প্রবাসে বাংলা বর্ষবরণে ভিন্ন আমেজ

নিরঞ্জন রায়

সম্পাদকীয়

পাশ্চাত্যের অন্যতম এক বৃহৎ নগরী টরন্টো আসার পর থেকে আমি একটি কথা সবসময়ই বলে থাকি এবং আমার অনেক লেখায়ও উল্লেখ

2025-04-13T03:25:26+00:00
2025-04-13T03:25:26+00:00
 
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
সম্পাদকীয়
প্রবাসে বাংলা বর্ষবরণে ভিন্ন আমেজ
নিরঞ্জন রায়
প্রকাশ: রোববার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৫, ৩:২৫ এএম 
প্রবাসে বাংলা বর্ষবরণে ভিন্ন আমেজ
পাশ্চাত্যের অন্যতম এক বৃহৎ নগরী টরন্টো আসার পর থেকে আমি একটি কথা সবসময়ই বলে থাকি এবং আমার অনেক লেখায়ও উল্লেখ করেছি যে এখন আর এই শহরকে মোটেই বিদেশ মনে হয় না। এখানে এখন অসংখ্য বাংলাদেশি বসবাস করে। বলা চলে বিশাল এক বাংলাদেশি কমিউনিটি গড়ে উঠেছে। এই কমিউনিটিতে যেমন আছে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ, তেমনি আছে সব বয়সের মানুষ। আমাদের অগ্রজ, অনুজ, সমসাময়িক এবং নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশিদের এক বিশাল মিলন মেলা ঘটেছে এই টরন্টো শহরে। এমনকি আমাদের আগের প্রজন্মের জ্যেষ্ঠ বাংলাদেশিও অনেক আছেন। বাংলাদেশিদের এমন অবস্থান যে শুধু এই টরন্টো শহরে দেখা যায় তেমন নয়। একইরকম দৃশ্য মোটামুটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ নগরীতে। নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া, লন্ডন, প্যারিস, সিডনি, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের সব শহরে একই অবস্থা। বিশ্বের প্রতিটি নগরী যেন প্রবাসে একটি ছোট্ট বাংলাদেশে রূপান্তরিত হয়েছে। এটি আমাদের জন্য যেমন গর্বের, তেমনি আনন্দের।

প্রবাসের এই শহরে বিশাল বাংলাদেশি কমিউনিটি গড়ে ওঠার কারণে এখানে বাংলাদেশের সব জিনিসপত্র যেমন পাওয়া যায়, তেমনি আমাদের সব অনুষ্ঠান এবং পার্বণ উদযাপিত হয়ে থাকে। একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস এবং বিজয় দিবসের মতো জাতীয় অনুষ্ঠান যেমন যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়, তেমনি ঈদ, দুর্গাপূজা, বুদ্ধপূর্ণিমাসহ সব ধর্মীয় অনুষ্ঠান যথেষ্ট উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে থাকে। একইভাবে অনেক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন অঞ্চলের অনেক অনুষ্ঠানও এখানে অনুষ্ঠিত হয়। এককথায় বাংলাদেশের হেন কোনো অনুষ্ঠান নেই, যা এই প্রবাসে আয়োজন করা হয় না। তবে সব আয়োজনকে ছাড়িয়ে যে অনুষ্ঠানটি সবার ওপরে স্থান করে নিয়েছে তা হচ্ছে পহেলা বৈশাখ, যা মূলত বাংলা বর্ষবরণ হিসেবে স্বীকৃত। এই অনুষ্ঠানের বিশেষত্ব হচ্ছে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ সমান উৎসাহ নিয়ে অংশগ্রহণ করে। এককথায় বাংলাদেশের মতোই পহেলা বৈশাখ একটি সর্বজনীন অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

পাশ্চাত্যের কর্মসংস্কৃতির এই শহরে সাপ্তাহিক ছুটির দিন না হলে কোনো অনুষ্ঠানই সেভাবে জমে না। একই অবস্থা বাংলা বর্ষবরণের ক্ষেত্রেও। 

যে বছর পহেলা বৈশাখ শনি বা রোববার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পড়ে, সে বছরের আয়োজন সব মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। আর যে বছর এই দিন সাপ্তাহিক কাজের দিবসে পড়ে, তখন পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান আর পহেলা বৈশাখে সেভাবে আয়োজন করা সম্ভব হয় না। তখন কিছুটা বিকল্প পদ্ধতিতে আয়োজন করতে হয়। বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা, বিশেষ করে ‘এসো হে বৈশাখ’ গান গেয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা খুবই সীমিত পরিসরে সম্পন্ন করে, সমগ্র অনুষ্ঠান নিয়ে যাওয়া হয় পরবর্তী সাপ্তাহিক ছুটির দিনে। সে সময় অবশ্য পুরো আয়োজনটা বাংলাদেশের অনুষ্ঠানের মতো করেই সাজানো হয়। অর্থাৎ পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বাংলাদেশে যেসব অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়, যেমন-ভোরে ‘এসো হে বৈশাখ’ গান গেয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেলা, এসব কিছুই এই প্রবাসের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে হয়ে থাকে।

বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের যে বিশেষ আকর্ষণ, আনন্দ শোভাযাত্রা, তারও আয়োজন করা হয় এই টরন্টো বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে। তবে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে কিছু মেলার আয়োজন এখনও সীমিত পরিসরে হয়ে থাকে। সে রকম মেলার আয়োজন এই প্রবাসের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানেও হয়ে থাকে। সেই মেলায় পাওয়া যায় সবকিছুই। বাংলাদেশের মেলায় যেসব জিনিসপত্র, বিশেষ করে সুভেনির জাতীয়, গ্রামীণ স্মৃতির অনেক জিনিস এখানে বেশ ভালোই পাওয়া যায়। পহেলা বৈশাখের যে বিশেষ আয়োজন হালখাতা, সেটি আর প্রবাসের আয়োজনে দেখা যায় না। এর সুযোগ ও প্রয়োজন কোনোটাই নেই। এখন অবশ্য বাংলাদেশেও হালখাতার আয়োজন হয় না। এই আয়োজন এখন বলা চলে স্মৃতির পাতায় স্থান করে নিয়েছে। অবশ্য ঐতিহ্যের সাক্ষী হিসেবে পুরান ঢাকায় এখনও কিছু হালখাতার আয়োজন চালু আছে বলে শুনেছি।

বাংলাদেশের মতো বর্ষবরণের দিন লালপেড়ে সাদা শাড়ি পরে বেশ সেজেগুঁজে, বিশেষ করে চুলের খোঁপায় ফুলের মালা দিয়ে সারা দিনের জন্য বের হয়ে যায় বর্ষবরণ অনুষ্ঠান উপভোগ করার জন্য। আর ছেলেরা চিরচেনা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে চলে আসে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে। বহু সংস্কৃতির বা মাল্টিকালচারাল শহর নামে খ্যাত এই টরন্টো সেজে ওঠে এক বর্ণিল শোভায়। এ রকম অনুষ্ঠান দেখে এখানকার মূলধারার জনগণও আবেগাপ্লুত হয়ে যায়। তারা অনুষ্ঠানে সরাসরি অংশ না নিলেও বেশ উপভোগ করে থাকে। দাঁড়িয়ে থেকে গভীর মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে। অনেকে হাত নেড়ে উৎসাহ দিয়ে থাকে। অনেকেই আবার বেশ কৌতুহল নিয়ে বিস্তারিত জানতে চায়। ইউনেস্কো পহেলা বৈশাখের আনন্দ শোভাযাত্রাকে স্বীকৃতি দেওয়ায় আমাদের বিষয়টি বোঝাতে অনেক সুবিধা হয়েছে।

এই প্রবাসের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান উপভোগ করার জন্য দেশের মতো সবাই খুব সকালে বাসা থেকে বের হয়ে সারা দিন বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে অনুষ্ঠান উপভোগ করে থাকে। দিনের খাবার-দাবারের কাজটা বাইরেই সেরে ফেলে। এখানে বেশ কয়েকটি বাঙালি মালিকানাধীন খাবারের দোকান আছে। সেখানে একেবারে বাঙালি খাবার, যেমন-বিভিন্ন পদের ভর্তা, মাছের তরকারি, হরেক রকম পিঠা এর সবকিছুই পাওয়া যায়। এমনকি পহেলা বৈশাখের বিশেষ আকর্ষণ পান্তা ইলিশও পাওয়া যায়। এমনিতেই প্রবাসে ইলিশ মাছের দাম বেশ চড়া। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে এই দাম আরও বেড়ে যায়। দাম বেশি হলেও সবাই এসব খাবার বেশ উপভোগ করে। বিদেশে বসে দেশের স্বাদ। এর মজাই ভিন্ন।

দিনের শেষে অনুষ্ঠিত হয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এখানে বিভিন্ন গ্রুপ এবং অ্যাসোসিয়েশন এসব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। এখানে অবশ্য এ রকম গ্রুপ এবং অ্যাসোসিয়েশনের অভাব নেই। ছায়ানট, উদীচী, বিভিন্ন মন্দির ও কালচারাল সংস্থা, ৬৪ জেলা সমিতি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি, বিভিন্ন কলেজ সমিতি। এ ছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শাখা-প্রশাখা তো আছেই। এও এক বিচিত্র ধারা। 

এসব গ্রুপ, সংস্থা এবং সমিতির অনেকেই পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। এসব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্থানীয় বাংলাদেশি শিল্পীরাই গান ও নিত্যপরিবেশন করে থাকেন। তাদের পরিবেশনা বেশ চমৎকার এবং বেশ উপভোগ করার মতো। এই প্রবাস জীবনে নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে এবং ব্যস্ত জীবনের পাশাপাশি কীভাবে যে নিজ সংস্কৃতির চর্চা ধরে রেখেছে, তা আসলেই অবাক করার মতো। দেশ এবং সংস্কৃতির প্রতি অবিচল থাকলে এই মাপের নিজ সংস্কৃতি চর্চা সম্ভব। অবশ্য মাঝেমধ্যে দেশ থেকে অনেক জনপ্রিয় শিল্পীও অতিথি হয়ে এখানে আসেন পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশনের জন্য। তখন অনুষ্ঠানের মাত্রা আরও অনেক বেড়ে যায়। প্রবাসে বাংলা বর্ষবরণ উদযাপনের এক বিশেষ আয়োজন আছে। এসব নাগরিক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি অনেকের বাসায় ঘরোয়াভাবে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যা নববর্ষের পার্টি হিসেবে বহুল পরিচিত। এখানে অধিকাংশের বাসায় এই বর্ষবরণ পার্টি হয়ে থাকে, যেখানে পরিচিত সবাই কারও বাড়িতে মিলিত হয়ে এই ঘরোয়াভাবে বর্ষবরণের আয়োজন করে। এই অনুষ্ঠানে তিন ধরনের আকর্ষণ থাকে। এক হরেক রকম সুস্বাদু খাবার, দুই ঘরোয়া পরিবেশে গানবাজনার আয়োজন এবং তিন চুটিয়ে আড্ডা। খাবার-দাবারের ক্ষেত্রেও এক বিশেষত্ব আছে। যার বাসায় এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, সে নিজেই যেসব খাবার-দাবারের জোগাড় করে তেমন নয়। বরং অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত প্রত্যেকে একেকটি বিশেষ এবং পছন্দের খাবার তৈরি করে নিয়ে আসে। ফলে যতজন অংশগ্রহণকারী থাকে, তত পদের খাবার পরিবেশনের সুযোগ হয়, অথচ কারও ওপর তেমন কোনো চাপ সৃষ্টি হয় না। এভাবে খাবারের আয়োজনকে এখানে পটলাক পার্টি বলা হয়, যা খুবই জনপ্রিয়। এমনকি এখানকার অফিস-আদালত বা কর্মক্ষেত্রেও এই পটলাক পার্টি বেশ জনপ্রিয়।

এভাবেই বাংলা বর্ষবরণ উদযাপন করা হয় এই প্রবাসে। আয়োজনের ভিন্নতা আছে, কিন্তু উদযাপনের কমতি নেই মোটেই। প্রবাসের জীবনযাত্রার ধরন ভিন্ন। অনুষ্ঠানের ব্যাপ্তি ভিন্ন। তাই এখানে বর্ষবরণের আমেজ ভিন্ন হবে, এটিই স্বাভাবিক। এত কিছুর পরও দেশে থেকে, অনেক দূরে থেকেও যে দেশের মতো করেই বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান উদযাপন করা যায়, সেটিই অনেক কিছু। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা, যারা এই পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠছে, তারাও যখন যথেষ্ট উৎসাহ নিয়ে এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে যোগ দেয় এবং দেশের মতো করেই উপভোগ করে, তখন গর্বে মনটা ভরে যায়। আর তখনই প্রবাসে বর্ষবরণের সার্থকতা শতভাগ পূর্ণ হয়।

লেখক- নিরঞ্জন রায়, অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং বিশেষজ্ঞ


Loading...
Loading...
সম্পাদকীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: