক শামিল হয়েছে এই বিদ্রোহে।
বাংলাদেশের ইতিহাসই বলতে গেলে গণআন্দোলনের ইতিহাস; বিশেষত ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ১৯৯৬-এর রাজনৈতিক সংকট। তবে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের বিশেষত্ব হলো- এটি কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন আনেনি, বরং রাষ্ট্রের প্রকৃতি ও কাঠামো নিয়ে নতুনভাবে চিন্তার প্রয়োজন তৈরি করেছে। একদিকে এটি ক্ষমতার কাঠামোর বিরুদ্ধে সংগ্রাম, অন্যদিকে এটি রাজনৈতিক ভাবধারার একটি পুনঃসংজ্ঞায়নও বটে। এই বিপ্লবকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝতে হলে আমাদের বিভিন্ন দার্শনিক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদদের তত্ত্ব বিবেচনায় আনতে হবে। তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ব্যবহার করে বুঝতে হবে, জুলাই বিপ্লব শুধু একটি সরকার পতনের ঘটনা নাকি এটি বৃহত্তর সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় রূপান্তরের সূচনা।
নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি রাজনীতির বাস্তববাদী বিশ্লেষকদের অন্যতম, যিনি মনে করতেন যে শাসনের মূল লক্ষ্য হলো ক্ষমতা দখল এবং তা ধরে রাখা। তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্যগুলোর একটি হলো- একজন শাসকের জন্য ভালোবাসার চেয়ে ভয় সৃষ্টি করাই উত্তম। তবে তিনি এটাও বলেছেন যে, ভয় যেন ঘৃণায় পরিণত না হয়। যদি জনগণ একসময় শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, তবে সেই শাসকের পতন অনিবার্য। তিনি তার বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য প্রিন্স-এ উল্লেখ করেন যে, ‘ক্ষমতা টিকে থাকে কৌশলের মাধ্যমে, নৈতিকতার মাধ্যমে নয়।’ শেখ হাসিনার সরকার শুধু ভয় প্রদর্শনের মাধ্যমে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে তারা জনগণকে কিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়ে পক্ষে রাখতে চেয়েছিল, যেমন- অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং রিজার্ভ বৃদ্ধি ও প্রবৃদ্ধির গল্প প্রচার। এই কৌশলগুলো প্রথমদিকে সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে সহায়তা করলেও, শেষ পর্যন্ত জনগণের মনে সরকারবিরোধী ক্ষোভ জমতে থাকে। তবে শেখ হাসিনার সরকার পরিস্থিতি অনুযায়ী কৌশল বদলাতে পারেনি। তারা আন্দোলনের সূচনা পর্যায়ে ছাত্রদের ক্ষোভকে গুরুত্ব দেয়নি। পরিস্থিতি জটিল হওয়ার পরও তারা সহিংস দমননীতি গ্রহণ করেছিলেন, যা জনগণের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়। সরকার নিজেকে অপরিহার্য মনে করেছিল, কিন্তু জনগণ বুঝতে পারে, তারা নতুন নেতৃত্বের জন্য প্রস্তুত। এখানেই ছিল শেখ হাসিনা সরকারের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ব্যর্থতা, যা শেষ পর্যন্ত তাদের পতনের কারণ হয়।
থমাস হবস বিশ্বাস করতেন যে মানুষ প্রকৃতিগতভাবে স্বার্থপর, বিশৃঙ্খল এবং সহিংস। তাই সমাজে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে হলে শক্তিশালী রাষ্ট্রের প্রয়োজন। তার মতে, মানুষ যদি রাষ্ট্রের বিধিবিধান না মানে, তবে সমাজ বিশৃঙ্খলায় নিমজ্জিত হবে। এ জন্য মানুষ ও রাষ্ট্রের মধ্যে একটি ‘সামাজিক চুক্তি’ (social contract) থাকতে হবে, যেখানে জনগণ কিছু স্বাধীনতা ছেড়ে দিয়ে রাষ্ট্রকে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা দেবে, যাতে আইনশৃঙ্খলা বজায় থাকে। এ ধরনের কর্তৃত্বপরায়ণ রাষ্ট্রকে তিনি লেভিয়াথান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। শেখ হাসিনা সরকার একটি লেভিয়াথান রাষ্ট্রের মতো আচরণ করেছিল। প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রকে জনগণের ওপর কঠোরভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ‘জনগণের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য’- এই অজুহাতে নাগরিকদের বাকস্বাধীনতা, রাজনৈতিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছিল। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ নানা কঠোর আইন প্রণয়ন করে রাষ্ট্রব্যবস্থা জনগণের ওপর ভয়ভীতি প্রদর্শনের হাতিয়ারে পরিণত হয়।
কিন্তু হবসের তত্ত্ব অনুসারেই, শক্তিশালী রাষ্ট্র তখনই বৈধ থাকে, যদি তা জনগণের সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে। রাষ্ট্র যদি চরমভাবে ব্যর্থ হয় এবং জনগণের সুরক্ষা দিতে না পারে, তা হলে জনগণ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পারে। ইমানুয়েল কান্টও একই ধরনের কথা বলেছেন। তার মতে, রাষ্ট্র কেবল শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য নয়, বরং এটি জনগণের মুক্তি ও কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি তার পারপেচুয়াল পিস (১৭৯৫) বইয়ে বলেছেন- ‘যদি কোনো রাষ্ট্র জনগণের স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করে, তবে সেটি জনগণের জন্য বৈধ রাষ্ট্র হতে পারে না।’ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, শেখ হাসিনার সরকার নির্বাচনি ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে, এর ফলে জনগণ তাদের প্রকৃত মতপ্রকাশ করতে পারেনি। ভিন্নমত প্রকাশে বাধা দেওয়ার জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দমন করা হয়েছে।
রাজনৈতিকবিরোধীদের ওপর দমনমূলক নীতি প্রয়োগ করা হয়েছে, যাতে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করতে না পারে। এই পরিস্থিতিতে জনগণ বুঝতে পারে যে, তারা ন্যায়বিচার পাচ্ছে না এবং সরকার তাদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করছে। কান্টের মতে, এই ধরনের সরকার একটি অবৈধ সরকার এবং জনগণের উচিত এ ধরনের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। রাষ্ট্র যখন স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ শুরু করে, তখন ধীরে ধীরে জনমনে ক্ষোভ জমতে থাকে।
মিশেল ফুকো ক্ষমতার গঠন ও প্রভাব নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি মনে করতেন, ক্ষমতা কেবল শাসকদের হাতে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে থাকে এবং জনগণের চিন্তাভাবনা, আচরণ ও দৈনন্দিন জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফুকো দুই ধরনের ক্ষমতা কাঠামো নিয়ে আলোচনা করেছেন। প্রথমত শাস্তিমূলক ক্ষমতা যা মূলত জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল হিসেবে খ্যাত। শেখ হাসিনার শাসনামলে রাষ্ট্রযন্ত্র জনগণের ওপর নজরদারি, শাস্তি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছে, যা ফুকোর শাস্তিমূলক ক্ষমতার ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। আর দ্বিতীয়ত বায়োপাওয়ার বা জনগণের চিন্তাভাবনা নিয়ন্ত্রণ করার কৌশল। ফুকো দেখিয়েছেন রাষ্ট্র শুধু বাহ্যিক বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই ক্ষমতা প্রয়োগ করে না, বরং জনগণের জীবন ও চিন্তাভাবনাকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, যাতে তারা নিজেরাই রাষ্ট্রের পক্ষে থাকতে বাধ্য হয়।
শেখ হাসিনার সরকার বায়োপাওয়ার ব্যবহার করে জনগণের চিন্তাভাবনা ও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছিল। টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও অনলাইন মিডিয়ার মাধ্যমে একতরফা সরকারি প্রচার চালিয়ে জনগণের মন গঠন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সরকার প্রচার করেছিল যে, ‘বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে’, ‘শেখ হাসিনা না থাকলে দেশ পিছিয়ে যাবে’, ‘এই মেট্রোরেল, এই ইন্টারনেট কে দিয়েছে’ ইত্যাদি। সরকার দাবি করেছিল যে, বিরোধীদের ক্ষমতায় এলে দেশে আবার অস্থিরতা দেখা দেবে, সুতরাং জনগণের নিরাপত্তার জন্য সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে হবে। পাঠ্যবই ও শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার নিয়মিতভাবে তার আদর্শ প্রচার করে যাচ্ছিল, যাতে নতুন প্রজন্ম সরকারের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখে।
ফুকোর মতে, এসব ব্যবস্থা আসলে জনগণের শরীর ও মনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ব্যবহৃত হয়, যাতে তারা কখনোই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে না পারে। তবে তিনি মনে করতেন, ক্ষমতা ও প্রতিরোধ (Resistance) একে অপরের পরিপূরক। যেখানে ক্ষমতা থাকে, সেখানে প্রতিরোধও জন্ম নেয়। বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব ফুকোর এই ধারণার বাস্তব উদাহরণ। আবার জ্যাক দেরিদার তত্ত্ব অনুযায়ী, ক্ষমতার ভাষা সবসময় নিরপেক্ষ থাকে না, বরং এটি একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে। আওয়ামী লীগ সরকার ‘উন্নয়ন’, ‘স্থিতিশীলতা’ এবং ‘অগ্রগতি’ শব্দগুলো ব্যবহার করে জনগণকে বোঝাতে চেয়েছিল যে, তাদের ছাড়া দেশ চলতে পারবে না। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে জনগণ এই বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করেছে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে আপামর জনতার কাছে রাজাকার শব্দটি গালাগাল হিসেবে স্বীকৃত হলেও যখন রাজপথে থাকা অসংখ্য শিক্ষার্থীরা কোটার বিপক্ষে ‘তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে স্বৈরাচার স্বৈরাচার।’ বলে স্লোগান দেয় সেখানে ‘রাজাকার’ শব্দের অর্থ পরিবর্তির হয়। রাজাকার হয়ে ওঠে উপহাস ও বক্রোক্তির নামান্তর। আর দেরিদার মতে, ‘যখন ভাষার অর্থ পরিবর্তিত হয়, তখন ক্ষমতার কাঠামোও পরিবর্তিত হয়।’ জনগণ যখন বুঝতে পারল যে ‘উন্নয়ন’ আসলে একটি শাসনব্যবস্থা বজায় রাখার অস্ত্র, তখন তারা তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল।
একই কথা বলেছেন আন্তোনিও গ্রামসি। তিনি মনে করেন, কোনো শাসনব্যবস্থা শুধু বলপ্রয়োগের মাধ্যমে টিকে থাকে না, বরং এটি সাংস্কৃতিক ও আদর্শগত আধিপত্য (hegemony) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেও জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ শাসকশ্রেণি শুধু রাষ্ট্রযন্ত্রের বাহ্যিক শক্তির (force) মাধ্যমে শাসন করে না; বরং প্রচার, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করে। শেখ হাসিনা সরকার ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এক টানা ক্ষমতায় ছিল এবং এই সময়ের মধ্যে তারা বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজেদের আদর্শিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। ইতিহাসের পুনর্লিখন এবং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শনের প্রচার ছিল এ শাসনব্যবস্থার একটি কৌশল। রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ সরকার-সমর্থিত ছিল।
যেসব মিডিয়া সরকারের সমালোচনা করত, তাদের ওপর সেন্সরশিপ, আইনি বাধা ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হতো। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগকে সরকার তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যবহার করত, যাতে বিরোধীদের ওপর ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করা যায়। ক্ষমতাসীন দলের ব্যবসায়িক সহযোগীদের জন্য সুবিধাজনক নীতিমালা প্রণয়ন করা হতো, যাতে তাদের অর্থনৈতিক আধিপত্য বজায় থাকে এবং সাধারণ জনগণ তাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে বিক্ষোভ দমন, গ্রেফতার, নির্যাতন ও গুমের মাধ্যমে জনগণকে ভয় দেখানো হয়। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমালোচনা করলেই গ্রেফতার, মিথ্যা মামলা ও দীর্ঘ কারাবাসের শাস্তি দেওয়া ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। সোশ্যাল মিডিয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললে গ্রেফতার ও হয়রানির ভয় দেখিয়ে জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত করা হয়।
গ্রামসি বলেছেন, ‘যখন শাসক শ্রেণির আদর্শিক আধিপত্য (hegemony) দুর্বল হয়ে যায়, তখনই বিপ্লবের পথ তৈরি হয়।’ ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব এই সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক বৃহৎ গণপ্রতিরোধের প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা একত্রিত হয়ে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর যে আদর্শিক নিয়ন্ত্রণ ছিল, তা ছাত্রসমাজ প্রত্যাখ্যান করেছে। শ্রেণি ও পেশা নির্বিশেষে সাধারণ জনগণ এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছিল। বিশেষ করে নারী, সংখ্যালঘু ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি প্রথমবারের মতো এত বড় পরিসরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ করে। যেহেতু প্রচলিত গণমাধ্যম ছিল সরকার-নিয়ন্ত্রিত, তাই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব ও টেলিগ্রামের মতো সামাজিক প্ল্যাটফর্ম। তরুণ সমাজ এই প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে নিজেদের বার্তা ছড়িয়ে দেয় এবং সরকারবিরোধী চেতনা তৈরি করে। এটি গ্রামসির হেজেমনির বিরুদ্ধে কাউন্টার হেজেমনি বা পাল্টা আধিপত্য তৈরি করার একটি বড় উদাহরণ।
শেখ হাসিনা সরকার প্রথমদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সরকারের দমন-পীড়ন নীতি কার্যকর হয়নি। বরং দমননীতিতে একহাত দেখে নিতে জনগণ আরও সংঘবদ্ধ হয়ে আন্দোলনে নামে। মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। ম্যাকিয়াভেলি মনে করতেন, শক্তির মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা সহজ, কিন্তু তা ধরে রাখা কঠিন। শেখ হাসিনার সরকার প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে যতই ক্ষমতা ধরে রাখতে চেষ্টা করেছিল, জনগণের সম্মিলিত শক্তির সামনে সেই কৌশল সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। কিন্তু এ বিপ্লবের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। বিপ্লবের উচ্চাকাক্সক্ষী লক্ষ্য ছিল বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। তবে বিপ্লবোত্তর সময়ে বাংলাদেশ অনেকটাই হবসিয় সমাজে পরিণত হয়েছে।
সরকারের পতনের ফলে সৃষ্ট শূন্যতা এবং নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় স্পষ্ট দিকনির্দেশনার অভাবে বিভিন্ন স্থানে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়েছে, যার ফলে মব বা গণউন্মাদনার বেড়েছে বহুলাংশে। এ সময়ে লুটপাট, ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে হামলা এবং সম্পত্তি ধ্বংসের মতো ঘটনাও ঘটছে অহরহ। বিপ্লবোত্তর সময়ে নারীর প্রতি সহিংসতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিভিন্ন স্থানে নারীর ওপর সংঘবদ্ধ সহিংসতা, যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে। ধর্মীয় স্থাপনা, বিশেষ করে মাজার ও দরগাহগুলোয় হামলা ও ভাঙচুর নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তার ফলে এই ধরনের ঘটনা বেড়েছে। এতে অন্যান্য ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও বেকারত্বের কারণে বেড়েছে ছিনতাই ও ডাকাতি। এতে শহরাঞ্চলে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যুক্ত হয়েছে নতুন উপাদান-নিরাপত্তাহীনতা।
রাজনৈতিক দুর্বলতা এবং অনেক ক্ষেত্রে অনীহার কারণে প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। নেতৃত্বের অভাব, দুর্নীতি এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে প্রশাসনিক কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। ফলে অপরাধ দমন ও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। বিপ্লব-পরবর্তী সমন্বয়ক ও স্থানীয় নেতারা তাদের ক্ষমতা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার শুরু করেছেন। এতে সরকারি সম্পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ফলে জনগণের আস্থা বাড়ার বদলে বহুলাংশে কমেছে।
গ্রামসি মনে করতেন, ‘প্রকৃত বিপ্লব তখনই ঘটে, যখন কেবল সরকার নয়, পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার আদর্শগত ভিত্তি পাল্টে দেওয়া হয়।’ ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান স্বৈরাচার পতন ঘটালেও রাজনৈতিক কাঠামো ছিল অপরিবর্তিত। কিন্তু ২০২৪ সালের আন্দোলন ক্ষমতার প্রকৃতি ও রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। এ কারণে জুলাই বিপ্লবকে কেবল সরকার পতনের লক্ষ্যে একটি রাজনৈতিক বিদ্রোহ বলা যাবে না; বরং এটি ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থার গভীরে থাকা আদর্শিক আধিপত্য ভেঙে ফেলার একটি প্রচেষ্টামাত্র। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। এটি শুধু একটি শাসকের পতন নয়, বরং রাষ্ট্রকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার আন্দোলন। কিন্তু নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর। জনগণের প্রকৃত মুক্তি তখনই সম্ভব, যখন রাষ্ট্র কেবল ক্ষমতার হাতবদল নয়, বরং কাঠামোগত পরিবর্তন আনবে।
লেখক : সাংবাদিক