মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্পে অবৈধ লেনদেন ১৩৮ কোটি

সমীরণ রায়

জাতীয়

অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন, বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে

2025-05-13T01:46:17+00:00
2025-05-13T02:24:51+00:00
 
  বুধবার, ১০ জুন ২০২৬,
২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
জাতীয়
মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্পে অবৈধ লেনদেন ১৩৮ কোটি
পিডি জাহাঙ্গীরের দুর্নীতি
সমীরণ রায়
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ মে, ২০২৫, ১:৪৬ এএম  আপডেট: ১৩.০৫.২০২৫ ২:২৪ এএম  (ভিজিট : ৪২১)
মাতারবাড়ী আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার্ড পাওয়ার প্রজেক্ট। ছবি: সংগৃহীত
অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন, বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে মাতারবাড়ী আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার্ড পাওয়ার প্রজেক্টের সাবেক পরিচালক জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জাহাঙ্গীর আলম সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়েদুল কাদেরের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত।

দুদক সূত্র জানায়, মাতারবাড়ী আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার্ড পাওয়ার প্রজেক্টের (আরএইচডি পার্ট) পরিচালক জাহাঙ্গীর আলমের বেতন-ভাতা ব্যতীত অন্য কোনো বৈধ উৎস না থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার ৮২টি হিসাবে ১৩৮ দশমিক ৩১ কোটি টাকার লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তার আয়কর নথিতে ৪ দশমিক ১০ কোটি টাকার নিট সম্পদ প্রদর্শনের বিপরীতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হিসাবে বর্তমানে ৩০ দশমিক ৬৬ কোটি টাকা স্থিতি থাকা ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে অপরাধ করাসহ নিজ নামে ও তার ওপর নির্ভরশীলদের নামে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ পেয়েছে দুদক। এ ছাড়া এই প্রকল্পে ৬ হাজার ৫৭১ কোটি টাকার ব্যয়ের কোনো হিসাব নেই বলেও অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ফলে অনুসন্ধানে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে মামলা করতে যাচ্ছে দুদক। ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭ (১) ধারাসহ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪ (২), (৩) ধারা মামলার সুপারিশ করেছে কমিশন।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, অনুসন্ধানকালে বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া ও সংগৃহীত রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, আসামি মো. জাহাঙ্গীর আলম মোট ৪৯ লাখ ৬৩ হাজার ৬৫০ টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদ এবং ৩১ কোটি ২ হাজার ৪৫৯ টাকা মূল্যের অস্থাবর সম্পদসহ মোট ৩১ কোটি ৪৯ লাখ ৬৬ হাজার ১০৯ টাকা মূল্যের সম্পদ অর্জন করে ভোগদখলে রেখেছেন। এ সময়ে তার পারিবারিক ও অন্যান্য ব্যয় পাওয়া যায় ৬৮ লাখ ৫৫ হাজার ৫৩৭ টাকা। এ ব্যয়সহ তার নামে পাওয়া নিট সম্পদের পরিমাণ মোট ৩২ কোটি ১৮ লাখ ২১ হাজার ৬৪৬ টাকা। অন্যদিকে তার নামে পাওয়া গ্রহণযোগ্য বৈধ আয়ের উৎসের পরিমাণ ৩ কোটি ১১ লাখ ১০ হাজার ১৯২ টাকা। এ ক্ষেত্রে মো. জাহাঙ্গীর আলম ২৯ কোটি ৭ লাখ ১১ হাজার ৪৫৪ টাকা মূল্যের আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জন করে ভোগদখলে রেখে দুর্নীতি দমন কমিশনের আইন, ২০০৪-এর ২৭ (১) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

দুদক সূত্র জানায়, জাহাঙ্গীর আলম নিজ নামে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ৯৪টি হিসাবে সর্বমোট ১২৭ কোটি ৩৫ লাখ ১৩ হাজার ২২৬ টাকার সন্দেহজনক লেনদেন করেছেন যার পক্ষে কোনো বৈধ উৎস নেই এবং তিনি এ অবৈধ অর্থ বারবার বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা ও উত্তোলনের মাধ্যমে সন্দেহজনক লেনদেন করে লেয়ারিং ঘটিয়ে অর্থের উৎস গোপন করার মাধ্যমে বৈধ করার ছদ্মাবরণে এ অর্থের হস্তান্তর, রূপান্তর ও স্থানান্তরের মাধ্যমে অর্থের অবস্থান গোপন করে তা বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে মানি লন্ডারি প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪ (২), (৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। তাই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের আইন, ২০০৪-এর ২৭ (১) ধারা ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪ (২), (৩) ধারায় একটি মামলা রুজুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের অতিরিক্ত সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন টাকার কুমির। মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের সড়ক উন্নয়ন অংশের প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) দায়িত্বের পর এ কর্মকর্তার অর্থ-সম্পদও বাড়তে থাকে। গত ১০ বছরে তিনি বেতন পেয়েছেন মাত্র ৯৮ লাখ টাকা। অথচ তার নামে ৭৭টি এফডিআরসহ ৮২ ব্যাংক হিসাবে লেনদেন করেছেন ১৩৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা। তার এ বিপুল অর্থ লেনদেন ধরা পড়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তদন্তে। মাতারবাড়ী আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার্ড পাওয়ার প্রকল্পে কয়লা আমদানিতেও জাহাঙ্গীর আলম দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি নিম্নমানের কয়লা আমদানি করেছেন। ইতিমধ্যে ইন্দোনেশিয়া থেকে আনা ওই কয়লায় দূষণের প্রমাণ পাওয়ায় নমুনা পরীক্ষার জন্য তা ব্যাংককে পাঠানো হয়েছে। তিনি এ প্রকল্পে চুক্তিভিত্তিক ছিলেন। অডিট আপত্তি থাকা সত্ত্বেও সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়েদুল কাদেরের ঘনিষ্ঠজন হওয়ায় প্রকল্পের ৬ হাজার ৫৭১ কোটি টাকার জবাবদিহির আওতায় আসেননি তিনি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক রফিকুজ্জামান সময়ের আলোকে বলেন, দুদকের অনুসন্ধানে মো. জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করেছে দুদক। দুয়েক দিনের মধ্যেই তার বিরুদ্ধে মামলা রুজুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর আগে গত বছরের ২৪ অক্টোবর মাতারবাড়ী আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার্ড পাওয়ার প্রজেক্টের (আরএইচডি পার্ট) পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম ও তার স্ত্রী নুসরাত জাহানের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক ইব্রাহিম মিয়া। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন তিনি। ওই আবেদনে বলা হয়, মাতারবাড়ী আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার্ড পাওয়ার প্রজেক্টের (আরএইচডি পার্ট) পরিচালক জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে বেতন-ভাতা ব্যতীত অন্য কোনো বৈধ উৎস না থাকা সত্ত্বেও অজ্ঞাত উৎস থেকে অর্জিত ১৩৮ দশমিক ৩১ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ৮২টি হিসাবে লেনদেন, তার আয়কর নথিতে ৪ দশমিক ১০ কোটি টাকার নিট সম্পদ প্রদর্শনের বিপরীতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হিসাবে বর্তমানে ৩০ দশমিক ৬৬ কোটি টাকা স্থিতি থাকা ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে সম্পৃক্ত অপরাধ করাসহ নিজ নামে ও তার ওপর নির্ভরশীলদের নামে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। তার নামে থাকা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হিসাবগুলোতে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়েছে।

সূত্র জানায়, সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের অতিরিক্ত সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ও মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের সাবেক প্রকল্প পরিচালক জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। তিনি পতিত আওয়ামী লীগের সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়েদুল কাদেরের ঘনিষ্ঠজন হওয়ার ফলে প্রভাব খাটিয়ে মাতারবাড়ী প্রকল্পে দুর্নীতি অনিয়মের টাকায় রাজধানীর বসুন্ধরায় আলিশান ফ্ল্যাট কেনেন। ব্যবহার করতেন কোটি টাকার গাড়ি। তার রয়েছে শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ। ২০১২ সালের ২১ নভেম্বর ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি বসুন্ধরা শাখায় একটা সঞ্চয়ী হিসাব খোলেন জাহাঙ্গীর আলম। বিভিন্ন সময় এ হিসাবে ২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা জমা হওয়ার পর সব টাকাই তুলে নেন তিনি। তিনি গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসির করপোরেট শাখায় আরেকটি সঞ্চয়ী হিসাব খোলেন ২০১৬ সালের ২৩ অক্টোবর। এ হিসাবে বিভিন্ন সময় ১২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা জমা করার পর তা তুলে নেন। ২০২১, ২০২৩, ২০২৪ সালে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি গুলশান করপোরেট শাখায় ১৮টি এফডিআর এবং একটি সঞ্চয়ী হিসাব খুলে জমা করেন ৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। 

২০১২ সালে জাহাঙ্গীর আলম আরেকটি সঞ্চয়ী হিসাব খোলেন ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি প্রগতি সরণি শাখায়। এ হিসাবে ৩৮ কোটি টাকা জমা করেন তিনি। সেখান থেকে তুলে নেওয়া হয় ৩৭ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। ২০২৩, ২০২৪ সালে ১১টি এফডিআর এবং ডিপিএস হিসাব খুলে ৮ কোটি ৮ লাখ টাকা জমা করেন। ২০২৪ সালের জুন-জুলাইয়ে আইডিএলসি ফাইন্যান্স পিএলসি উত্তরা শাখায় ৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকার ১৭টি এফডিআর করেন। ২০২৩, ২০২৪ সালে ১৩ কোটি ৮ লাখ টাকার ৩১টি এফডিআর করেন ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স পিএলসি গুলশান শাখা এবং প্রিন্সিপাল শাখায়। ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকের রাজশাহী, গোপালগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও এবং ঢাকার বারিধারা শাখায় খোলা হিসাবে ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা জমা করে তা তুলে নেন জাহাঙ্গীর আলম। এসব হিসাবে তিনি মোট ১৩৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা লেনদেন করেন। জমা থাকা ৩০ কোটি ৬৬ লাখ টাকা জব্দ করে বিএফআইইউ।

এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, মাতারবাড়ী প্রকল্পের পরিচালক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পালিয়ে গেছেন। যাওয়ার আগে তিনি প্রকল্পের অনেক সরকারি জিনিসপত্র বিক্রি করে দেন। তাই আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, প্রকল্প পরিচালক দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পর অনেক প্রকল্প পরিচালককে পাওয়া যাচ্ছে না। মাতারবাড়ী প্রকল্পে সমস্যা আছে। এখানে নিম্নমানের কয়লা ব্যবহার করা হচ্ছে। এখানে দূষিত কয়লা পাওয়া গেছে। এ কয়লা ব্যাংককে পাঠানো হয়েছে পরীক্ষা করার জন্য। বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লারে ছাই পাওয়া গেছে, রক্ষণাবেক্ষণ সঠিকভাবে করা হয় না।

এসকে/ 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: