পঙ্গুতে রোগীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ

গোলাম মোস্তফা

জাতীয়

ঈদের চাঁদ ওঠার পর স্বাভাবিকভাবেই খুশি হয়েছিলেন যশোর সদরের বাসিন্দা মো. আল আমিন (২৫)। তাই খুশিতে গত রোববার সন্ধ্যায় বন্ধুদের

2025-04-03T10:42:58+00:00
2025-04-03T10:42:58+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬,
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
পঙ্গুতে রোগীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ
গোলাম মোস্তফা
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৫, ১০:৪২ এএম 
পঙ্গু হাসপাতাল। ছবি: সংগৃহীত
ঈদের চাঁদ ওঠার পর স্বাভাবিকভাবেই খুশি হয়েছিলেন যশোর সদরের বাসিন্দা মো. আল আমিন (২৫)। তাই খুশিতে গত রোববার সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হন। কিন্তু সেই খুশি তার বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। বাসা থেকে কিছুদূর যাওয়ার পরই মোটর বাইকের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হন। তার ডান পা ভেঙে গেছে। সেদিন রাত ১টার দিকে তাকে ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে (পঙ্গু হাসপাতাল) ক্যাজুয়ালটি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। তাই তার পুরো পরিবারের ঈদের দিন কেটেছে হাসপাতালের বিছানায়। তাই ঈদের আনন্দ এখন বিষাদে পরিণত হয়েছে তার পরিবারে। এমনকি শেষ পর্যন্ত পা কেটে ফেলতে হয় কি না—সে দুশ্চিন্তায় হাসপাতালে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন আল আমিনের মা বেবি আক্তার। 

তিনি সময়ের আলোকে বলেন, আমার একমাত্র ছেলে এই অবস্থায়... কীসের ঈদ আর কীসের কি? ছেলে শুধু বেঁচে আছে এইটুকুই সান্ত্বনা। শুধু এই পরিবারের সদস্যদেরই ঈদের আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়নি তার মতো আরও অনেকের অবস্থাও একইরকম। 

ঈদের আগে বা পরে মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হওয়া রোগীদের হৃদয়বিদারক ও অবর্ণনীয় দুর্ভোগের দৃশ্য দেখা গেছে। আর আহত রোগী ও স্বজনদের আহাজারিতে যেন ভারি হয়ে উঠছে হাসপাতালের আকাশ-বাতাস। সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে কারও কারও এক পা কিংবা দুই পা ভেঙে গেছে। কারও এক হাত বা দুই হাতেই গুরুতর আঘাত রয়েছে। হাতে-পায়ে লোহার বড় রড লাগানো হয়েছে। আবার কারও কারও হাত-পায়ের পাশাপাশি বুকে, পেটে ও মাথাসহ বিভিন্ন জায়গায় গুরুতর জখম হয়েছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ঈদের আগের দিন রোববার থেকে বুধবার পর্যন্ত এই চার দিনে জরুরি বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন মোট ৯৭৫ জন। এর মধ্যে গত ৩০ মার্চ ২৩৯ জন, তার মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮০ জন। গত ৩১ মার্চ ২৪১ জন আহতের মধ্যে ভর্তি হয়েছেন ৭৬ জন। আর ১ এপ্রিল ৩৩০ জন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। তাদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯৩ জন। আর বুধবার দুপুর ২টা পর্যন্ত আহত ১৬৫ জন চিকিৎসা নিতে আসেন যাদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৬ জন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ঈদের আগের দিন, ঈদের দিন ও ঈদের পর দিন—এই তিন দিনে ৮১০ জন রোগী জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৩৬০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। যা মোট রোগীর ৪৪ শতাংশ। এর মধ্যে ৩১ শতাংশ বাস, অটোরিকশা ও সিএনজি দুর্ঘটনা। ১২ দশমিক ৯৬ শতাংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা আহত। এ ছাড়া উপর থেকে পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন ২৮২ জন। যা মোট রোগীর ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ। বিভিন্নভাবে আঘাত পেয়ে চিকিৎসার জন্য এসেছেন ১১৮ জন বা ১৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ। মারামারি করে আহত হয়েছেন ৫৩ জন বা ৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ। মেশিন চালাতে গিয়ে আহত হয়ে ২৩ জন বা ২ দশমিক ৮ শতাংশ, ভারি জিনিস ওঠাতে গিয়ে হাতে আঘাত পেয়েছেন ৪ জন বা শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশ। পরিসংখ্যানে প্রতিবার ঈদে প্রায় ৪০ শতাংশ রোগী মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু এবার মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহতের সংখ্যা অনেক কমেছে। 

হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, দুর্ঘটনায় আহতদের অধিকাংশই ঢাকার বাইরে থেকে এসেছেন। এর একটি বড় অংশ বয়সে তরুণ, যারা মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। এই রোগীদের কেউ বাইক দুর্ঘটনার শিকার, কেউ গাড়ি দুর্ঘটনায় বা অন্য কোনো কারণে আহত হয়েছেন। কোনো কোনো রোগীর হাত-পা কেটে ফেলার মতো অবস্থাও রয়েছে।

চিকিৎসকরা বলেন, মূলত ঈদের সময় সড়ক ফাঁকা থাকে। ফাঁকা রাস্তায় বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চলাচলে দুর্ঘটনা বাড়ে। তাই ঈদের এই সময়ে রোগীর চাপ সামলাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রতি বছরই সড়কে দুর্ঘটনার সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনিভাবে মানুষ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে পঙ্গুত্ব বরণ করছে। ফলে পরিবারের যে সদস্য দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে বা পঙ্গুত্ব বরণ করছে, সেই পরিবারে অতিরিক্ত একটি বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একটি দুর্ঘটনা যেমন সারাজীবনের কান্না, তেমনই সেই দুর্ঘটনার ফলে একটি পরিবারের সব সদস্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। আবার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির দুর্ঘটনায় আকস্মিক মৃত্যু কিংবা পঙ্গু হওয়ায় একটি পরিবারের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই দুর্ঘটনা রোধে চালকদের সচেতনতা ও গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে যেসব নিয়মকানুন এবং দিকনির্দেশনা আছে, সেগুলো মেনে চলার চলার পরামর্শ দেন তারা।


সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, ঈদের আগে ও পরের বিভিন্ন সময়ে নানা দুর্ঘটনায় আহত রোগী ও স্বজনদের ভিড়ে প্রতিটি ওয়ার্ড পরিপূর্ণ। আবার অনেক শয্যা না পাওয়া রোগীর স্থান হয়েছে ওয়ার্ডের মেঝেতে। বিশেষ করে জরুরি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার ও এক্সরেসহ বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনেও রোগী ও স্বজনদের প্রচণ্ড ভিড় লেগে আছে। এ অবস্থা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আবার রোগীদের সহ্য করতে হচ্ছে অবর্ণনীয় বিড়ম্বনা। দূর-দূরান্ত থেকে আসা তুলনামূলকভাবে কম মারাত্মক রোগীদের ভর্তি না হতে পেরে তাদের জরুরি বিভাগের সামনে অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেছে। বিভিন্ন ওয়ার্ডে অনেকের হাতে-পায়ে কিংবা শরীরের অন্য কোনো জায়গাজুড়ে ব্যান্ডেজ রয়েছে। আবার কারও কারও পায়ে লোহার রড লাগানো। পা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আবার কারও কারও এক হাত কিংবা হাঁটু থেকে পা কেটে ফেলার শঙ্কা রয়েছে। কেউ কেউ পঙ্গুত্বের ঝুঁকিতে রয়েছেন। 

রোগী ও স্বজনদের চোখে-মুখে ছিল আতঙ্কের চাপ। কেউ স্বজনকে জড়িয়ে কান্নাকাটি করছেন। আবার হাসপাতালের শয্যাগুলোতে কোথাও রক্ত বা স্যালাইন দেওয়ার স্ট্যান্ড নেই। কেউ কেউ জানালার গ্রিলে ঝুলিয়ে রক্ত বা স্যালাইন দিচ্ছেন। আবার কাউকে লাঠি সংগ্রহ করে আবার কাউকে হাতে ধরে রক্ত বা স্যালাইন দিতে দেখা গেছে। বুধবার দুপুর ১২টার দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন ২৩ বছরের রিমন হোসেন। 

তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের ভুলতা এলাকায় অটোরিকশা দিয়ে যাচ্ছিলাম। উল্টো দিক থেকে আসা প্রাইভেটকার ধাক্কা দিলে অটোরিকশা উল্টে গেলে গুরুতর আহত হই। এর মধ্যে এক পায়ের হাড় ভেঙে গেছে। এ ছাড়া শরীরের নানা জায়গায় গভীর ক্ষত হয়েছে। তিনি বলেন, যে ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলাম। একমাত্র উপরওয়ালা রক্ষা করেছে। নইলে বাঁচার কথা নয়। এখনও ঘোরের মধ্যে আছি।

বুধবার দুপুরে কথা পঙ্গু হাসপাতাল ক্যাজুয়ালটি ১নং ওয়ার্ডের বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছেন আরিফ হোসেন। তার ডান পা জুড়ে ব্যান্ডেজ। অসহ্য ব্যথা যন্ত্রণায় চিৎকার করছেন। আর পাশে বসা স্ত্রী মাথায় হাত বুলিয়ে নানাভাবে তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। 

আরিফ হোসেন সময়ের আলোকে জানান, সাভার এলাকায় গার্মেন্টেসে চাকরি করেন। মা-বাবা, স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে তার সংসার। ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি বরিশালের পাথরঘাটায় গিয়েছিলেন। সেখানেই ঈদের দিন সোমবার সন্ধ্যায় ফাঁকা রাস্তায় বেপরোয়া গতিতে অটোরিকশার চলাচলে দুর্ঘটনার শিকার হন। তারপর ওই দিনই তাকে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। 

আরিফ হোসেন জানান, দুর্ঘটনার পর এরই মধ্যে তার ১০ হাজার টাকা ধার করেছেন। তিনি কবে কাজে ফিরবেন, আদৌ ফিরতে পারবেন কি না, তা এখনও জানেন না। কীভাবে তার চিকিৎসা চলবে, পরিবার কীভাবে চলবে, সে চিন্তাই সারাক্ষণ মাথায় ঘুরছে।

ঈদের রোগীদের ভিড় কতটা বেড়েছে এ বিষয়ে হাসপাতালে আবাসিক চিকিৎসক সৌরভ নাথ শুভ সময়ের আলোকে বলেন, এখানে স্বাভাবিক সময়ে গড়ে ২০০ রোগী আসেন। কিন্তু এখন গড়ে তিনশরও বেশি রোগী আসছে। ফলে রোগীর চাপ সামাল দিতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমরা টানা ডিউটি করছি। বিশেষ করে গত দুদিনে দুপুরের পর চাপ খুব বেশি ছিল। এর মধ্যে যাদের অবস্থা খুব ক্রিটিক্যাল তাদের ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আর যারা দুর্ঘটনায় সামান্য আহত হয়েছেন তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

পঙ্গু হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আবুল সময়ের আলোকে বলেন, স্বাভাবিক সময়ের রোগীর চাপ অনেক বেড়েছে। আর প্রতি বছরই ঈদের সময়ে দুর্ঘটনা বাড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। কারণ এই সময়ে রাস্তাঘাট ফাঁকা থাকে। ফলে বেপরোয়া গতির মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন চালানো হয়। বিশেষ করে তরুণরা মোটরসাইকেল চালানোর কারণে দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। তরুণরা একই মোটরসাইকেলে দুই-তিনজন করে উঠে এমনভাবে বাইক চালায় যে, এতে তারা নিজেরাও নিজেদের সর্বনাশ করে এবং অন্যেরও ক্ষতি করে।

তিনি বলেন, আমাদের দেশে বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চালানো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আর ট্রাফিক সিস্টেম উন্নত করার পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে চালকদেরও গাড়ি চালাতে সতর্ক থাকতে হবে। নইলে কোনোভাবেই দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব নয়।


  বিষয়:   হাসপাতাল  রোগী  পঙ্গু হাসপাতাল 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: