জুলাই গণআন্দোলনে গত বছরের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। বর্তমানে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অতিবাহিত হয়েছে ৮ মাস। আর এই ৮ মাসেই নতুন ২৬টি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ হয়েছে। এসব দলের উদ্দেশ্য কী?
নিউক্লিয়াস পার্টি, জনপ্রিয় পার্টি, জাগ্রত পার্টি, আমজনতার দল, আ-আম জনতা পার্টি… এমন অন্তত ২৬টি নাম যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর থেকে এসব রাজনৈতিক দল বা প্ল্যাটফর্ম আত্মপ্রকাশ করেছে।
অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছাড়াও গত ৮ মাসে গণমাধ্যমে আসা রাজনৈতিক দল ও প্ল্যাটফর্মের সংখ্যা দুই ডজনেরও বেশি।
এরইমধ্যে নতুন দল আনার ঘোষণা দিয়েছেন চিত্রনায়ক ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে নিয়ে কাজ করা ইলিয়াস কাঞ্চন।
আজ শুক্রবার (২৫ এপ্রিল) ‘জনতার পার্টি বাংলাদেশ’ নামের দলটি ঘোষণা করার কথা রয়েছে।
তবে এত কম সময়ে এতগুলো দলের আত্মপ্রকাশ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে।
এ ব্যাপারে বিশ্লেষকরা বলছেন, দল গঠনের এই প্রবণতা নতুন কিছু নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে এমন নতুন নতুন দল গঠন করতে দেখা গেছে।
আর নির্বাচনকেই এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন তারা। বলছেন, নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসে ‘‘ব্যাঙের ছাতার মতো এমন অনেক দল গজিয়ে ওঠে’’।
তবে নতুন নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশকে আপাতদৃষ্টিতে গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে যুক্ত করা হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেকক্ষেত্রেই তা স্বার্থ ও ক্ষমতাচর্চার একটি রূপ বলেই মত বিশ্লেষকদের।
একইসঙ্গে ভোটের সময় জোট রাজনীতিও এই প্রবণতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রভাব রাখে বলেও মনে করেন অনেকে।
‘ওনারা রাজনৈতিক লেবেল থাকলে ছেড়ে দেবে’
গত ১৭ এপ্রিল আত্মপ্রকাশ করেছে ‘বাংলাদেশ আ-আম জনতা পার্টি’, যার প্রধান ডেসটিনির মোহাম্মদ রফিকুল আমীন। অর্থ পাচার ও ডেসটিনি ট্রি প্লান্টেশনের মামলায় ১২ বছর কারাভোগের পর গত ১৫ জানুয়ারি জেল থেকে বের হওয়ার তিন মাসের মাথায় নতুন এই দল নিয়ে হাজির হন তিনি।
কিন্তু ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত রফিকুল আমীনের হঠাৎ রাজনীতিতে নাম লেখানোর কারণ কী?
প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, রাজনৈতিক পরিচয় না থাকার কারণে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর অন্য অনেকে জেল থেকে ছাড়া পেলেও তিনি তা পাননি।
তিনি আরও বলেন, ‘যেদিন হাসিনা পালিয়ে গেল, ৫ তারিখ, ৬ তারিখ, ৭ তারিখ, ৮ তারিখ, ৯ তারিখ – এই কয়দিনে ঢাকা জেল খালি হয়ে গেছে। মানুষকে দিনরাত ছেড়ে দিছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এত লোকের জামিন কীভাবে হলো? বলে, না জামিন হয়নিতো। এদের রাজনৈতিক বিবেচনায় ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে’’।
‘‘আমি তখন সুপার সাহেবের (জেল সুপার) কাছে দৌড়ায় গেলাম। আমিতো এত বছর আটকে আছি, আমাকে ছাড়েন। বললো, আপনিতো কোনো রাজনৈতিক দল করেন না। আপনি যদি অন্তত হরাকাতুল জিহাদও করতেন বা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমও করতেন তাও আপনাকে আমি ছেড়ে দিতাম। মানে ওনারা রাজনৈতিক লেবেল থাকলে ছেড়ে দেবে’’ বলেন তিনি।
রফিকুল আমীন জানান, এই রাজনৈতিক মঞ্চকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে তিনি তার ‘‘জুলুমের কথা তখন যে প্রশাসক থাকবে, যে রাষ্ট্রশাসন করবে তার কাছে’’ পৌঁছাবেন।
মাসে গড়ে ৩টি করে রাজনৈতিক দল ও সংগঠন
শেখ হাসিনার শাসনের পতনের পর অর্থাৎ ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫'র ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত গত আটমাসে অন্তত ২২টি রাজনৈতিক দল ও ও চারটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম আত্মপ্রকাশের খবর এসেছে গণমাধ্যমে।
যার মধ্যে গত বছর ১১টি আর চলতি বছরের প্রথম চার মাসে আরও ১১টি দল গঠিত হয়েছে। সেই হিসেবে প্রতি মাসে গড়ে তিনটি করে রাজনৈতিক দল ও সংগঠন হয়েছে।
আত্মপ্রকাশ করা দলগুলোর মধ্যে আছে- নিউক্লিয়াস পার্টি অব বাংলাদেশ (এনপিবি), জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক পার্টি, ওয়ার্ল্ড মুসলিম কমিউনিটি, সমতা পার্টি, বাংলাদেশ জনপ্রিয় পার্টি (বিপিপি), সার্বভৌমত্ব আন্দোলন, বাংলাদেশ সংস্কারবাদী পার্টি (বিআরপি), বাংলাদেশ মুক্তির ডাক ৭১, বাংলাদেশ জাগ্রত পার্টি, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টি (বিজিপি), জাতীয় বিপ্লবী পরিষদ, দেশ জনতা পার্টি, আমজনতার দল, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক শক্তি, বাংলাদেশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (বিএসডিপি), বাংলাদেশ জন-অধিকার পার্টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি, জনতার বাংলাদেশ পার্টি, জনতার দল, গণতান্ত্রিক নাগরিক শক্তি, ভাসানী জনশক্তি পার্টি ও আ-আম জনতা পার্টি (বিএজেপি)।
রাজনীতিতে আসা নতুন দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব নিয়ে আলোচনায় রয়েছে এনসিপি। দলটি এখনও নিবন্ধন পায়নি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি নামক যে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে দলটি তৈরি হয়েছে, সেগুলোও বর্তমানে সচল আছে।
রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে নতুন ছাত্র সংগঠন ‘বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ’ তৈরি হয়েছে। এছাড়াও এনসিপির গঠন থেকে বেরিয়ে আসা শিবিরের সাবেক নেতাদের নতুন সংগঠন ‘ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশ’ এরও এই মাসের মধ্যেই আত্মপ্রকাশের কথা রয়েছে।
নতুন দল নিয়ে সাধারণ মানুষের ভাবনা
প্রায় নিয়মিতই নতুন নতুন এসব দল আর প্ল্যাটফর্ম গঠনের খবর শোনা গেলেও, এগুলো সম্পর্কে সাধারণ মানুষ কতটা জানে?
এ নিয়ে ঢাকার রাস্তায় কথা হয় ভ্যানচালক মো. হারুনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে মনে করেন ১০ জনেও দল করন যায়। যার যার মতো খালি দল বানাইতাছে আর করতাছে। এগিলির কোনো ইস্টিমেট আছে? এগিলা দল আমরা ভ্যান গাড়িয়ালারাও বানাইতে পারি’।
‘স্টুডেন্টদের সংগঠন বাদে ওইভাবে কোনো কিছু দেখা হয়নি’, বলেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী আসমা উল হুসনা সুপ্তি।
নতুন দলগুলোর নাম শোনা হয়েছে কিনা প্রশ্নের জবাবে চাকুরীজীবী সালমা আক্তার বলেন, আমি আমজনতা বলে বাংলাদেশের সবাইকেই বুঝি। কিন্তু এটা আবার দল? জানি না’।
চা বিক্রেতা জোছনা জানান, প্রায়ই সেখানে মিছিল দেখলেও কারা তা করছে সে বিষয়ে তার কিছু জানা নেই।
বাংলাদেশে বর্তমানে ৫০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল থাকলেও এগুলোর বেশিরভাগের নামই কেউ জানে না। তার ওপর অভ্যুত্থানের পর হিড়িক লেগেছে নতুন দল গঠনের।
মূলত ভোটের সময় জোট রাজনীতির সঙ্গে এই প্রবণতার সংযোগ রয়েছে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে নির্বাচন এগিয়ে এলে এই ধরনের দল গঠনের তোড়জোড় দেখা যায়।
নতুন রাজনৈতিক দল
এ নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এর আগেও আমরা দেখেছি যখন নির্বাচনের গন্ধ এসে নাকে লাগে, তখন হঠাৎ করেই এমন অনেক দল গজিয়ে ওঠে ব্যাঙের ছাতার মতো’।
তিনি বলেন, এ ধরনের দল তৈরির প্রবণতা দেখা গিয়েছিল এরশাদের আমলেও।
‘এরশাদের আমলে বড় দলগুলো এরশাদের সঙ্গে নির্বাচনে সহযোগিতা করেনি বা করতে চায়নি, তখন এরশাদ দেখাতে চেয়েছিল যে দেশে প্রচুর রাজনৈতিক দল আছে। সুতরাং তারা নির্বাচনে এলেতো প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে’।
সে সময় ১২০টার বেশি দল গঠন হয়েছিল বলে জানান মহিউদ্দিন আহমদ। পরবর্তী সময়ে ৯০টা দল নিয়ে জোট করার নজির আছে উল্লেখ করে ‘এরা জাস্ট সংখ্যা’ বলে মন্তব্য করেন এই বিশ্লেষক।
একইসঙ্গে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যেও এসব দল তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এ নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘এখন একটা বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গেছে সবার মধ্যে যে রাজনীতি করলে খুব দ্রুত লাভবান হওয়া যায়। রাজনীতি করলে খুব দ্রুত টাকা-পয়সা কামানো যায়, আর ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানো যায়- এটা ভেতরের উদ্দেশ্য আর কি’।
এর বাইরে এসব দলের রাজনীতিতে কতটুকু আদর্শ থাকে, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে বলেও মনে করেন তিনি। বলেন, ‘মূল যেটা সেটা হচ্ছে এটার পেছনে একটা রাজনৈতিক অর্থনীতির বিষয় জড়িত আছে’।
তবে বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস বলছে, অনেক দল এলেও তাদের মধ্যে খুব কম সংখ্যকই দিন শেষে রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এসটিও