তরুণরা কেন ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিল

নীল গ্রস

সম্পাদকীয়

ডেমোক্র্যাটরা গত বসন্ত ও গ্রীষ্মে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন যখন জনমত জরিপে দেখা যায় যে, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সি ভোটাররা

2025-03-29T02:33:17+00:00
2025-03-29T02:33:17+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬,
২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
সম্পাদকীয়
তরুণরা কেন ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিল
নীল গ্রস
প্রকাশ: শনিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৫, ২:৩৩ এএম   (ভিজিট : ২৬২)
ছবি: সংগৃহীত
ডেমোক্র্যাটরা গত বসন্ত ও গ্রীষ্মে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন যখন জনমত জরিপে দেখা যায় যে, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সি ভোটাররা ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতি তাদের সমর্থন শিথিল করছে। নভেম্বরে নির্বাচনের পর, যখন এক্সিট পোল ইঙ্গিত দেয় যে কমলা হ্যারিস অল্প ভোটের ব্যবধানে তরুণ ভোটারদের সমর্থন পেয়েছেন, তখন মনে হয়েছিল যে রাজনীতিতে পরিবর্তন এসেছে। নিউইয়র্ক ম্যাগাজিনের লেখায় ওয়াশিংটনে তরুণ ট্রাম্প সমর্থকদের উল্লাস করার চিত্র তুলে ধরা হয়, যা ব্যাপকভাবে এই ধারণা জন্ম দেয় যে এটি একটি প্রজন্মগত পুনর্গঠন।

তবে নতুন জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করার পর এবং আমি সন্দিহান। তরুণ ট্রাম্প সমর্থকরা নতুনভাবে উজ্জীবিত ও ক্ষমতায়িত অনুভব করতে পারে, কিন্তু ক্ষমতায়ন আর সংখ্যাগত বৃদ্ধির মধ্যে পার্থক্য আছে। তথ্য থেকে বোঝা যায় যে তরুণ প্রজন্মের ভোট ট্রাম্পের দিকে ঝোঁকার মানে আদর্শগত কোনো বড় পরিবর্তন নয়। বরং, এটি সম্ভবত অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন মধ্যপন্থি ও কিছুটা উদারপন্থি তরুণ ভোটারদের ট্রাম্পের পক্ষে বাজি ধরার ফলাফল এবং সেই তরুণ মধ্যপন্থি ও প্রগতিশীলদের কারণে যারা ভোট দিতে যাননি, কারণ তারা মনে করেছিলেন যে কমলা হ্যারিস হয়তো খুব বেশি প্রগতিশীল বা যথেষ্ট প্রগতিশীল নন। 

তরুণদের ট্রাম্পের দিকে ঝোঁকার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি হলো- এটি এমন একসময় ঘটেছে যখন তরুণদের মধ্যে নিজেদের ‘রক্ষণশীল’ হিসেবে চিহ্নিত করার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। 

কো-অপারেটিভ ইলেকশন স্টাডির (একটি জাতীয় জরিপ যাতে নির্বাচনি বছরে ৫০,০০০-এর বেশি উত্তরদাতা অংশ নেন) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে গড়ে ১৮-২৯ বছর বয়সিদের মধ্যে প্রায় ২৩ শতাংশ নিজেদের ‘রক্ষণশীল’ বা ‘অতি রক্ষণশীল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং এই সংখ্যা বছর বছর সামান্য ওঠানামা করলেও বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। 

গবেষকরা আমাকে ২০২৪ সালের যে তথ্য দিয়েছেন, তাতেও এই প্রবণতার থেকে কোনো বড় বিচ্যুতি দেখা যায়নি। নারীবিদ্বেষী অনলাইন ‘ম্যানোস্ফিয়ার’-এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ থাকা সত্তে¡ও রক্ষণশীল তরুণ পুরুষ ও তরুণ নারীদের অনুপাতেও তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।

আমার সাক্ষাৎকারগুলোতে দলীয় সংযুক্তি নিয়ে এই অসন্তোষ আমি শুনেছি। একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারী, যিনি এক অভিবাসী পরিবারের সদস্য এবং সম্প্রতি দক্ষিণের একটি প্রধান বিশ^বিদ্যালয় থেকে স্নাতক হয়েছেন, তিনি বলেছিলেন যে তার বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা রাজনৈতিক বিভাজন তাকে হতাশ করেছিল, যেখানে ‘আপনি হয় ডেমোক্র্যাট, নয়তো রিপাবলিকান,’। ‘এটা যেন হিপি বনাম প্রবীণ সৈনিকদের লড়াই।’

তিনি গর্ব করতেন যে তিনি কোনো দলের সঙ্গে সংযুক্ত নন। সম্প্রতি তিনি প্রজেক্ট ২০২৫, হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্সির জন্য প্রস্তুত করা নীলনকশা পড়ছিলেন। এতে কিছু বিষয় তিনি অপছন্দ করেছেন, আবার কিছু তিনি পছন্দ করেছেন।

তরুণ প্রাপ্তবয়স্করা ক্রমবর্ধমান রক্ষণশীল মতামত গ্রহণ করছে, এমন প্রমাণ খুব বেশি নেই। বরং, ঠিক উল্টোটা দেখা যায়। সমাজবিজ্ঞানী কাইল ডডসন এবং ক্লেম ব্রুকসের এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, ২০১২ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে জাতিগত সংখ্যালঘু, অভিবাসী, সমকামী সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রতি জনমত আরও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে, যেখানে তরুণ প্রাপ্তবয়স্করা এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিয়েছে। তরুণ রিপাবলিকানরাও আরও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। এটি দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রবণতার অংশ। 

সমাজবিজ্ঞানী মাইক হাউট এবং ইথান ফোসে দেখিয়েছেন যে গৃহস্থালির কাজের বিভাজন, সমকামিতার নৈতিকতা, শারীরিক শাস্তির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এবং স্কুলে প্রার্থনা নিয়ে অনুভ‚তিসহ বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে, গত শতাব্দীতে জন্ম নেওয়া প্রতিটি নতুন প্রজন্ম আগের প্রজন্মের তুলনায় একটু বেশি সহনশীল, সমতাবাদী এবং ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও এই প্রবণতা বদলায়নি।

এর বিপরীতে, প্রমাণ স্পষ্ট যে ২০২৪ সালের নির্বাচনে তরুণ আমেরিকানদের জন্য অর্থনৈতিক বিবেচনাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যদিও সব বয়সের ভোটাররাই অর্থনীতিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন, তবে ৩০ বছরের কম বয়সি ভোটারদের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে সত্য ছিল। তাদের মধ্যে ৪০ শতাংশ জানিয়েছেন যে মুদ্রাস্ফীতি ছিল নির্বাচনে তাদের ভোটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এবং আরও ৪৬ শতাংশ বলেছেন যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল। অনেক তরুণই মনে করেছেন যে কমলা হ্যারিস বাইডেন প্রশাসনের নীতিগুলো চালিয়ে যাবেন, যা তারা উচ্চ মূল্যস্ফীতির জন্য দায়ী মনে করতেন এবং তারা আশা করেছিলেন যে ট্রাম্প পরিস্থিতির উন্নতি আনতে পারবেন।

তবে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া মানেই এই নয় যে এই তরুণরা সক্রিয়ভাবে মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন আন্দোলনের অনুসারী হয়ে গেছেন। গত গ্রীষ্মে উত্তরে পশ্চিম উপক‚লের এক লাতিন তরুণী জানিয়েছিলেন যে যদিও তিনি কিছুটা উদারপন্থি এবং পরিবেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন, তবুও তিনি ট্রাম্পকে ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তার মতে, তার ভোটের মূল বিষয় ছিল অর্থনীতি। কারণ, বাইডেন প্রশাসনের অধীনে মানুষ প্রাথমিক প্রয়োজন মেটানোর সামর্থ্য হারিয়েছে।

অভিবাসনও কিছু তরুণ ট্রাম্প সমর্থকের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল। তবে এটি প্রবীণ ভোটারদের মতো কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আসেনি। হার্ভার্ডের ইনস্টিটিউট অব পলিটিকসের সেপ্টেম্বরের এক জরিপে দেখা গেছে যে, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সি আমেরিকানদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি অবৈধ অভিবাসীদের গণনির্বাসনের পক্ষে ছিলেন। তবে ডিসেম্বরে পিউ রিসার্চ সেন্টারের প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে মাত্র ১০ শতাংশ তরুণ প্রাপ্তবয়স্ক চেয়েছেন আইনসম্মত অভিবাসনের হার কমানো হোক। এটি ইঙ্গিত দেয় যে তরুণরা মূলত বৃহৎ পরিসরের অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থনৈতিক উদ্বেগ দ্বারা চালিত হয়েছেন, জাতীয়তাবাদী বা জেনোফোবিক (বিদেশিবিদ্বেষী) প্রচারণার দ্বারা নয়।

তারপর রয়েছে সেই তরুণদের বিষয়, যারা হয়তো হ্যারিসের পক্ষে ভোট দিত, কিন্তু ভোটদানে বিরত থেকেছে। অনেক তরুণ মধ্যপন্থি তাকে অত্যধিক প্রগতিশীল বলে মনে করেছেন। আবার অনেক তরুণ প্রগতিশীল তাকে যথেষ্ট প্রগতিশীল মনে করেননি, বিশেষ করে বাইডেন প্রশাসনের ইসরাইলকে দেওয়া সামরিক সহায়তার প্রেক্ষাপটে। এই তরুণরা যদি নির্বাচনের দিনে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকেন, তবে তা ট্রাম্পের পক্ষে তরুণ ভোটারদের অংশ বৃদ্ধির কারণ হয়েছে। তবে তরুণদের মধ্যে তার সমর্থকের সংখ্যা বেড়েছে, তা নয়।

আমি একজন সমাজতাত্তিক, রাজনৈতিক কৌশলবিদ নই, কিন্তু আমি মনে করি এখানে উভয় দলের জন্য শিক্ষণীয় কিছু বিষয় রয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা প্রায়ই ধরে নেন যে ইতিহাস তাদের পক্ষে রয়েছে এবং তরুণদের সমর্থন তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাবেন। তাই তারা তরুণদের সমর্থন অর্জনের চেয়ে তাদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসার দিকেই বেশি মনোযোগ দেন। 

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক পরিবর্তন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্বাচনি সাফল্যে রূপ নেয় না। যদিও তরুণরা সামাজিকভাবে আরও প্রগতিশীল হয়ে উঠছে, তবু তারা এমন ভোটার, যারা আর্থিক বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়। যা ডেমোক্র্যাটরা যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পারেননি।

অন্যদিকে রিপাবলিকানদের উচিত তাদের তরুণ ভোটারদের কাছ থেকে পাওয়া সমর্থনের সীমাবদ্ধতাগুলো বোঝা। রিপাবলিকান পার্টির মূল ভিত্তি এখনও বয়স্ক শে^তাঙ্গ জনগোষ্ঠী, যারা মনে করেন যে তরুণরা দেশকে এমন এক পথে নিয়ে যাচ্ছে, যা তারা চিনতে পারছেন না। ট্রাম্প প্রশাসন যদি এই ভোটারদের সন্তুষ্ট করতে আরও বেশি ধর্মীয় প্রার্থনার প্রচলন, জাতীয় পর্যায়ে গর্ভপাত নিষিদ্ধকরণ, বা এলজিবিটিকিউ অধিকারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের মতো নীতিগুলো গ্রহণ করে, তবে তারা তরুণ, তুলনামূলকভাবে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ভোটারদের দূরে সরিয়ে ফেলার ঝুঁকি নেবে। 

এই তরুণ ভোটাররা মূলত উচ্চ বেতন এবং সাশ্রয়ী আবাসনের আশায় ট্রাম্পের দিকে ঝুঁকেছে। বিশেষ করে যদি অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে। সম্ভবত আজকের তরুণ ভোটাররা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়কে পুরোপুরি গ্রহণ করবে। কিন্তু এটাও সম্ভব যে তারা উভয় দলেই এতটাই অসন্তুষ্ট যে আমরা এমন এক নতুন প্রজন্মের ভোটারের উত্থান দেখছি, যারা প্রতিটি নির্বাচনি চক্রে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেয়। যদি এর ফলে আমাদের বিভক্ত ও অকার্যকর রাজনীতি কিছুটা সংযত হয়, তবে আমরা আজকের তরুণদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব।

লেখক: নীল গ্রস, সমাজবিজ্ঞানী


Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: