প্রকাশ: শুক্রবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৫, ৯:২৩ পিএম (ভিজিট : ৯৯৫)
প্রতীকী ছবিঘুম নিয়ে আমাদের নানা রকম ভাবনা আছে। অনেকেই মনে করেন ঘুম মানেই ৮ ঘণ্টা। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এই ধারণা আদৌ ঠিক নয়। আসলে ঘুমের দৈর্ঘ্য বা ব্যাপ্তি নির্ভর করে ব্যক্তির বয়স, স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য অনেক বিষয়ের উপর।
এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘুম বিষয়ক গবেষক র্যাফায়েল প্যালায়ো।
এক গবেষণা প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, ঘুম প্রত্যেক মানুষের জীবনের অপরিহার্য অংশ। নিজের প্রতি যত্ন নেওয়ার প্রথম এবং সবচেয়ে সহজ পদক্ষেপ হলো ঘুম। কতক্ষণের ঘুম দরকার, শুধু সেটি জেনে আসলে লাভ নেই। যদি না আপনার ঘুমের মান ভালো হয়। ঘুমের দৈর্ঘ্য এবং মান, দুই-ই গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই বিষয় যদি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়, তাহলে ঘুম থেকে ওঠার পর আর ক্লান্তি থাকে না।
কার জন্য কতক্ষণ ঘুম
এ ব্যাপারে চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, সবচেয়ে বেশি ঘুমের প্রয়োজন নবজাতকদের। প্রতিদিন তাদের অন্তত ১৪ থেকে ১৭ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। ২৬-৬৪ বছর বয়সীদের বয়স ও স্বাস্থ্যভেদে ঘুম প্রয়োজন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা। আরও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এর থেকে কিছুটা কম এবং ১৬-২৫ বছরের মানুষদের আরও কিছুটা বেশি ঘুমানো দরকার।
২০১৫ সালে আমেরিকান একাডেমি অব স্লিপ মেডিসিন এবং স্লিপ রিসার্চ সোসাইটি অতীতের কয়েক হাজার গবেষণা প্রবন্ধ পর্যালোচনা করে বিভিন্ন বয়সী মানুষের ঘুমানোর সময়সীমার প্রস্তাব করে। তাতে ১ থেকে ২ বছর বয়সী শিশুদের ১১ থেকে ১৪ ঘণ্টা ঘুমানোর কথা বলা হয়েছে। ১৪-১৭ বছর বয়সীদের ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা এবং ২৬ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের ৭-৯ ঘণ্টা ঘুমাতে বলা হয়েছে। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানো দরকার।
জনস হপকিন্সের বিহেভিয়ারাল স্লিপ মেডিসিন চিকিৎসক মলি অ্যটউড জানিয়েছেন, এমন বহু রোগী দেখি আমরা, যারা জানান, বেশ কয়েক ঘণ্টা ঘুমানোর পরও ক্লান্তি কাটে না। তার মানে বুঝে নিতে হবে, পাশাপাশি অন্য অনেক সমস্যা আছে। বেশির ভাগ মানুষই ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমান। সেই বিশেষ শ্রেণির মানুষের স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকিও কম। কেউ যখন ৬ ঘণ্টার কম অথবা ৯ ঘণ্টার বেশি ঘুমান, তখনই রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
ঘুমের বিজ্ঞান
মানুষ প্রায় প্রতি ৯০ মিনিট অন্তর ঘুমের একটি করে পর্যায় পার করেন। রাতের প্রথম অংশে গভীর ঘুম হয়, যা শরীর মেরামত এবং শক্তি পুনরুদ্ধারের জন্য অপরিহার্য। শেষের দিকে, ঘুম চক্রের বেশির ভাগ সময় ঘুমের মধ্যে চোখের পাতা নড়াচড়া করে। অর্থাৎ, ঘুমন্ত ব্যক্তির আরইএম (র্যাপিড আই মুভমেন্ট) ঘটে। এর অর্থ, ব্যক্তি স্বপ্ন দেখছেন। এই সময়টি স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
না ঘুমানোর ক্ষতি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, যে কারণেই হোক রাতে ঘুম ভালো না হলে পরের দিনটি হয় বিশৃঙ্খল। রাতে ঘুম না হলে কর্মকর্তা কাজের মধ্যে, শিক্ষার্থী স্কুলে অথবা চালক গাড়ি চালানোর সময় ঘুমিয়ে পড়তে পারে। ঘুম না হলে মানুষ ক্লান্ত বোধ করে, মনোযোগ ও সতর্কতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘুম না হলে অনেক সময় মানুষ স্মৃতিভ্রষ্ট হয়। ঘুম না হওয়া মানুষ খিটখিটে মেজাজের হয়, কেউ কেউ হতাশায় ভোগে। ঘুমের সমস্যায় থাকা মানুষের দুর্ঘটনায় পড়া বা আহত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
ঘুমানোর উপকার
ঘুমের মধ্যে শরীরে নানা ধরনের জৈবিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে যা বাধাগ্রস্ত হয়। এসব প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন না হলে শরীরে বাসা বাঁধতে পারে জটিল সব রোগ। শক্তি সংরক্ষণের জন্য আমাদের ঘুমের প্রয়োজন। ঘুমন্ত অবস্থায় আমাদের শরীরে ক্যালরির চাহিদা কমে যায়। ঘুমের মধ্যে আমাদের জৈবিক প্রক্রিয়া ধীর গতিতে চলে। আমাদের শরীরের কোষগুলো মেরামতের জন্যও পর্যাপ্ত ঘুম প্রয়োজন। ঘুমের মধ্যে আমাদের শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলো নিজেদের মেরামত করে এবং টিস্যুগুলো পুনরায় বৃদ্ধি পায় বলে জানাচ্ছে গবেষণা।
আমাদের মস্তিষ্ক ঠিকভাবে কাজ করতে হলে পর্যাপ্ত ঘুমের প্রয়োজন। আমাদের মস্তিষ্কে বিলিয়ন বিলিয়ন নিউরন রয়েছে। ঘুমের মধ্যে এসব নিউরন সেল থেকে সারা দিন তৈরি হওয়া বর্জ্য পদার্থ পরিষ্কার করে। আমাদের স্মৃতিশক্তি তৈরিতেও ঘুমের অবদান রয়েছে। ঘুম আমাদের ক্ষুধার হরমোন নিয়ন্ত্রণে রাখে। আর এর ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে ঘুম।