দেশের ৩০ লাখ মানুষ দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে কেন

এসএম আলমগীর

জাতীয়

বিশ্বব্যাংক গত বুধবার বাংলাদেশের অর্থনীতির হালনাগাদ পরিস্থিতি নিয়ে ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক শঙ্কা প্রকাশ করে

2025-04-26T05:41:51+00:00
2025-04-26T05:41:51+00:00
 
  বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬,
৩ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬
জাতীয়
দেশের ৩০ লাখ মানুষ দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে কেন
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: শনিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৫, ৫:৪১ এএম   (ভিজিট : ৪৭০)
প্রতীকী ছবি
বিশ্বব্যাংক গত বুধবার বাংলাদেশের অর্থনীতির হালনাগাদ পরিস্থিতি নিয়ে ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক শঙ্কা প্রকাশ করে জানায়, বাংলাদেশে এ বছর আরও ৩০ লাখ মানুষ ‘অতিদরিদ্র’ হবে। অতিদারিদ্র্যের হার বেড়ে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ হবে। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের এই প্রতিবেদনের পর আলোচনা হচ্ছে-ঠিক কী কারণে বাংলাদেশে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়বে এবং দারিদ্র্যের হার যাতে না বাড়ে তার জন্য সরকারের তরফ থেকেই বা কী করার আছে।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে যে শঙ্কার কথা বলা হয়েছে সেটি অবশ্যই চিন্তার বিষয় এবং অতিদারিদ্র্যের হার বৃদ্ধির পাওয়ার যে তথ্য দেওয়া হয়েছে সেটিরও ভিত্তি আছে। এই অবস্থায় বিশ্বব্যাংকের ওই শঙ্কা যাতে সত্য না হয় বা দারিদ্র্যের হার যাতে না বাড়ে তার জন্য সরকারকে কিছু দরিদ্রবান্ধব পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে সারা দেশে দরিদ্রবান্ধব যেসব সামাজিক কর্মসূচি রয়েছে সেগুলোর আওতা বাড়াতে হবে এবং মানুষের আয় যাতে বাড়ে তার জন্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে।

এসব মন্তব্য করে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ-উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, ‘বিগত কয়েক মাসে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই বিশ্বব্যাংক তাদের মূল্যায়ন তুলে ধরেছে প্রতিবেদনে। আমি মনে করি, সংস্থাটি ঠিকই বলেছে-দেশে দারিদ্র্যের হার বাড়বে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের আয় কমেছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে। এ কারণে নতুন কর্মসংস্থানেও বেশ ভাটা চলছে। বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে না। আর কর্মসংস্থান না বাড়লে মানুষের আয় বাড়বে না। যদি আয় না বাড়ে তা হলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়বেই। তাই বিশ্বব্যাংক যে শঙ্কার কথা বলেছে, সেটি যাতে না হয়, বা এর প্রভাব যাতে কমানো যায়, তার জন্য সরকারকে বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে বেশি জোর দিতে হবে। মানুষের আয় কীভাবে বাড়ে সে ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে।’

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে মূলত তিন কারণে আরও ৩০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-ক্রমাগত প্রকৃত আয় কমে যাওয়া, দুর্বল শ্রমবাজার এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মন্থরগতি। বিশ্বব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরে শ্রমবাজারের দুর্বল অবস্থা অব্যাহত থাকতে পারে। 

এ ছাড়া সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের প্রকৃত আয় কমতে পারে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের শ্লথগতির কারণে ঝুঁকিতে থাকা দরিদ্র মানুষের ওপর বেশি প্রভাব ফেলছে। এতে বৈষম্য আরও বাড়তে পারে বলে বিশ্বব্যাংক মনে করে।

শুধু অতিদারিদ্র্যের হার নয়, জাতীয় দারিদ্র্যের হারও বাড়তে পারে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, জাতীয় দারিদ্র্যের হার গত বছরে ছিল সাড়ে ২০ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হতে পারে ২২ দশমিক ৯ শতাংশ।

অবশ্য বিশ্বব্যাংক বলেছে, আগামী দুই বছরে চরম দারিদ্র্য পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। ২০২৬ সালে চরম দারিদ্র্যের হার ৭ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে। 

অতিদরিদ্র  কারা আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যরেখা দিয়ে দরিদ্র মানুষ চিহ্নিত করা হয়। 

ক্রয়ক্ষমতা সমতা (পিপিপি) অনুসারে, দিনে ২ দশমিক ১৫ ডলার আয় করে প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা কেনার সামর্থ্য না থাকলে অতিদরিদ্র হিসেবে ধরা হয়। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। তবে প্রতিটি দেশের জন্য নিজস্ব একটি দারিদ্র্যরেখা ঠিক করা হয়। বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্যসীমার মানদণ্ড হলো খাদ্য ও খাদ্যবহিভর্‚ত পণ্য ও সেবা কেনার জন্য একজন মানুষের প্রতি মাসে গড়ে ৩ হাজার ৮২২ টাকা খরচ করার সামর্থ্য যদি না থাকে, তা হলে তিনি দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবেন বা দরিদ্র হয়ে যাবেন। এর পাশাপাশি দারিদ্র্য পরিমাপে ১১৯ ধরনের বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় রাখে বিবিএস। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুসারে, দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সাল শেষে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা হতে পারে ১ কোটি ৫৮ লাখের মতো। আর দরিদ্র মানুষের সংখ্যা হতে পারে ৩ কোটি ৯০ লাখের মতো।

অতিদরিদ্রের হার কেন বাড়বে?

আসলে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মজুরি বাড়ছে না। এতে প্রকৃত আয় কমেছে সাধারণ মানুষের। ৩ বছর ৩ মাস বা ৩৯ মাস ধরে বাংলাদেশে মজুরির হার বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরির হার বৃদ্ধি বেশি ছিল। 
এরপর ৩৯ মাস ধরে মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম। তিন বছরের বেশি সময় ধরে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। আর গত মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধি বা আয় বৃদ্ধি কম হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ে। প্রকৃত আয় কমে যায়। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা বিশাল জনগোষ্ঠী।

গবেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগ কম, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং রাজস্ব ঘাটতিও এই সংকটকে আরও বাড়াচ্ছে। সমাধানে তারা বলছেন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে এবং আরও মানুষকে এই কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে। একইসঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে ওপরে উঠতে পারবে।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. মো. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, ‘বিগত কয়েক মাস ধরে দেশের অর্থনীতিতে স্লথগতি রয়েছে। বিনিয়োগ কমে গেছে। এর প্রভাব মানুষের জীবনে পড়ছে। আর সরকার অতি দরিদ্র মানুষের জন্য দুস্থ ভাতা, বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতাসহ এ রকম যত ভাতা কর্মসূচি রয়েছে সেগুলোও এখন ঠিকমতো চালানো হচ্ছে না। আমাদের কাছে তথ্য আছে, এসব সামাজিক কর্মসূচির অনেকগুলো বিগত কয়েক মাস ধরেই বন্ধ রয়েছে। এ কারণে ওইসব ভাতাভোগী পরিবারগুলোর সংকট বেড়েছে। অতিদরিদ্রের হার বৃদ্ধির জন্য এটিও একটি কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাই আমি বলব, এসব দরিদ্রবান্ধব সামাজিক কর্মসূচির সবগুলোই পুনরায় চালু করা এবং দরকার হলে এর আওতা বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষের আয় বাড়াতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোরও বিকল্প নেই। সবশেষে বলব, অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করা খুবই জরুরি।’



Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: