শ্রমবাজার পুনরুদ্ধারে ট্রামকার্ড হতে পারে কাতার

রনি রেজা

সম্পাদকীয়

দেশের এগিয়ে যাওয়া ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য যে সেক্টরগুলো অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করে তার মধ্যে প্রবাসী আয় অন্যতম। দেশের যেকোনো

2025-04-22T02:10:27+00:00
2025-04-22T02:12:10+00:00
 
  রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬,
৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
সম্পাদকীয়
শ্রমবাজার পুনরুদ্ধারে ট্রামকার্ড হতে পারে কাতার
রনি রেজা
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৫, ২:১০ এএম  আপডেট: ২২.০৪.২০২৫ ২:১২ এএম  (ভিজিট : ৫৪১)
রনি রেজা। ছবি: সময়ের আলো
দেশের এগিয়ে যাওয়া ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য যে সেক্টরগুলো অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করে তার মধ্যে প্রবাসী আয় অন্যতম। দেশের যেকোনো সংকটে এই প্রবাসী আয় হয়ে উঠেছে ভরসার জায়গা। যদিও এই সেক্টর নিয়েও সংকটের শেষ নেই। এর ভেতরে আরও বড় দুঃসংবাদ হচ্ছে—শ্রমবাজার কমেছে। গত এক বছরে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের জনবল রফতানির পরিমাণ প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। পাশাপাশি গত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের শ্রমবাজার ক্রমেই সংকুচিত হয়ে চলেছে। বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ১০ লাখ ১১ হাজার ৮৬৯ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে ৯৫ শতাংশ কর্মী গেছেন মাত্র পাঁচটি দেশে—সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কাতার, সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। তবে এই সংখ্যা ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম। সে বছর ১৩ লাখ ৭ হাজার ৮৯০ জন কর্মী বিদেশ পাঠানো হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে ৯৭ হাজার ৮৭৩ জন কর্মী বিদেশে যান। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে এই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ৪৪২ জনে। অর্থাৎ চলতি বছর জানুয়ারির তুলনায় কেবল ফেব্রুয়ারিতেই জনবল রফতানি কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ।

তিনটি বড় শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যাওয়া বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। এগুলো হলো—মালয়েশিয়া, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এ ছাড়া সৌদি আরব ও কাতারের মতো দেশগুলোতে নিয়োগ কমে যাওয়ায় এবং মালয়েশিয়া, ওমানের পাশাপাশি বাহরাইনের শ্রমবাজারও বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এর মাঝে অবশ্য সরকার নতুন শ্রমবাজার খোলার চেষ্টা করছে, তবে তাদের সাফল্যকে এখনও পর্যাপ্ত বলা যায় না। বিদ্যমান বাজারগুলো চালু করতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। মালয়েশিয়ায় ২০২৩ সালে কাজ নিয়ে যান সাড়ে তিন লাখের বেশি কর্মী। কিন্তু গত জুন থেকে দেশটির শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গেছে। ওমানে ২০২৩ সালে কর্মী গেছেন সোয়া লাখের বেশি। গত বছর সেখানে শ্রমবাজার বন্ধ থাকায় কর্মী গেছেন মাত্র ৩৫৮ জন। আমিরাতে ২০২৩ সালে কর্মী গেছেন প্রায় এক লাখ। গত বছর দেশটিতে কর্মী গেছেন ৪৭ হাজার।

গতকাল ‘আর্থনা সামিট-২০২৫’-এ অংশ নিতে চার দিনের সরকারি সফরে কাতারের রাজধানী দোহার উদ্দেশে রওনা দেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানির আমন্ত্রণে তিনি এ সফরে যাচ্ছেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এবং শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী হিসেবে থাকবেন বলে জানা গেছে।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এরই মধ্যে জানিয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাতার সফরে শ্রমবাজার ও ভিসা ইস্যুতে আলোচনা হবে। এখানেই আশার আলো দেখছি। আমাদের প্রবাসী আয় রক্ষার বিকল্প নেই। এ জন্য সর্ব প্রথম দরকার শ্রমবাজার পুনরুদ্ধার। আর এ জন্য অন্যতম ট্রামকার্ড হতে পারে কাতার। থাইল্যান্ড সম্ভাবনাময় একটি বাজার ছিল, সেটিও বন্ধ। এটি চালু করতে দুই দেশের আলোচনার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া সংকুচিত হয়ে যাওয়া কাতার ও সৌদির শ্রমবাজারে লোক পাঠানো আরও বাড়িয়ে শ্রমবাজার পুনরুদ্ধার সম্ভব। তারই একটি সুযোগ হাতে এসেছে বলে মনে হচ্ছে। কাতারের সঙ্গে এখন আমাদের সম্পর্ক ভালো। বিগত সরকারের শেষদিকেও কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। তখন জ্বালানি গ্যাস, সংযুক্তি, পর্যটন খাতে বিনিয়োগসহ নানা বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন কাতারের আমির।

গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এবারের প্রধান উপদেষ্টার কাতার সফরে বাংলাদেশ-কাতারের মধ্যকার সম্পর্কের ভবিষ্যৎ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা বা নতুন করে কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি; বিশেষ করে গাজায় ইসরাইলি হামলা এবং ফিলিস্তিন সংকট নিয়ে আলাপ-আলোচনা হওয়ার একটা সুযোগ তৈরি হবে। রোহিঙ্গা সংকট ও সমাধান নিয়ে আলোচনায় গুরুত্ব দেবে বাংলাদেশ। এর মধ্যে সবচেয়ে জরুরি শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনা করা। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য প্রবাসী আয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশ থেকে শ্রমিকরা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের জন্য যেতে শুরু করেন। তখন থেকে প্রবাসীরা দেশে রেমিট্যান্স পাঠানো আরম্ভ করেন। নিরাপদ আশ্রয়, উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় কিংবা কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তায় প্রভৃতি কারণে সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে মানুষ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটে বেড়াচ্ছে এ স্থানান্তরের একটি বড় কারণ হলো অর্থনীতি। বস্তুত সব উন্নয়নশীল দেশের মানুষ উন্নত দেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক অর্থ নিজ নিজ দেশে প্রেরণ করে। আর এ রেমিট্যান্স এসব দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশও এই কাতারেই রয়েছে। এই প্রবাসী আয় অর্থনীতির একটি প্রধান খাত হিসেবে জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের অবদান ৬ থেকে ৭ শতাংশ। যদিও বৈদেশিক মুদ্রার এই বিরাট উৎস তথা বাংলাদেশি প্রবাসীদের সঠিক সংখ্যা এখন পর্যন্ত জানা সম্ভব হয়নি। দেশের কাছে প্রবাসীরা রেমিডিয়ান্স যোদ্ধা, অর্থনীতির চালিকাশক্তি। কিন্তু দেশ সেই প্রবাসীদের কী সুবিধা দিয়েছে? জন্মনিবন্ধন, ভোটার আইডি কার্ড, জমি বেচাকেনা, স্কুল-কলেজে বাচ্চাদের ভর্তির ব্যাপারে প্রবাসীদের কোনো অগ্রাধিকার নেই। একজন প্রবাসী কলুর বলদের মতো খাটে। সে যদি চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে আসে, তার খবর কেউ রাখে না। প্রবাসীরা তাদের ঘাম ঝরানো রেমিট্যান্স মাস শেষ হওয়া মাত্রই দেশে প্রেরণ করে দেয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, রেমিট্যান্স আয়ের প্রায় ৬৩ শতাংশ ব্যয় হয় দৈনন্দিন খরচের খাতে। এতে ওই পরিবারগুলো দারিদ্র্য দূর করতে পারে। রেমিট্যান্স পাওয়ার পরে একটি পরিবারের আয় আগের তুলনায় ৮২ শতাংশ বাড়ে। 

রেমিট্যান্স সবচেয়ে বেশি অবদান রাখতে পারে বিনিয়োগের মাধ্যমে। প্রবাসীদের পরিবার-পরিজন অধিকাংশ গ্রামে বসবাস করেন। ফলে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয় ও সঞ্চয় বাড়ার কারণে গ্রামীণ অর্থনীতির কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা বাড়ছে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি চ্যানেলের মাধ্যমে জানা যায়, বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মরত রয়েছে বিশ্বের ১৭৪টি দেশে। যার মধ্যে গত ১০ বছরেই কর্মসংস্থান হয়েছে ৬৬ লাখ ৩৩ হাজারের মতো। অভিবাসীদের বড় অংশটি থাকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। যেসব ১০টি দেশ থেকে প্রবাসী আয় সবচেয়ে বেশি আসে, তার মধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও সিঙ্গাপুর উল্লেখযোগ্য। এই ১০টি দেশ থেকে মোট প্রবাসী আয়ের ৮৯ শতাংশ আসে।

জুলাই আন্দোলনের সময়ও প্রবাসীদের ব্যাপক ভূমিকা লক্ষ করা গেছে। মূলত প্রবাসীরা যখন রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ করার ঘোষণা দেয় তখনই বিপাকে পড়ে পতিত আওয়ামী সরকার। তখন কয়েক মন্ত্রীর মধ্যে বিচলিত ভাব প্রকাশ্যে আসে। অনেকটাই নড়বড়ে হয়ে যায় আওয়ামী লীগ সরকারের কঠোরনীতি। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালে রেকর্ড পরিমাণ প্রবাসী আয় বেড়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে যখন দেশে তীব্র ডলার সংকট দেখা দেয় তখনও অনেকটা ভরসার জায়গায় ছিল এই প্রবাসী আয়। ২০২৪ সালে প্রবাসী আয় এসেছে ২ হাজার ৬৭০ কোটি ডলার। এর আগে ২০২১ সালে সর্বোচ্চ ২ হাজার ২০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছিল। কাজেই বিদেশে শ্রমবাজার পুনরুদ্ধারের গুরুত্ব সবাই উপলব্ধি করতে পারবে বলে আশা রাখছি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে এই মুহূর্তে প্রায় চার লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছে। ২০১৭ সালের পর দেশটিতে বাংলাদেশি শ্রমিক যাওয়া অনেকটা কমে যায়। তবে সে দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কাজের যথেষ্ট সুনাম রয়েছে।

২০২২ সালে কাতারের শ্রমমন্ত্রী আলি বিন সামিখ আল মাররি তৎকালীন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মদক্ষতার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘কাতারের শ্রম আইন সংশোধন করা হয়েছে। এই আইনে দেশীয় শ্রমিকদের মতো বিদেশি শ্রমিকরা যাবতীয় সুবিধাদি পাবে।’ তখন কাতারের ক্রমবর্ধমান শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষ কর্মী প্রেরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন আলি বিন সামিখ আল মাররি। কাতারে ২০২২ বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের সময় স্টেডিয়ামসহ অবকাঠামো নির্মাণে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক অবদান রেখেছিল। এসব বিষয় সামনে এনে কাতারের সঙ্গে শ্রমবাজার নিয়ে একটি ফলপ্রসূ আলোচনা হতেই পারে। এতে বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের গতি যেমন বৃদ্ধি পাবে একইভাবে কাতারও পাবে পরিশ্রমী ও দক্ষ কর্মী।

 লেখক: প্রাবন্ধিক


Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: