দীর্ঘদিন ধরে দেশের জনগণ একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে বন্দি ছিল। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য গত বছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে দেশের ছাত্ররা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন শুরু করে, যা পরবর্তীতে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদের পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করে। খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে পেশাজীবী, অভিভাবক এমনকি শিশুরাও এই আন্দোলনে শামিল হয়। বৈষম্যবিরোধী এই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিতে গিয়ে শত শত ছাত্র ও সাধারণ মানুষ শহিদ হন। অনেকে গুরুতর আহত হন, কেউ কেউ পঙ্গুত্বের শিকার হন। এখনও অনেক গুরুতর আহত ব্যক্তি জীবনের সঙ্গে লড়ছেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, গুরুতর আহতদের মধ্যে অনেকেরই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। শহিদদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন সুবিধাবঞ্চিত, আর্থ-সামাজিক মানদণ্ডে নিম্নমধ্যবিত্ত বা হতদরিদ্র শ্রেণির। আহতদের মধ্যে অনেকের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন, কিন্তু তাদের বেশিরভাগেরই চিকিৎসার ব্যয় বহন করার সামর্থ্য নেই। আহতদের চিকিৎসার জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠন করা হলেও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আহতদের চিকিৎসার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসের এই গণঅভ্যুত্থানকে জাতির সামনে চিরজাগরুক রাখার লক্ষ্যে পরিকল্পনা নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। বিশেষ করে আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে রাষ্ট্রীয় এবং জাতীয় জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এরই অংশ হিসেবে আগামী ৫ আগস্টকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এই দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের কাছে এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য তুলে ধরা। জানা গেছে, গত ২৯ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম, বীর প্রতীক।
সভার শুরুতে উপদেষ্টা বলেন, এই সভা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক। সভায় অংশগ্রহণকারীরা ভবিষ্যতে গর্বের সঙ্গে বলতে পারবেন যে, তারা একটি ঐতিহাসিক সভায় অংশ নিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, যাদের সীমাহীন ত্যাগ ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে দেশকে নতুন করে গড়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তাদের অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে হবে। এই লক্ষ্যে ৫ আগস্টকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশে জাতীয় পর্যায়ে ১৫টি ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে পালিত হয়।
সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিরা তাদের সুপারিশ তুলে ধরেন। ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার প্রস্তাব করেন, দিবসটি পালনের জন্য একটি গাইডলাইন প্রণয়ন করা হলে সারা দেশে একইভাবে উদযাপন সম্ভব হবে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব প্রস্তাব করেন, দিবসটি ‘স্বৈরাচারমুক্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ নামে পালনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থান’ ও ‘আগস্ট’ শব্দ বাদ দিয়ে শুধু ‘জুলাই দিবস’ নামে পালনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব প্রস্তাব করেন, এই দিবসে সরকারিভাবে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা যেতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব বলেন, জুলাই আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসার সঙ্গে তারা শুরু থেকেই জড়িত, তাই ৫ আগস্টকে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে পালন যুক্তিযুক্ত। সুরক্ষা সেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব বলেন, দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালনের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক বরাদ্দ রাখা জরুরি। পরবর্তীতে সবার মতামতের ভিত্তিতে ৫ আগস্টকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
এসকে/