দেশে পাট গবেষণার একমাত্র প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই)। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৫৪টি জাত ও তিন শতাধিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করলেও গবেষণালব্ধ পাটের বীজ কিংবা প্রযুক্তি কৃষক পর্যায়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। এ কারণে এখনও দেশের কৃষকদের পাট চাষের জন্য ভারতের বীজের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে অদক্ষ ব্যবস্থাপনা ও নানা অনিয়মের কারণে ডুবতে বসেছে স্বনামধন্য এ প্রতিষ্ঠানটি। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর চারজন সিনিয়রকে ডিঙিয়ে জুলাই হত্যা মামলার আসামি বিজেআরআইয়ের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নার্গীস আক্তারকে মহাপরিচালকের চেয়ারে বসানোর পর অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমান মহাপরিচালক আওয়ামী লীগের আমল থেকেই দলীয় প্রভাব খাটিয়ে জ্যেষ্ঠতার তোয়াক্কা না করেই একের পর এক পদ বাগিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ একাধিক কর্মকর্তার। গত ১ মাসেরও বেশি সময় ধরে ডিজির অপসারণের দাবিতে আন্দোলন চলায় প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
একাধিক কর্মকর্তা জানান, ড. নার্গীস আক্তার মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা থাকাকালে দুজনকে ডিঙিয়ে শেখ হাসিনার আত্মীয় শেখ নাদির হোসেন লিপুর সুপারিশে পরিচালক (কৃষি) পদ বাগিয়ে নেন। পরে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিজেআরআইয়ের বিতর্কিত ডিজি ড. আবদুল আউয়ালের অপসারণের পর হঠাৎই চারজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে মহাপরিচালক বানানো হয় নার্গীস আক্তারকে।
জানা যায়, জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি কর্মকর্তাদের নিয়ে ‘শেখ হাসিনার ওপর আস্থা’ স্লোগানে রাস্তায় নামেন। তার বিরুদ্ধে জুলাই হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলাও রয়েছে। একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, আওয়ামী সরকারের পতনের পর থেকে দেশের প্রায় অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে আওয়ামী সুবিধাভোগীদের পরিবর্তে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হলেও উল্টো চিত্র দেখা যায় বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটে। এখানে ড. নার্গীস আক্তারকে মহাপরিচালক নিয়োগের পর তার হাত ধরে আঞ্চলিক কার্যালয়ের আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তাদের প্রধান কার্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ পদে দিয়ে প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের
পাঁয়তারা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিজেআরআইয়ে বর্তমানে দ্বিতীয় গ্রেডের কোনো কর্মকর্তা নেই। মহাপরিচালকসহ (রুটিন দায়িত্ব) পরিচালক ও পরিচালক পদমর্যাদার পদগুলোতে দায়িত্ব পালন করা সবাই তৃতীয় গ্রেডের কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে মেধাতালিকা অনুযায়ী ১ নম্বরে রয়েছেন পরিচালক (কারিগরি উইং)-এর মো. মোসলেম উদ্দিন। দ্বিতীয় ছিলেন ড. আবদুল আলীম যিনি দীর্ঘদিন বঞ্চিত থেকে গত ডিসেম্বর মাসে মারা গেছেন। জ্যেষ্ঠতার দিক দিয়ে তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে রয়েছেন যথাক্রমে পরিচালক (জুট টেক্সটাইল উইং) ড. ফেরদৌস আরা দিলরুবা ও মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মাসরুর আনোয়ার। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে গণঅভ্যুত্থানের পর মন্ত্রণালয়কে ম্যানেজ করে ৪ জনকে ডিঙিয়ে বিগত সরকার আমলের সুবিধাভোগীকে ডিজি করায় ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিজেআরআইয়ে ১৬০ জনের অধিক বিজ্ঞানী রয়েছেন। তাদের মূল কাজ গবেষণা হলেও অনেকেই দুপুর ১২টায় অফিসে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার গত ১০ ফেব্রুয়ারিতে মহাপরিচালক নার্গীস আক্তার তার বিরুদ্ধে ব্যানার অপসারণের জন্যে ৮ জন কর্মকর্তা ও ২০ জন কর্মচারীকে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ডিজি তার চেয়ার দখল নিয়ে ব্যস্ত থাকায় গত ৬ মাস ধরে গবেষণার প্রতি তেমন মনোযোগ নেই। সারাক্ষণ মন্ত্রণালয়ের তার রুটিন দায়িত্ব থেকে চলতি পদে দায়িত্ব নেওয়ার তদ্বিরে ব্যস্ত রয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বিজেআরআইয়ের ডিজি ড. নার্গীস আক্তারের অপসারণের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে পাট গবেষণার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ। সম্প্রতি রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ও খামারবাড়ীসহ বিভিন্ন জায়গায় তার অপসারণ দাবি করে লাগানো হয় ব্যানার ও পোস্টার। ডিজির বিরুদ্ধে লাগানো পোস্টারের ছবিতে বিগত দিনে পরিচালক ড. নার্গীস আক্তারের ‘শেখ হাসিনাতেই আস্থা’ ব্যানারের সামনে ফেস্টুন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
এ ছাড়াও বিগত সময়ে পতিত স্বৈরশাসকের কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে বিভিন্ন ছবি রয়েছে তার। ব্যানারগুলোতে নার্গীস আক্তারকে জুলাই হত্যা মামলার আসামি এবং আওয়ামী ফ্যাসিস্টের দোসর হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।
জানা যায়, পতিত শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার আগের দিন আওয়ামী সরকারের পক্ষে রাজধানীর খামারবাড়ী সড়কে কৃষিবিদদের শান্তি সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের ব্যানারের সামনে নার্গীস আক্তারকে ফেস্টুন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
বিজেআরআইয়ের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, কর্মজীবনে ড. নার্গীস আওয়ামী লীগের দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন সময়ে জ্যেষ্ঠদের ডিঙিয়ে পদোন্নতি ভাগিয়ে নিয়েছেন। সর্বশেষ ৫ আগস্ট চারজন জ্যেষ্ঠকে ডিঙিয়ে ডিজির চেয়ারে বসালে এ নিয়ে তখনই ক্ষোভ প্রকাশ করেন ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ডিজি হওয়ার পর কয়েক মাসে বিএনপিপন্থি একাধিক কর্মকর্তাকে আঞ্চলিক কেন্দ্রে এবং আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তাদের প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে আসার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে ডিজির অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় ৩ জন কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। গবেষণায় বাধা দেওয়ার প্রতিবাদ করায় এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দেওয়ারও অভিযোগ ওঠে। অন্যদিকে রুটিন দায়িত্বে থেকেও বাসা বরাদ্দ কমিটির সুপারিশ ছাড়াই মহাপরিচালকের বাসা বরাদ্দ নিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (প্রশাসন) ড. মো. ইয়ারউদ্দিন সরকার নিজেকে কৃষি সচিবের ঘনিষ্ঠজন দাবি করে ডিজিকে কেউ সরাতে পারবে না বলে প্রচার করার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বিজেআরআইয়ের মহাপরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) ড. নার্গীস আক্তার সময়ের আলোকে বলেন, মন্ত্রণালয় তাকে যোগ্য মনে করেছে বলেই অন্যদের ডিঙিয়ে তাকে ডিজির দায়িত্ব দিয়েছে। এখানে তার কিছুই করার ছিল না। এটা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত।
উল্টো তিনি অভিযোগ করেন, অধিদফতরের ৪ থেকে ৫ জন লোক তার ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য পোস্টারিং করাসহ বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছেন। নার্গীস আক্তারের দাবি, শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার আগের দিন আওয়ামী সরকারের পক্ষে খামারবাড়ী সড়কে কৃষিবিদদের শান্তি সমাবেশে তৎকালীন ডিজির নির্দেশে তিনিসহ অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীই অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ডিজির দায়িত্ব পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলাসহ অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। গত কয়েক মাসে বিএনপিপন্থি একাধিক কর্মকর্তাকে আঞ্চলিক কেন্দ্রে এবং আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তাদের প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে আসার অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে তিনি বলেন, প্রধান কার্যালয়ে পদায়ন করা কর্মকর্তাদের মধ্যে আওয়ামীপন্থি একজন ছাড়া বাকি সবাই বিএনপি-জামায়াতপন্থি কর্মকর্তা। গবেষকরা ঠিকমতো অফিস করেন এবং গবেষণা কার্যক্রম ঠিকমতো চলছে বলে জানান তিনি।