পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, বিদেশি ঋণের প্রকল্পে বাধ্য হয়েই পরামর্শক নিয়োগ দিতে হচ্ছে। যেকোনো বিদেশি বড় ঋণ নিতে হলে ছোট পরামর্শকের বোঝা ঘাড়ে নিতেই হবে। সেটি না হলে ঋণ দিতে চায় না দাতাগোষ্ঠীরা।
রোববার (২১ এপ্রিল) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা। এ সময় পরিকল্পনা সচিব ইকবাল আবদুল্লাহ হারুনসহ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর আসলে সমুদ্রবন্দর নয়। এটি মূলত নদীবন্দর। কাজেই আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সমুদ্রবন্দর দরকার। এ জন্য বে টার্মিনালের অবকাঠামো উন্নয়নে মেগা প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এর একটি অনুমোদন পেল।
তিনি বলেন, আরও একটি প্রকল্প নেওয়া হবে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে। সব মিলিয়ে এখানে চারটি টার্মিনাল হবে এবং এটি মেগা প্রকল্প হবে। প্রকল্পটি যাতে দ্রুত শেষ হয় সে জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
উপদেষ্টা বলেন, বে টার্মিনালের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে ১৩ হাজার ৫২৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক দেবে ৯ হাজার ৩৩৩ কোটি এবং সরকারি তহবিল থেকে খরচ হবে ৪ হাজার ১৯২ কোটি টাকা।
সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে একনেকে পাস হওয়া অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে রাজনৈতিকভাবে (উপকারভোগী) যুক্ত করায় প্রায় ৫০ শতাংশ প্রকৃত ভাতা পাওয়ার যোগ্য নয়। উপকারভোগী বাছাইয়ে প্রভাব বিস্তার করা হয়েছিল। এ প্রকল্পটির উন্নয়ন কাজে ৯০০ কোটি টাকা ঋণ দেবে বিশ্বব্যাংক।
এদিকে রোহিঙ্গাদের জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ আরও প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বাড়ল। তবে ভবিষ্যতে উন্নয়ন-সহযোগীদের অনুদান পাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।
বিশ্বব্যাংকের কাছে আরও দুই বছরের জন্য ওই প্রকল্পে অনুদান পাওয়া যাবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যে নীতি, তাতে জাতিসংঘের আওতায় রোহিঙ্গা-সংক্রান্ত প্রকল্পের জন্য সহায়তা কতটা মিলবে, তা নিয়ে সংশয় আছে বলে যোগ করেন, পরিকল্পনা উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, কক্সবাজারের মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ মৌলিক জীবনমান উন্নতি করতে এই প্রকল্পের মেয়াদ ও বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে গতকাল পাস হওয়া একটি প্রকল্প প্রসঙ্গে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, সরকারি ভাতা যাদের কাছে যায়, তাদের ৫০ শতাংশের ভাতা পাওয়ার কথা না। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের কারণে তারা এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন। তাদের যদি বাদ দেওয়া যেত, তা হলে প্রকৃত উপকারভোগীদের ভাতা দ্বিগুণ করা যেত।
ওই প্রকল্পে বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উন্নয়ন-সহযোগীদের কাছ থেকে বড় ঋণ পেতে ছোট ছোট ঋণে পরামর্শকের শর্ত মানতে হয়। উন্নয়নশীল দেশের সমস্যা হলো সহজশর্তের ঋণ নিতে হলে পরামর্শকের বোঝা নিতে হয়।
একনেক সভায় ১৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকার বে টার্মিনাল মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প পাস করা হয়। এই প্রকল্পে সম্পর্কে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর নয়; এটি নদীবন্দর। কর্ণফুলী নদী বেশ সরু। এই নদীর আঁকাবাঁকা পথ পাড়ি দিয়ে বন্দরে আসতে হয়। জাহাজগুলো থাকে গভীর সমুদ্রবন্দরে।
এর আগে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ১৪টি উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ২৪ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার জোগান দেবে (জিওবি) ৩ হাজার ১ কোটি টাকা। বৈদেশিক প্রকল্প ঋণ সহায়তা রয়েছে ১৬ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন রয়েছে ৪ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা।
এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
একনেকে অনুমোদিত প্রকল্পগুলো হলো- জরুরি ভিত্তিতে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় মাল্টি-সেক্টর প্রকল্প, চট্টগ্রাম মহানগরীর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা স্থাপন প্রকল্প (১ম পর্যায়) এবং চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ উন্নয়ন। এ ছাড়া গ্রিন রেলওয়ে পরিবহন প্রস্তুতিমূলক কারিগরি সহায়তা, তিতাস ও বাখরাবাদ ফিল্ডে দুটি গভীর অনুসন্ধান কূপ খনন, বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের খনন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও শক্তিশালীকরণ।
আরও আছে- বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণ যন্ত্রপাতি উন্নয়ন প্রকল্প, বাংলাদেশ টেকসই পুনরুদ্ধার, জরুরি প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া প্রকল্প (বি-স্ট্রং) (কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর-ডিএই, বিএডিসি), বাংলাদেশ টেকসই পুনরুদ্ধার, জরুরি প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া প্রকল্প (বি-স্ট্রং) (স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর-এলজিইডি) এবং বাংলাদেশ টেকসই পুনরুদ্ধার, জরুরি প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া প্রকল্প (বি-স্ট্রং) (বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড-বিডব্লিউডিবি)।
অনুমোদন পেয়েছে বাংলাদেশে কৃষি খাত রূপান্তরের টেকসই ও সহনশীল বিনিয়োগে কারিগরি সহায়তা কর্মসূচি, চট্টগ্রাম মহানগরীর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা স্থাপন প্রকল্প (১ম পর্যায়) (১ম সংশোধিত), সবার জন্য বাসযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শহর প্রকল্প (এলআইসিএ) চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ উন্নয়ন প্রকল্প, উন্নত সহনশীলতা, অন্তর্ভুক্তি ও লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা জোরদারকরণ প্রকল্প।
এ ছাড়া একনেক সভায় ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য দুটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্প দুটি হলো- নলকা-সিরাজগঞ্জ-সয়দাবাদ আঞ্চলিক মহাসড়কের সিরাজগঞ্জ শহর অংশ (শহিদ এম মনসুর আল কলেজ হতে কাটা ওয়াপদা মোড় পর্যন্ত চার লেনে উন্নীতকরণ ও অবশিষ্ট অংশ দুই লেনে উন্নীতকরণ (১ম সংশোধিত) এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের দেশব্যাপী ডিজিটাল টেরিস্ট্রিয়াল সম্প্রচার প্রবর্তন (১ম পর্যায়) (১ম সংশোধিত) প্রকল্প।