বৈশাখ গ্রামীণ জনপদে মানুষের জীবনে এক নতুন বার্তা নিয়ে আসে। গ্রীষ্মের আগমন, ফসলের মাঠের সোনালি স্বপ্ন আর প্রকৃতির নবীন সাজে সেজে ওঠে চারপাশ। এ সময়েই অনুষ্ঠিত হয় প্রান্তিক মানুষের ঐতিহ্যবাহী উৎসব, বৈশাখী মেলাসহ বিভিন্ন আয়োজন। প্রায় প্রতিটি জনপদে বৈশাখের এমন আয়োজনে ফুটে ওঠে গ্রামবাংলার চিরায়ত রূপ।
পহেলা বৈশাখের দিন গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন শাকসবজি দিয়ে বিশেষ ধরনের রান্না করে খাওয়া হয়। পহেলা বৈশাখ সকালে শিশুরা সেজেগুঁজে বের হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শোভাযাত্রায় অংশ নেয়। পান্তা-ইলিশের আয়োজনও থাকে এতে। ছোটদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বড়রাও যথাসাধ্য নতুন পোশাক পরার চেষ্টা করে।
ঘরে ঘরে নতুনকে বরণ করার একটা প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। বাড়িতে অতিথির আগমন ঘটে। জামাই-মেয়ে বেড়াতে আসে বাপের বাড়ি। চারদিকে একটা উৎসবের আমেজ ফুটে ওঠে।
গ্রামীণ জনপদের মানুষ সাধারণত সারা বছর ধরে অপেক্ষা করে বৈশাখী মেলার জন্য। এটি কেবল একটি উৎসব নয় বরং তাদের অর্থনৈতিক কর্মকা-ের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। মেলায় স্থানীয় কারুশিল্প, হস্তশিল্প, মৃৎশিল্প, বস্ত্রশিল্প এবং কৃষিজাত পণ্যের বিপুল সমাহার ঘটে। মৃৎশিল্পী (কুমোর) তার নিপুণ হাতে তৈরি মাটির পাত্র নিয়ে বসেন, তাঁতি নিয়ে আসেন বাহারি রঙের শাড়ি ও কাপড়, কাঠমিস্ত্রি নিয়ে আসেন কাঠের কারুকার্যময় জিনিস, আর কৃষক নিয়ে আসেন তাদের উৎপাদিত ফল, সবজি ও শস্য।
বাজারের খোলা জায়গায়, কয়েকটি গ্রামের মিলনস্থল বড় ময়দান কিংবা বিদ্যায়তনের মাঠে এ মেলা বসে। মেলায় শুধু কেনাকাটা নয়, বিনোদনও মেলে। সার্কাস, নাগরদোলা, পুতুল নাচের দল, ম্যাজিক শো মেলাকে করে তোলে আরও বর্ণিল ও আনন্দময়।
গাইবান্ধার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব প্রমতোষ সাহা বলেন, বৈশাখী মেলা গ্রামীণ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। লোকনৃত্য, লোকসংগীত, যাত্রা এবং বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার আয়োজন মেলার আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে তোলে। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে এই উৎসবে শামিল হতে। এর ফলে স্থানীয় খাবার হোটেল এবং পরিবহন ব্যবসায়ও চাঞ্চল্য দেখা যায়, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বাণিজ্যনগরী চট্টগ্রামজুড়ে বসে মেলার আসর। নগরী থেকে মফস্বল এলাকায় সমানতালে চলে এসব আয়োজন। চট্টগ্রামের বৈশাখী মেলার ইতিহাস অনেক পুরোনো। এ ছাড়া বৈশাখ এলেই চট্টগ্রামে পুরোনো রীতি বলী খেলার আয়োজন হয়। বলী খেলা ও বৈশাখী মেলা চট্টগ্রামের শতাব্দী প্রাচীন সর্বজনীন এক লোক উৎসবের নাম। শত বছরের বৈশাখের ইতিহাসে বলী খেলায় ছেদ পড়ে কেবল চারবার। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময় জব্বারের বলী খেলা হয়নি দুবার। এরপর করোনা মহামারির সময় দুবার মেলা হয়নি। এরপর চিরায়ত বৈশাখ বেশ বর্ণাঢ্য আয়োজনে বরণ ও উদযাপন হয়ে আসছে। প্রতি বছর ২০ এপ্রিলের পর তিন দিনব্যাপী বৈশাখী বলী খেলা ও মেলা আয়োজন করা হয়। বলী খেলা জব্বারের বলী খেলা নামে পরিচিত। বলী খেলা নামে কুস্তিগিরদের প্রতিযোগিতাই চলে।
চট্টগ্রামে বৈশাখী মেলার বলী খেলার ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, প্রতি বছর চৈত্রের শেষার্ধে আর বৈশাখের প্রথমার্ধে আসে মাসব্যাপী বলী খেলার মৌসুম। সঙ্গে সঙ্গে বসে আনন্দ মেলা। নতুন পণ্যের আমদানি হয় এবং চলে হরদম বেচাকেনা। দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে ১৩৪৫-৪৬ সালে পরিব্রাজক ইবনে বতুতার পরিদর্শন ধন্য বরহনক থেকে আনক্যা বলীরা খেলায় যোগ দিতে আসছে, তখন দর্শকদের আগ্রহ ও উত্তেজনা বেড়ে যায়।
চট্টগ্রামের খ্যাতনামা কথাসাহিত্যিক আবুল ফজলের আত্মজীবনী ‘রেখাচিত্রে’ চট্টগ্রামের বলী খেলা ও বৈশাখী মেলার নানা দিক উঠে আসে। তিনি লেখেন, তখন আমাদের দেশে বলী বা কুস্তি খেলা ছিল গ্রাম্য উৎসবের এক অপরিহার্য অঙ্গ। চৈত্র-বৈশাখ এলেই গ্রামে গ্রামে পড়ে যেত এক সাড়া। এখনও চট্টগ্রামের জনজীবন থেকে কুস্তি খেলা নিশ্চিহ্ন হয়নি। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ থেকে চট্টগ্রাম নগরীর বাইরে রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, বোয়ালখালী ও পটিয়া এলাকায় বিভিন্ন নামে বৈশাখী মেলা বসে। বৈশাখকে কেন্দ্র করে বেচাকেনা চলে লাখ লাখ টাকার পণ্য।
(প্রতিবদেন তৈরিতে সহায়তা করেছেন চট্টগ্রাম ব্যুরো ও গাইবান্ধা প্রতিনিধি)