শিল্প খাতে নতুন সংযোগের ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া পুরোনো সংযোগের ক্ষেত্রে যারা অনুমোদিত লোডের ৫০ শতাংশের বেশি ব্যবহার করবেন তাদের বেলায়ও দাম বাড়ানো হয়েছে। নতুন গ্রাহকের ক্ষেত্রে শিল্পের বয়লারে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ঘনমিটার প্রতি ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা এবং ক্যাপটিভে ৩১.৭৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যমান যেসব শিল্প প্রতিষ্ঠান ৫০ শতাংশের বেশি লোড ব্যবহার করবেন তাদেরকে ৩০ টাকার পরিবর্তে ৪০ টাকা দরে বিল দিতে হবে। নতুন দর চলতি এপ্রিল মাসের বিল থেকেই কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসি। রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন দর ঘোষণা করেন বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সদস্য মিজানুর রহমান, সদস্য সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া, আবদুর রাজ্জাক ও শাহীদ সারোয়ার। পেট্রোবাংলা এর আগেই প্রস্তাব দিয়েছিল, বিদ্যমান গ্রাহকদের (শিল্প ও ক্যাপটিভ) জন্য দাম যথাক্রমে ৩০ ও ৩১ দশমিক ৭৫ টাকা অপরিবর্তিত রেখে নতুন সংযোগপ্রাপ্ত ও প্রতিশ্রুত (যাদের সংযোগ অনুমোদিত হয়েছে) গ্রাহকদের জন্য গ্যাসের মূল্য বাড়ানো হোক।
প্রস্তাবে বলা হয়, প্রতিশ্রুত গ্রাহকদের অর্ধেক গ্যাসের বিল বিদ্যমান দরে এবং বাকি অর্ধেকের জন্য ৭৫ দশমিক ৭২ টাকা হারে আদায় করা হোক। আর নতুন শিল্প ও ক্যাপটিভ গ্রাহকদের জন্য গ্যাসের মূল্য ৩০ ও ৩১ দশমিক ৭৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে সরাসরি ৭৫ দশমিক ৭২ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পেট্রোবাংলার দাম বৃদ্ধির এই প্রস্তাবের ওপর গত ২৬ ফেব্রুয়ারি শুনানি গ্রহণ করে বিইআরসি।
পেট্রোবাংলা তাদের প্রস্তাবে বলেছে, দাম না বাড়ালে বছরে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হবে। পেট্রোবাংলার সেই প্রস্তাব নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। শুনানিতেও ব্যবসায়ী ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা তীব্র আপত্তি তোলেন। বিশেষ করে শিল্পে দুই ধরনের দর করার বিরোধিতা করেন সবাই। শুনানিতে অনেকেই শিল্পে দুই ধরনের দরের বিষয়ে আপত্তি জানান। তারা মনে করেন, বিদ্যমান শিল্পের জন্য গ্যাসের দর অপরিবর্তিত রেখে নতুন শিল্পের জন্য বাড়তি দাম নির্ধারণ করা হলে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। শুনানিতে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবকে ‘বেআইনি’ ও ‘গণবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, দেশের গ্যাস কমার সঙ্গে সঙ্গে এলএনজি আমদানি বাড়তে থাকে। এলএনজির বাড়তি দাম দিতে গিয়ে চাপে পড়ে পেট্রোবাংলা। তারা ১৫০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছিল। তবে গণশুনানিতে বেশিরভাগ অংশগ্রহণকারী দাম বাড়ানো নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। দাম বাড়ানো হলেও এর পক্ষে যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারেনি বিইআরসি। মূল্যবৃদ্ধিতে সরকার কত টাকা বাড়তি আয় করবে, তা জানে না কমিশন। সাধারণত কোম্পানিগুলোর রাজস্ব চাহিদা হিসাব করে বিইআরসি। এরপর ঘাটতি পূরণে সরকার ঘোষিত ভর্তুকির ভিত্তিতে মূল্য সমন্বয় করা হয়।
কীসের ভিত্তিতে দাম বাড়ানো হলো, এমন প্রশ্নের জবাবে বিইআরসির চেয়ারম্যান বলেন, রাজস্ব চাহিদা ধরলে দাম অনেক বেশি বাড়াতে হতো। তাই ভোক্তার জন্য সহনীয় রাখতে ৩৩ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভর্তুকিরও হিসাব করা হয়নি। যতটুকু না বাড়ালেই নয়, সে বিবেচনায় ঘনমিটারে ১০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। নতুন দাম চলতি এপ্রিল মাসের বিল থেকেই কার্যকর হবে।
তিনি আরও বলেন, শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ঘনমিটারপ্রতি দাম ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্যাপটিভে ৩১ দশমিক ৭৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজস্ব চাহিদা যাচাই ছাড়া এভাবে মূল্যবৃদ্ধি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে করা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের প্রেসক্রিপশনে করা হয়নি।
নতুন ও পুরোনো শিল্পে আলাদা দাম রেখে যে বৈষম্য তৈরি করা হয়েছে, এটা আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে কি না; এমন প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, বিইআরসির আইনি আওতার মধ্যে থেকেই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিনিয়োগ কমার বিষয়টা এখনই বলা যাবে না। নতুন বিনিয়োগে প্রভাব পড়বে কি না, তা নজরে রাখা হবে। নতুন যারা আসবে, তারা যদি দেখে তাদের পোষাবে, তা হলে তারা আসবে। তারা বিকল্প জ্বালানিও ব্যবহার করতে পারে। দাম ঘোষণার সময় বলা হয়, শুনানিতে অংশগ্রহণকারীরা মূল্যবৃদ্ধির বিরোধিতা করে ‘সিস্টেম লস’ কমাতে বলেছিল। এটা দ্রুত কমানো খুব কঠিন। এ নিয়ে তাগাদা দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে সব কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন মূল্যায়ন করা হবে। পেশাদার নিরীক্ষক নিয়োগ করে আয়-ব্যয়ের যথার্থতা যাচাই করা হবে। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি বাড়াতে বলা হয়েছে। এর আগে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের কথা বলে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শিল্পে ১৫০ থেকে ১৭৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয় শিল্পে গ্যাসের দাম। শিল্প ও ক্যাপটিভে প্রতি ইউনিটের দাম করা হয় ৩০ টাকা। পরে গত বছর ক্যাপটিভে দাম বাড়িয়ে করা হয় ৩১ টাকা ৫০ পয়সা।
এদিকে শিল্প খাতে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, ব্যবসায়ীরা এমনিতেই অনেক চাপে আছে। দাম বাড়ানোর ফলে শিল্প উদ্যোক্তাদের চরম বিপাকে পড়তে হবে। গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ জনিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি তাসকিন আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, ‘হুটহাট গ্যাসের দাম বাড়ানো নিয়ে সরকারের ওপর মহলের সঙ্গে আমরা অনেক কথা বলেছি। এমনিতেই আমরা যারা উদ্যোক্তা তারা অনেক চাপে আছি। ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়ানো হয়েছে। গত দেড় দশকের মধ্যে এখন ক্রেডিট রেট সবচেয়ে কম। এসব বিড়ম্বনা নিয়েই ব্যবসা করতে হচ্ছে আমাদের। এর মধ্যে আবার গ্যাসের দাম বাড়ানোয় বিড়ম্বনা আরও বেড়ে গেল।
তিনি আরও বলেন, সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা। আবার এভাবে গ্যাসের দামও বাড়ানো হচ্ছে। তা হলে বিনিয়োগ বাড়বে কীভাবে। এভাবে গ্যাসের দাম বাড়ালে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের সাহস পাবেন কীভাবে। আমি মনে করি গ্যাস-বিদ্যুতের একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা দরকার। হুটহাট করে দাম না বাড়িয়ে যদি একটা দীর্ঘমেয়াদি প্ল্যান থাকে যে, এক বছর পর ৫ বা ১০ শতাংশ বাড়ানো হবে। এভাবে দুই বছর পর কত, ৫ বছর পর কত বাড়ানো হবে, সেটি যদি আগে থেকে নির্ধারণ করে দেওয়া হতো তা হলে উদ্যোক্তারা সে অনুযায়ী তাদের ব্যবসার প্ল্যান ঠিক করতে পারতেন। সেটি না করে হুটহাট এভাবে কখনো গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে, কখনো বিদ্যুতে দাম বাড়ানো হচ্ছে। এতে করে শিল্প উদ্যোক্তাদের চরম বিপাকে পড়তে হচ্ছে।