বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতসহ একগুচ্ছ সুপারিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

দেশের স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা নিরসনে এবং জনগণের দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ৩২টি সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে স্বাস্থ্য

2025-05-05T16:54:24+00:00
2025-05-05T16:54:24+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬,
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতসহ একগুচ্ছ সুপারিশ
স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশন, বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, সুপারিশ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ৫ মে, ২০২৫, ৪:৫৪ পিএম 
ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে স্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সংবাদ সম্মেলন। ছবি: সময়ের আলো
দেশের স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা নিরসনে এবং জনগণের দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ৩২টি সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে স্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্কার কমিশন। 

সোমবার (৫ মে) সকালে জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খানের নেতৃত্বে কমিশনের সদস্যরা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন। পরে বাংলাদেশ ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলন করে তারা প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন।

প্রতিবেদনে সংবিধান সংশোধন করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে একটি ‘মৌলিক অধিকার’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে দরিদ্রদের জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এছাড়াও প্রতিবেদনে দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে আগত মোট রোগীর মধ্যে অতি দরিদ্র ২০ শতাংশ রোগীকে বিনামূল্যে সম্পূর্ণ চিকিৎসাসেবা, স্বতন্ত্র হেলথ ক্যাডার সার্ভিসের গঠন, সরকারি হাসপাতালে জনবল নিয়োগ, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বৃদ্ধি, রোগীদের বিদেশমুখিতা কমাতে নতুন হাসপাতাল নির্মাণ, মেডিকেল পুলিশ গঠন, জাতীয় বাজেটের ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের মত একগুচ্ছ সুপারিশ রয়েছে এ কমিশনের প্রতিবেদনে।


বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সার্ভিস’ নামে একটি স্বতন্ত্র কাঠামো গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে। সেজন্য আলাদা পাবলিক সার্ভিস কমিশন (স্বাস্থ্য) গঠন এবং জনবল কাঠামো পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে কমিশন।

কমিশনের প্রতিবেদনে অতি দরিদ্র ২০ শতাংশের মধ্যে ১০ শতাংশ সরকারিতে আর বাকি ১০ শতাংশ রোগীকে বেসরকারি হাসপাতালে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। অত্যাবশ্যকীয় ঔষধ প্রাথমিক পর্যায়ে বিনামূল্যে ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ভর্তুকিমূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং ওষুধের তালিকা প্রতি দুই বছর পর হালনাগাদ করতে হবে। ক্যান্সার, ডায়বেটিসের ওষুধের ভ্যাট ট্যাক্স মওকুফ করার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। জরুরি ওষুধের সংখ্যা বাড়ানো ও দুই বছর পর পর সেই তালিকা হালনাগাদ করার সুপারিশ করেছে কমিশন।

সরকারি হাসপাতাল ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ বলেন, প্রতি ৩ জনের মধ্যে ২ জন রোগী সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তবে ৩ জনের মধ্যে ১ জন রোগী প্রয়োজনীয় সেবা না পেয়ে ফিরে যান বা উপেক্ষিত হন।

চূড়ান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান। তিনি জানান, স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন দেশের স্বাস্থ্যসেবায় মৌলিক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে নিরাপদ ও মানবিক হাসপাতাল গড়ার সুপারিশ করা হয়েছে। 


তিনি আরও বলেন, কমিশনের প্রস্তাবিত রূপান্তর প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আনুমানিক দুই বছর সময় লাগবে। এই প্রকল্প কার্যকর করতে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির মাধ্যমে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ে সরকারের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করছে কমিশন।

কমিশনের পক্ষ থেকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে রাষ্ট্রের আইনগত স্বীকৃতি দেওয়ার জোর সুপারিশ করা হয়েছে উল্লেখ করে ডা. আজাদ বলেন, এটি খুব সহজ কাজ—সরকার চাইলে সঙ্গে সঙ্গেই করতে পারে। তবে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের মানসিকতা ও আচরণগত পরিবর্তন। এটা সবচেয়ে কঠিন কাজ। সময় লাগবে, কিন্তু এটা না হলে টেকসই পরিবর্তন আসবে না।

কমিশনের সদস্য ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন বলেন, ওষুধের নমুনা বা উপহার দিয়ে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।

প্রতিবেদনে উল্লেখযোগ্য সুপারিশের মধ্যে রয়েছে-

সাংবিধানিক অধিকার ও নতুন আইন: প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা।এই অধিকার বাস্তবায়নের জন্য ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আইন’ প্রণয়নের প্রস্তাব, যা নাগরিকদের বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব নির্ধারণ করবে। স্বাস্থ্য খাতে ন্যায্যতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ‘বাংলাদেশ স্বাস্থ্য কমিশন আইন’, ‘বাংলাদেশ হেলথ সার্ভিস আইন’, ‘জনস্বাস্থ্য ও অবকাঠামো আইন’, ‘বাংলাদেশ সেফ ফুড, ড্রাগ, আইভিডি ও মেডিকেল ডিভাইস আইন’, ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ ও প্রাপ্তি আইন’, ‘স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ও রোগী নিরাপত্তা আইন’ সহ মোট ১৫টি নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তাব। বিদ্যমান আইন, যেমন ‘বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন’, ‘নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল আইন’ ইত্যাদি সংশোধনের সুপারিশ।


স্বাস্থ্য কমিশন ও হেলথ সার্ভিস: স্বাস্থ্য বিষয়ক নীতি প্রণয়নে সংসদ ও সরকারকে পরামর্শ দিতে একটি স্বাধীন ও স্থায়ী ‘বাংলাদেশ স্বাস্থ্য কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব। পেশাদার, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক সেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ হেলথ সার্ভিস (বিএইচএস) নামে একটি নতুন সিভিল সার্ভিস গঠনের সুপারিশ। স্বাস্থ্য খাতের নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে স্বতন্ত্র ‘পাবলিক সার্ভিস কমিশন (স্বাস্থ্য) ’ গঠনের প্রস্তাব।

সেবার মান ও প্রাপ্যতা: প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে (ক্ষেত্রবিশেষে ভর্তুকি মূল্যে) প্রদানের সুপারিশ। উপজেলা পর্যায়ে সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা জোরদার এবং জেলা হাসপাতালগুলোতে বিশেষায়িত (টারশিয়ারি স্তরের) চিকিৎসা চালুর প্রস্তাব। প্রতিটি বিভাগীয় সদরে বিশ্বমানের টারশিয়ারি সেবা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সুপারিশ। প্রতি রোগীর জন্য গড়ে ১০ মিনিটের পরামর্শ সময় নিশ্চিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগগুলো পর্যায়ক্রমে বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্বে পরিচালনার প্রস্তাব। হাসপাতালে মানোন্নয়নের জন্য কার্যকরী মান উন্নয়ন পর্ষদ ও কন্টিনিউড এডুকেশন পদ্ধতির ব্যবস্থা করার সুপারিশ।

ওষুধ ও জরুরি সেবা: অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সর্বজনীন প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে সরকারি ওষুধ উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিকায়ন ও বেসরকারি খাত থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ সংগ্রহের প্রস্তাব। অ্যান্টি-ক্যানসার, অ্যান্টি-ডায়াবেটিক, অ্যান্টি-হাইপারটেনসিভ ও অত্যাবশ্যকীয় অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর ভ্যাট এবং অন্যান্য শুল্ক ও কর শূন্য করার সুপারিশ। ভিটামিন, মিনারেলস, ব্রেস্ট মিল্ক সাবস্টিটিউট ও প্রোবায়োটিকের ওপর ভ্যাট ও শুল্ক বৃদ্ধির প্রস্তাব। জরুরি চিকিৎসাকে বিশেষায়িত ও অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্যসেবা হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ।

নেটওয়ার্ক ও অভিযোগ নিষ্পত্তি: জাতীয় ফার্মেসি নেটওয়ার্ক, জাতীয় ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্ক, জাতীয় রক্ত সঞ্চালন নেটওয়ার্ক এবং জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক গঠনের প্রস্তাব। সেবাগ্রহীতার অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য ডিজিটাল অভিযোগ নিষ্পত্তি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার সুপারিশ। এ ছাড়া অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি সরকারি হাসপাতাল ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ফার্মেসি ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এই ফার্মেসিগুলো জাতীয় ফার্মেসি নেটওয়ার্কের আওতায় পরিচালিত হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সংস্কার কমিশনের সদস্যরা এ পর্যন্ত ৫১টি বৈঠক করেছেন। কমিশন চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, খুলনা, সিলেট, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল এবং ঢাকায় ৩২টি পরামর্শ সভা করেছে। এছাড়া বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বিভাগের মাধ্যমে ৮২৫৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের মতামত নেওয়া হয়েছে।

এসটিও


  বিষয়:   স্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্কার কমিশন 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: