দরিদ্রদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবার প্রস্তাব

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

দেশের স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা নিরসনে এবং জনগণের দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সংবিধান সংশোধন করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে একটি ‘মৌলিক

2025-05-06T00:45:15+00:00
2025-05-06T00:45:15+00:00
 
  শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬,
২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
জাতীয়
স্বাধীন ও স্থায়ী স্বাস্থ্য কমিশন গঠন ও চিকিৎসকদের উপহার বন্ধের প্রস্তাব
দরিদ্রদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবার প্রস্তাব
সংবিধান সংশোধনসহ স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের একগুচ্ছ সুপারিশ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৬ মে, ২০২৫, ১২:৪৫ এএম   (ভিজিট : ২৫৬)
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে সোমবার ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন হস্তান্তর। ছবি: পিআইডি
দেশের স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা নিরসনে এবং জনগণের দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সংবিধান সংশোধন করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে একটি ‘মৌলিক অধিকার’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে দরিদ্রদের জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়াসহ প্রস্তাব করেছে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন। এ ছাড়া বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সার্ভিস চালু, স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন, চিকিৎসকদের জন্য ওষুধ কোম্পানির উপহারে নিষেধাজ্ঞা, সরকারি হাসপাতালে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত সেবা দেওয়া, মেডিকেল পুলিশ গঠন, জাতীয় বাজেটের ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের মতো একগুচ্ছ সুপারিশ রয়েছে এ কমিশনের প্রতিবেদনে।

সোমবার বেলা ১১টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় কমিশনের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে ৩২টি সুপারিশ সংবলিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্কার কমিশন। জাতীয় অধ্যাপক ডা. একে আজাদ খানের নেতৃত্বে কমিশনের সদস্যরা এই প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন। পরে বাংলাদেশ ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলন করে তারা প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন।

স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের সুপারিশগুলোকে সাতটি স্তম্ভে ভাগ করে উপস্থাপন করেছে ‘স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন’। স্তম্ভগুলো হলো- স্বাস্থ্য সেবাদান ও ভৌত অবকাঠামো, নেতৃত্ব, সুশাসন ও কর্মসংস্কৃতি, স্বাস্থ্য জনবল ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য জনবলের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধপত্র, চিকিৎসা প্রযুক্তি ও সরঞ্জামাদি সরবরাহ, স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন ও স্বাস্থ্য তথ্যব্যবস্থা। প্রতিবেদনের মূল লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন আনা এবং প্রতিটি নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।

প্রতিবেদনের শুরুতেই সংস্কার কমিশন উল্লেখ করেন যে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এ শহিদ বীরদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত এ সংস্কার প্রতিবেদন। একটি বৈষম্যহীন ন্যায্য সমাজ প্রতিষ্ঠায় তাদের স্বপ্নের সহায়ক হোক এই স্বাস্থ্য খাত সংস্কার প্রস্তাবনা।

স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন দেশের স্বাস্থ্যসেবায় মৌলিক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে নিরাপদ ও মানবিক হাসপাতাল গড়ার সুপারিশ করেছে জানিয়ে জাতীয় অধ্যাপক ডা. একে আজাদ বলেন, কমিশনের প্রস্তাবিত রূপান্তর প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আনুমানিক দুই বছর সময় লাগবে। এই প্রকল্প কার্যকর করতে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির মাধ্যমে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ে সরকারের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করছে কমিশন।

কমিশনের পক্ষ থেকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে রাষ্ট্রের আইনগত স্বীকৃতি দেওয়ার জোর সুপারিশ করা হয়েছে উল্লেখ করে ডা. আজাদ বলেন, এটি খুব সহজ কাজ- সরকার চাইলে সঙ্গে সঙ্গেই করতে পারে। তবে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের মানসিকতা ও আচরণগত পরিবর্তন। এটি সবচেয়ে কঠিন কাজ। সময় লাগবে, কিন্তু এটি না হলে টেকসই পরিবর্তন আসবে না।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সংস্কার কমিশনের সদস্যরা এ পর্যন্ত ৫১টি বৈঠক করেছেন। কমিশন চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, খুলনা, সিলেট, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল এবং ঢাকায় ৩২টি পরামর্শ সভা করেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বিভাগের মাধ্যমে ৮ হাজার ২৫৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের মতামত নেওয়া হয়েছে।

কমিশনের সদস্য ডা. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন কমিশনের প্রতিবেদন উপস্থাপন করে বলেন, দেশের স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার আনার জন্য তারা যেসব সুপারিশ করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো- সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং জনগণকে বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান।

কমিশনের মুখ্য সুপারিশে সংবিধান সংশোধন করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এই সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য একটি পৃথক ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আইন’ প্রণয়ন করতে হবে, যা বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ব্যাপারে নাগরিকদের অধিকার ও রাষ্ট্রের কর্তব্য নির্ধারণ করবে। স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘ মেয়াদে ন্যায্যতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘দেশব্যাপী একটি জরুরি চিকিৎসা পরিকাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং সব স্তরের মানুষের যত্নের জন্য জরুরি পরিসেবার অবকাঠামো উন্নত করতে হবে। যেখানে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, জরুরি রোগ নির্ণয়ের সুবিধা, জীবন রক্ষাকারী ওষুধের পর্যাপ্ত মজুদ এবং রোগীদের পর্যবেক্ষণে রাখার জন্য পর্যাপ্ত এবং উপযুক্ত ভৌত কাঠামো থাকবে। এতে আরও সুপারিশ করা হয়, জরুরি/ক্রিটিক্যাল কেয়ার সেবা পৃথক বিভাগ হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত জনসম্পদ ও সরঞ্জাম দিয়ে কার্যকরী করতে হবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মহাসড়কের কাছাকাছি অবস্থিত সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উপযুক্ত জরুরি বিভাগ/কার্যকরী ট্রমা সেন্টার এবং প্রতিটি ট্রমা সেন্টারে রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা এবং অ্যাম্বুলেন্স থাকতে হবে। এ ছাড়াও প্রতিটি হাসপাতালে নারীর প্রতি সহিংসতাজনিত সেবার জন্য সব উপকরণসহ ৫ শয্যাবিশিষ্ট একটি করে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার শিকার মানুষের প্রাথমিক সেবা দেওয়ার জন্য প্রতিটি থানার পুলিশ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং এ জন্য থানায় প্রয়োজনীয় উপকরণাদীর সার্বক্ষণিক ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে।

কমিশন বেশ কিছু আইন সংস্কার ও নতুন আইন প্রণয়নের সুপারিশ করেছে। বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সার্ভিস’ নামে একটি স্বতন্ত্র কাঠামো গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে। সে জন্য আলাদা পাবলিক সার্ভিস কমিশন (স্বাস্থ্য) গঠন এবং জনবল কাঠামো পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে কমিশন।

বাংলাদেশ স্বাস্থ্য কমিশন গঠনের সুপারিশে বলা হয়েছে, একটি স্বাধীন ও স্থায়ী ‘বাংলাদেশ স্বাস্থ্য কমিশন’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই কমিশন স্বাস্থ্যবিষয়ক নীতি প্রণয়নে সংসদ ও সরকারকে কৌশলগত পরামর্শ দেবে। পাশাপাশি এটি জাতীয় কৌশল, সেবা ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মানদণ্ড এবং ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন প্রণয়ন করবে। কমিশন নিয়মিতভাবে স্বাস্থ্যব্যবস্থার কার্যকারিতা, সেবার গুণগত মান ও সার্বিক ব্যয় সাশ্রয় পর্যালোচনা করবে। এর ভিত্তিতে কমিশন বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও সরকারকে উন্নয়নের জন্য গঠনমূলক মতামত ও দিকনির্দেশনা প্রদান করবে। এই কমিশন সরাসরি সরকারপ্রধানের কাছে জবাবদিহি করবে। প্রতি বছর একটি বার্ষিক প্রতিবেদন সংসদে পাঠাবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রেখে নির্বাচনি প্রক্রিয়া ও নিয়োগের সুপারিশ করার জন্য উচ্চ পর্যায়ের সার্চ কমিটি গঠন করতে হবে। বাংলাদেশ হেলথ সার্ভিস প্রধান ও উপ-প্রধান, মহাপরিচালক, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও প্রো-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ, বিএমডিসি ও বিএমআরসি চেয়ারম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগ্যতা সম্পর্কে জাতীয় সংসদকে অবহিত করতে হবে।

সুপারিশে বলা হয়, সব সংশ্লিষ্ট পুরোনো আইন পর্যালোচনা করে যুগোপযোগী করতে হবে। এ ছাড়া রোগী সুরক্ষা, আর্থিক বরাদ্দ, জবাবদিহি ও জরুরি অবস্থায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে কিছু নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে।

কমিশন প্রস্তাবিত নতুন আইনগুলো হলো- বাংলাদেশ স্বাস্থ্য কমিশন আইন, বাংলাদেশ হেলথ সার্ভিস আইন; জনস্বাস্থ্য ও অবকাঠামো আইন; বাংলাদেশ সেইফ ফুড, ড্রাগ, আইভিডি ও মেডিকেল ডিভাইস আইন; ওষুধের মূল্য নির্ধারণ ও প্রাপ্তি আইন; স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ও রোগী নিরাপত্তা আইন; অ্যালায়েড হেলথ প্রফেশনাল কাউন্সিল আইন; হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাক্রেডিটেশন আইন; স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন; নারী স্বাস্থ্য আইন; ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ আইন; শিশু বিকাশ কেন্দ্র আইন; বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল আইন; স্বাস্থ্য তথ্য সুরক্ষা আইন ও স্বাস্থ্য খাতে টেকসই অর্থায়ন আইন। এ ছাড়া নিম্নলিখিত আইনগুলোর সংশোধন প্রয়োজন : বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন; মেডিকেল শিক্ষা অ্যাক্রেডিটেশন আইন; নার্সিং ও মিডওয়াইফারি কাউন্সিল আইন; বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল আইন; তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন; পৌর ও সিটি করপোরেশন আইন ইত্যাদি।

প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সর্বজনীন প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে সরকারকে এই সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (ক্ষেত্রবিশেষ ভর্তুকি মূল্যে) দিতে হবে। যাতে কোনো নাগরিক আর্থিক প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত না হন।

প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, উপজেলা পর্যায়ে সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করে জনগণের জন্য স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য করতে হবে। জেলা হাসপাতালগুলোয় বিশেষায়িত (টারশিয়ারি স্তরের) চিকিৎসাসেবা চালু করতে হবে, যাতে সেবার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত হয়, মেডিকেল কলেজ ও জাতীয় ইনস্টিটিউটগুলোর ওপর রোগীর চাপ কমানো যায়, ভৌগোলিক কারণে কেউ বিশেষায়িত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন। প্রতিটি বিভাগীয় সদরে অন্তত একটি পূর্ণাঙ্গ, সর্বাধুনিক সুবিধাসম্পন্ন ও বিশ্বমানের টারশিয়ারি সেবা হাসপাতালের প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করতে হবে, যা জটিল ও বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য একটি আঞ্চলিক রেফারেল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। এই হাসপাতালগুলো নতুনভাবে গড়ে তোলা যেতে পারে অথবা বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধাপে ধাপে উন্নীত করে করা যেতে পারে। প্রতি রোগীর জন্য গড়ে ১০ মিনিটের পরামর্শ সময় নিশ্চিত করতে হবে, এ জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেবা প্রদানকারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে এবং সাপ্তাহিকভাবে প্রেসক্রিপশন নমুনা যাচাইয়ের পদ্ধতি চালু করা হবে। অতি দরিদ্র বা যারা দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ, তারা সব হাসপাতালে বিনামূল্যে সব সেবা পাবেন। দেশের সব সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি হাসপাতালের রক্ত সঞ্চালন সেবা, ল্যাবরেটরি সেবা ও ফার্মেসি ২৪/৭ খোলা থাকবে। হাসপাতালে মানোন্নয়নের জন্য কার্যকর মানোন্নয়ন পর্ষদ ও কন্টিনিউড এডুকেশন পদ্ধতির ব্যবস্থা থাকতে হবে।

সুপারিশে বলা হয়েছে, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সর্বজনীন প্রাপ্যতাকে একটি মৌলিক স্বাস্থ্য অধিকার হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। দেশের সব নাগরিককে প্রয়োজনের ভিত্তিতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ বিনামূল্যে (যথা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে এবং অতি দরিদ্রের ক্ষেত্রে) বা ভর্তুকি মূল্যে সরবরাহ করতে হবে। এ জন্য সরকারি ওষুধ উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিকায়ন ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে পুনর্গঠিত ও শক্তিশালী করতে হবে। বেসরকারি খাত থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত ওষুধ সংগ্রহে কৌশলগত ক্রয়ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি সরকারি হাসপাতাল ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ফার্মেসি ২৪ ঘণ্টা চালু রাখতে হবে। এই ফার্মেসিগুলো জাতীয় ফার্মেসি নেটওয়ার্কের আওতায় পরিচালিত হবে। অ্যান্টিক্যানসার, অ্যান্টিডায়াবেটিক, অ্যান্টিহাইপারটেনসিভ ও অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকাভুক্ত অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর ভ্যাট এবং প্রযোজ্য অন্যান্য শুল্ক ও কর শূন্য হবে। অন্যদিকে ভিটামিন, মিনারেলস, ব্রেস্ট মিল্ক সাবস্টিটিউট ও প্রোবায়োটিকসহ স্বাস্থ্য-সম্পূরক ও উচ্চমূল্যের ওষুধের ওপর ভ্যাট ও শুল্ক বৃদ্ধি করতে হবে। এর মাধ্যমে একদিকে জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা বাড়বে, অন্যদিকে তুলনামূলক কম প্রয়োজনীয় ও বিলাসমূলক পণ্যে কর বাড়িয়ে রাজস্ব আয় জোরদার করা যাবে।

সুপারিশে বলা হয়, জরুরি চিকিৎসাকে একটি বিশেষায়িত ও অত্যাবশ্যকীয় স্বাস্থ্যসেবা হিসেবে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একে একটি স্বীকৃত চিকিৎসা বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগগুলো পর্যায়ক্রমে এই বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্বে পরিচালিত হতে হবে, যাতে জরুরি চিকিৎসাসেবার পরিসর ও মান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

সুপারিশে বলা হয়, স্বাস্থ্য পরিষেবাগুলোর প্রাপ্যতা, মান ও পরিব্যাপ্তি নিশ্চিত করতে জাতীয় ফার্মেসি নেটওয়ার্ক, জাতীয় ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্ক, জাতীয় রক্ত সঞ্চালন নেটওয়ার্ক এবং জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক গঠন করতে হবে। এই পরিষেবাগুলো নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী নিজ নিজ ক্ষেত্রে একটি একীভূত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সারা দেশে সংযুক্ত থাকবে এবং পরিচালিত হবে, যাতে জনগণ সহজে, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে এই পরিষেবাগুলো পেতে পারেন।

স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন বলেছে, কর্মরত জনবলের জন্য একটি স্বতন্ত্র চাকরিবিধি ও পৃথক বেতন কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে এবং যোগ্যতা অনুযায়ী বেতন-ভাতা পাবেন, যাতে পেশাদারি, দক্ষতা ও জবাবদিহিমূলক সেবার মান নিশ্চিত হয়। এ ছাড়া স্বাস্থ্য খাতের নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া নিয়মিত করা এবং স্বচ্ছতা আনার জন্য একটি স্বতন্ত্র পিএসসি (স্বাস্থ্য) গঠন করতে হবে।

দেশের স্বাস্থ্য খাতকে শক্তিশালী করতে প্রবাসীদের সরাসরি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে ‘স্বাস্থ্য উন্নয়ন প্রবাসী বন্ড’ চালুর সুপারিশ করেছে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন। একই সঙ্গে বিলাসবহুল ও অপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ওপর পৃথক স্বাস্থ্য কর আরোপের প্রস্তাবও দিয়েছে কমিশন।

চিকিৎসকদের কাছে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি পাঠিয়ে সরাসরি পণ্যের প্রচার (প্রোডাক্ট প্রমোশন) চালানো বন্ধ করার সুপারিশ করেছে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন। এই সিদ্ধান্ত চিকিৎসকদের নিরপেক্ষতার পাশাপাশি রোগীদের স্বার্থ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে কমিশন।

কমিশনের সদস্য ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন বলেন, চিকিৎসক-ফার্মাসিউটিক্যাল সংক্রান্ত নীতি সম্পর্কিত সুপারিশে কমিশন সুপারিশ করেছে, ওষুধের নমুনা বা উপহার দিয়ে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ থাকবে। ক্যানসার, ডায়বেটিসের ওষুধের ভ্যাট-কর মওকুফ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংখ্যা বাড়ানো এবং দুই বছর পরপর এই ওষুধের তালিকা আপডেট করার সুপারিশ করেছে কমিশন। এ ছাড়া অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ প্রাথমিক পর্যায়ে বিনামূল্যে ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ভর্তুকিমূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, অতিদরিদ্র ২০ শতাংশ মানুষ সব ধরনের সেবা বিনামূল্যে পাবে। ১০ শতাংশ দরিদ্র রোগী বেসরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে সেবা পাবে।

এসকে/ 



Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: