আজ খতমে তারাবিতে পবিত্র কোরআনের ২২তম পারা তেলাওয়াত করা হবে। সুরা আহজাবের ৩১ থেকে সুরা সাবা, সুরা ফাতির ও সুরা ইয়াসিনের ১ থেকে ২১ নম্বর আয়াত পর্যন্ত। আল্লাহর অনুগ্রহ, দ্বীনের ওপর অবিচল, ঈমান ও কুফরের পার্থক্য, আল্লাহর প্রশংসা, নবীপত্নী ও নারীদের উপদেশ, রিজিক, মহানবী (সা.) শেষ নবী, নবীজির বহুবিবাহ, নবীজির প্রতি দুরুদ পাঠ, উম্মতে মুহাম্মাদির প্রশংসা, গুনাহের কঠোর শাস্তি ও সামাজিক শিষ্টাচারসহ ইত্যাদি বিষয়ের আলাপ রয়েছে তারাবির এই অংশে।
নারীর প্রতি কোরআনের উপদেশ
সুরা আহজাবের ৩২ থেকে ৩৪ নম্বর আয়াতে নবী-পরিবার ও তাঁদের মাধ্যমে নারীদের কিছু উপদেশ দেওয়া হয়েছে। উপদেশগুলো হলো—
১. (প্রয়োজনে) পরপুরুষের সঙ্গে কোমলকণ্ঠে বাক্যালাপ কোরো না।
২. ঘরে অবস্থান কোরো।
৩. অপ্রয়োজনে ঘর থেকে বের হয়ো না।
৪. জাহেলি যুগের নারীদের মতো সৌন্দর্য প্রকাশ করে বেড়িয়ো না।
৫. নামাজ কায়েম কোরো।
৬. জাকাত আদায় কোরো।
৭. আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য কোরো।
৮. কোরআন তেলাওয়াত কোরো।
৯. নবীজি (সা.)-এর আনুগত্য কোরো।
ক্ষমা লাভের ১০ গুণ
সুরা আহজাবের ৩৫ নম্বর আয়াতে ১০টি গুণের বর্ণনা রয়েছে। যাদের মধ্যে এই গুণ থাকবে, তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও বিশেষ পুরস্কার পাবে। যথা—
১. ইসলাম
২. ইমান
৩. আল্লাহর আনুগত্য
৪. সততা ও সত্যবাদিতা
৫. ধৈর্য
৬. বিনয়
৭. দান
৮. রোজা
৯. লজ্জাস্থানের হেফাজত
১০. বেশি বেশি আল্লাহর স্মরণ।
মুহাম্মাদ (সা.) শেষ নবী
আদম (আ.) পৃথিবীর প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী। তাঁর মাধ্যমে পৃথিবীতে নবুওয়তের ধারা চালু হয়েছে। এই ধারা শেষ ও পূর্ণ হয়েছে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মাধ্যমে। তিনিই শেষ নবী। তাঁর পরে আর কেউ নবী হবেন না, কারও ওপর অহি বা প্রত্যাদেশ নাজিল হবে না। তাঁর পরে আল্লাহ কোনো নবি-রাসুল পাঠাননি, পাঠাবেন না। এটা পবিত্র কোরআন, বিশুদ্ধ হাদিস ও সব সাহাবির ইজমা (সর্বসম্মত অবস্থান) দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত। প্রত্যেক মুসলমানের এ বিশ্বাস রাখা ফরজ। মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসুল—এ বিশ্বাস যেমন অকাট্য, তেমনি তিনি শেষ নবী—এ বিশ্বাসও অকাট্য। আল্লাহ বলেন, ‘মুহাম্মদ তোমাদের কারও পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসুল এবং শেষ নবী। আল্লাহ সব বিষয়ে জ্ঞাত।’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ৪০)
নবীজির (সা.) প্রতি দুরুদ পাঠ
মুহাম্মদ (সা.) জগতের শ্রেষ্ঠ মানুষ। তিনি চির প্রশংসিত। আকাশে আল্লাহ আর দুনিয়াতে সব সৃষ্টি তাঁর প্রশংসা করে। তাঁর পবিত্র নামে দুরুদ পড়ে। তাঁর নামে দুরুদ পড়া ঈমানের অংশ। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর প্রতি সালাত-দুরুদ পেশ করেন। হে মুমিনেরা, তোমরাও তাঁর প্রতি সালাত পেশ করো এবং তাঁকে যথাযথভাবে সালাম জানাও।’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ৫৬)। নবীজির প্রতি দুরুদ পড়ার গুরুত্ব ও ফজিলত অপরিসীম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দুরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার ওপর দশবার দুরুদ পাঠ করবেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ৩৮৪)
বাঁধভাঙা বন্যার গল্প
কোরআনের ৩৪তম সুরা সাাবা মক্কায় অবতীর্ণ। এর আয়াত সংখ্যা ৫৪টি। এ সুরায় সাবাবাসীর ঘটনা থাকায় এর নাম সুরা সাবা রাখা হয়েছে। এতে আখেরাত ও পুনরুত্থান, দাউদ ও সুলাইমান (আ.) এবং সাবাবাসীকে প্রদত্ত আল্লাহর নেয়ামত, নবিদের কৃতজ্ঞতা আর কওমে সাবার অকৃতজ্ঞতা, তাদের পরিণাম, অবিশ্বাসীদের কিছু ভ্রান্ত বিশ্বাসের খণ্ডন, রিজিকের মালিক আল্লাহ ইত্যাদি বিষয় আলোচিত হয়েছে।
এ সুরার ১৫ থেকে ২২ নম্বর আয়াতে সাবাবাসীর প্রতি আল্লাহর নেয়ামত, নবীদের দাওয়াত, তাদের অকৃতজ্ঞতা ও ধ্বংসের বিবরণ রয়েছে। প্রাচীন নগরী মাআরিবে সাবা জাতির বসবাস ছিল। ইয়েমেনের সানা থেকে কিছু দূরে এ নগরীর অবস্থান। আল্লাহর নেয়ামতে ভরপুর ছিল সেই জনপদ। তেমন গরম ছিল না, ক্ষুধায় মানুষ অস্থির হতো না। সেখানে ছিল স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ ও আবহাওয়া, উর্বর জমি। তাদের ছিল দুটি বাগান—একটি ডান দিকে, আরেকটি বাম দিকে। পানি জমা করার জন্য ছিল বিরাট জলাধার। কিন্তু তারা ছিল অকৃতজ্ঞ জাতি। নবিদের মাধ্যমে আল্লাহ তাদের কৃতজ্ঞতা আদায়ের আদেশ দিলেন। কিন্তু তারা অবাধ্য হলো। ফলে বন্যা দিয়ে আল্লাহ তাদের সুন্দর বাগান ধ্বংস করে দিলেন। ফলে বাগানে বিস্বাদ ফলমূল হতো। কিছু হতো কুলগাছ। ঝাউগাছে ভরে গিয়েছিল বাগান। আল্লাহ অকৃজ্ঞতার কারণে তাদের এ শাস্তি দিয়েছিলেন।
আবুল আলা মওদুদি লিখেছেন, ‘সাবা সাম্রাজ্যের উত্থান মূলত দুটি বুনিয়াদের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। একটি হচ্ছে কৃষি, অপরটি বাণিজ্য। তারা পানি সিঞ্চনের একটি সর্বোৎকৃষ্ট সিস্টেম তৈরি করে কৃষিখাতে নানাবিধ উন্নতি করতে সক্ষম হয়েছিল। প্রাচীন ইতিহাসে বাবেল ছাড়া এ ধরনের জল সরবরাহের অন্য কোনো দৃষ্টান্ত কোথাও পাওয়া যায়নি। তাদের ভূখণ্ডে কোনো প্রাকৃতিক জলাধার ছিল না। বৃষ্টির মৌসুমে আশপাশের পাহাড় থেকে বর্ষাকালীন নালা বেরিয়ে আসত। সেই নালাগুলো কেন্দ্র করে তারা সারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় বাঁধ দিয়ে সেগুলোকে ঝিলে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করত। এরপর সেই ঝিলগুলো থেকে খাল বের করে পুরো দেশকে এমনভাবে জলতৃপ্ত করত যে, কোরআন কারিমের ভাষায় চতুর্দিকে শুধু বাগান আর বাগান দেখা যেত। জল সরবরাহের এই ব্যবস্থাপনার অধীনে সর্ববৃহৎ জলসমৃদ্ধ জলাধারটি ছিল মাআরিব শহরের সন্নিকটস্থ বালাক পাহাড়ের মধ্যবর্তী নদী। তারা চতুর্দিকে বাঁধ দিয়ে এই জলাধারটি তৈরি করেছিল।
এই সম্প্রদায়ের ওপর থেকে যখন আল্লাহর দয়ার দৃষ্টি উঠে যায়, তখন ঈসায়ি পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যভাগে এই বিশাল বাঁধ ভেঙে যায়। সেই জলাধার থেকে বেরিয়ে আসা প্রচণ্ড স্রোত, পথিমধ্যে যতগুলো বাঁধ পেয়েছিল সবগুলো ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলে। ফলে পুরো দেশে জল ব্যবস্থাপনা প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়ে। পরবর্তীকালে তাদের পক্ষে সেই সিস্টেম পুনর্বহাল করা সম্ভব হয়নি। (সিরাত বিশ্বকোষ, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৪২৬)। বাঁধটি বর্তমান মাআরিব প্রদেশের বালাখ হিলস এলাকার ওয়াদি আল-আজানায় অবস্থিত বলে ধারণা করা হয়। এই বাঁধের কিছু ধ্বংসাবশেষ এখনো সেখানে রয়েছে। (আল মুনজিদ ফিল আলা, পৃষ্ঠা : ৫১০, আল মুফাসসাল ফি তারিখিল আরব কবলাল ইসলাম, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ১৮৫)
আল্লাহর কুদরতের বয়ান—সুরা ফাতিরমক্কায় অবতীর্ণ সুরা ফাতিরের আয়াত সংখ্যা ৪৫। ফাতির আল্লাহর গুণবাচক নামের একটি। এর অর্থ আদি স্রষ্টা। সুরায় আল্লাহর একত্ববাদ, আল্লাহর অমুখাপেক্ষিতা, নেয়ামত ও কুদরতের আলোচনা থাকায় এর নাম ফাতির রাখা হয়েছে। এ সুরায় আছে আল্লাহর একত্ববাদ, সঠিক দীনের ওপর থাকার তাগিদ, আল্লাহর অমুখাপেক্ষিতা, আল্লাহর নেয়ামত, তাঁর কুদরতের বয়ান, কুদরতের নিদর্শন, এগুলোর সুস্পষ্ট দলিল, কোরআন পাঠের ফজিলত, মানুষের শ্রেণিবিন্যাস, জান্নাতবাসী, আল্লাহ গুনাহগারদের তাৎক্ষণিক সাজা দেন না, বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের পার্থক্য, উম্মতি মুহাম্মাদির মর্যাদা, আল্লাহর অনুগ্রহ ও সহনশীলতা ইত্যাদির বয়ান রয়েছে।
কোরআনের হৃদয় সুরা ইয়াসিনসুরা ইয়াসিন মক্কায় অবতীর্ণ। এর আয়াত সংখ্যা ৮৩, এটি মক্কায় অবতীর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিটি বস্তুর একটি হৃদয় রয়েছে, আর কোরআনে হৃদয় হচ্ছে ইয়াসিন। যে ইয়াসিন পড়বে আল্লাহ তার আমলনামায় দশবার পূর্ণ কোরআন পড়ার নেকি দান করবেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৮৮৭)
তাফসিরে রুহুল মাআনিতে আছে, ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেন, ‘সুরা ইয়াসিনকে কোরআনের হৃদয় এ কারণে বলা হয়েছে যে, এ সুরায় কিয়ামত ও হাশর বিষয়ে ব্যাখ্যা অলঙ্কারপূর্ণ ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। পরকালে বিশ্বাস ইমানের এমন একটি মূলনীতি, যার ওপর মানুষের সব আমল ও আচরণের শুদ্ধতা নির্ভরশীল। আমরা জানি, পরকালভীতি মানুষকে সৎকর্মে উদ্বুদ্ধ করে এবং অবৈধ কামনা-বাসনা ও হারাম কাজ থেকে বিরত রাখে।’
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক