ট্রুথ কমিশনে পথ মিলবে বিরোধ মীমাংসার

রফিকুল ইসলাম সবুজ

জাতীয়

এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুর্নীতিবাজদের স্বেচ্ছায় দায় স্বীকার এবং জরিমানা আদায়ের মাধ্যমে অনুকম্পা বা মার্জনার সুযোগ দিতে ২০০৮ সালে সত্য ও

2025-05-15T23:55:35+00:00
2025-05-15T23:55:35+00:00
 
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
ট্রুথ কমিশনে পথ মিলবে বিরোধ মীমাংসার
রফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৫ মে, ২০২৫, ১১:৫৫ পিএম 
ছবি: সময়ের আলো
এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুর্নীতিবাজদের স্বেচ্ছায় দায় স্বীকার এবং জরিমানা আদায়ের মাধ্যমে অনুকম্পা বা মার্জনার সুযোগ দিতে ২০০৮ সালে সত্য ও জবাবদিহি কমিশন বা ‘ট্রুথ কমিশন’ গঠন করেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে ওই কমিশন অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন আদালত। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতির দায় স্বীকার করে জরিমানা দিয়ে মার্জনা পাওয়া সরকারি কর্মকর্তাদের আবারও বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

বর্তমান অন্তবর্তী সরকারও ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এবার শুধু দুর্নীতিবাজদের জন্য নয়, জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপরাধীরা যে এ জাতির মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন, সেটাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ট্রুথ কমিশন গঠন করা হবে। আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ট্রুথ কমিশন গঠনের বিষয়টি এখনও আলোচনা পর্যায়ে রয়েছে। কোন প্রক্রিয়ায় এবং কাদের নিয়ে এই কমিশন গঠন করা হবে তা এখনও ঠিক হয়নি। এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা নিতে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল আগামী সপ্তাহে দক্ষিণ অফ্রিকা সফরে যাচ্ছে। তারা দেশে ফেরার পর কমিশনের গঠন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হতে পারে।

বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানের পর ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের উদাহরণ অনেক দেশে থাকলেও দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের অবসানের পর ট্রুথ কমিশন গঠনের বিষয়টি বিশ্বব্যাপী বহুল আলোচিত। এর আগে এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে বাংলাদেশেও অধ্যাদেশের মাধ্যমে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই থেকে সত্য ও জবাবদিহি কমিশন কাজ শুরু করেছিল। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল এই কমিশন।

কমিশন দুর্নীতিবাজদের স্বেচ্ছায় দায় স্বীকার এবং জরিমানা আদায়ের মাধ্যমে অনুকম্পা বা মার্জনার সুযোগ দিয়েছিল। তবে ওই বছরেরই আগস্টে এই কমিশনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট হলে ১৩ নভেম্বর হাইকোর্ট ট্রুথ কমিশন অবৈধ ঘোষণা করে। ফলে যেসব দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অনুকম্পা পেয়েছিলেন তারা আবারও দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত এবং মামলার আওতায় চলে আসেন। তখন  ট্রুথ কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে তীব্র সমালোচনা ও প্রশ্ন ওঠে।

তবে এখন যে ট্রুথ কমিশন হবে, তা অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে বিচার বিশ্লেষণ করেই গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিøষ্টরা।

আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল ইতিমধ্যে জানিয়েছেন গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো ঘৃণ্য অপরাধীরা সংখ্যায় খুব বেশি নয়। তাদের উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতেই ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠন করা হবে। এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য আগামী সপ্তাহে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি দল দক্ষিণ অফ্রিকা সফরে যাচ্ছে। এই সফরে আইন উপদেষ্টা নিজেও থাকছেন।

৫ আগস্ট ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন মহল থেকে ট্রুথ কমিশন গঠনের দাবি ওঠে। আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ট্রুথ কমিশন বলতে আইনত স্বীকৃত এমন এক কমিশনকে বোঝায়, যা আইনে অভিযুক্ত হওয়া থেকে অব্যাহতি বা দায়মুক্তি প্রদান করে। এই দায়মুক্তি এমন ব্যক্তিকে দেওয়া হয় যিনি স্বাভাবিক আইনে বিচারযোগ্য কোনো অপরাধে তার সংশ্লিষ্টতার কথা স্বেচ্ছায় প্রকাশ করেন। বিশ্বের কয়েকটি দেশে ট্রুথ কমিশনের ডজনখানেকের বেশি দৃষ্টান্ত রয়েছে।

রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশের ((রিব) চেয়ারম্যান শামসুল বারী বলেন, ট্রুথ কমিশনের কাজ হবে, তারা স্বৈরশাসনামলে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঠিক তথ্য তুলে ধরবে। যার ভিত্তিতে বিরোধ মীমাংসার পথ অনুসন্ধান করে সামাজিক আস্থা ফিরিয়ে আনা যাবে। তার মতে দেশ এখন ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গণহত্যার বিচার, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সহায়তা, সংস্কার ও মানবাধিকারের মতো বিষয় সামনে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ক্রান্তিকালীন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য ‘ ট্রুথ কমিশন’ প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক উম্মে ওয়ারা বলেন, ক্রান্তিকালীন বিচারের প্রথম স্তম্ভ হিসেবে আদালতে বিচারপ্রক্রিয়ার কথা এলেও বিচারপ্রক্রিয়াতে বাদী ও বিবাদীর আইনি মারপ্যাঁচে ভুক্তভোগীর অবস্থান ও প্রতিনিধিত্ব অনেক সময়ই গুরুত্ব হারায়। তাই ভিকটিমকে প্রাধান্য রেখে সত্য উদ্ঘাটনের প্রক্রিয়া হিসেবে বিভিন্ন দেশে কমিশন গঠনের উদাহরণ রয়েছে, যা ‘ট্রুথ ও রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ হিসেবেই পরিচিত। দক্ষিণ আফ্রিকা, কেনিয়া কিংবা পাশের দেশ নেপালসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ক্রান্তিকালীন বিচারের অংশ হিসেবে ট্রুথ কমিশন প্রতিষ্ঠা করেছে।

ট্রুথ কমিশনগুলোর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- অপরাধ সংঘটনের প্রক্রিয়ার কারণ ও পন্থাগুলো খুঁজে বের করা। এখানে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া মূল উদ্দেশ্য নয়, বরং সত্য উন্মোচন করা এবং তা নথিভুক্ত করাই এর আসল উদ্দেশ্য।

বিশিষ্ট চিন্তক ও কলামিস্ট ফরহাদ মজহার বলেন- গুম, খুনের মতো রাষ্ট্রীয় অপরাধের ফলে সামাজিক ও রাজনৈতিক যে ‘ক্ষত’ তৈরি হয়েছে, তা সারাতে এবং অপরাধীদের ‘শোধরাতে’ দক্ষিণ আফ্রিকার আদলে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠন জরুরি হয়ে পড়েছে। এই কমিশন অপরাধীর বিচারের ব্যবস্থা করবে। সেই সঙ্গে অপরাধগুলো কেন ঘটেছে, কারা এর হুকুম দিয়েছে, কারা করেছে, তা খুঁজে বের করবে। যারা হুকুমের অধীন হয়ে অপরাধ করেছে, কমিশনের কাছে তারা অপরাধ স্বীকার করবে। কারণ ‘স্বীকারোক্তি ছাড়া ক্ষমা মেলে না’। এই সত্যান্বেষণ আর বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যদি মীমাংসা করা না হয়, ক্ষত যদি সারানো না যায়, তা হলে সমাজে বড় ধরনের ‘অস্থিতিশীলতা’ দেখা দেওয়ার শঙ্কা থেকে যাবে।

সম্প্রতি একটি আলোচনায় ফরহাদ মজহার বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলেও তিনি বলেছিলেন ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন জাতীয় একটা কমিশন গঠন করে একাত্তরে অপরাধগুলো মীমাংসা করুন।

যারা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো ঘৃণ্য অপরাধ করেছে, তারা যে এই জাতি থেকে বিচ্ছিন্ন ও মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন, সেটাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠন করা হবে জানিয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, এটা ১৯৭২ সাল থেকে থাকলেই ভালো হতো। অনন্তকাল হানাহানি করে এ জাতির মুক্তি হবে না। জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। গত শনিবার এক অনুষ্ঠানে আইন উপদেষ্টা বলেন, তারা সবকিছুই খুব প্রফেশনালভাবে নিষ্পত্তি করতে চান। এই আইনটা করে যেতে চান, তার কারণ হলো তাদের পরে যারা আসবে তারা এ আইনটা করবে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত না।

অনন্তকাল হানাহানি করে এ জাতির মুক্তি হবে না মন্তব্য করে আইন উপদেষ্টা বলেন, জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। যারা গণহত্যার মতো, মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো ঘৃণ্য অপরাধ করেছে, তারা খুব বেশিসংখ্যক না। তাদের উপযুক্ত, যথেষ্ট পরিমাণ শাস্তির ব্যবস্থা অবশ্যই আমাদের করতে হবে। তিনি বলেন, যারা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন, তাদের উপযুক্ত বিচার করে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তারা বদ্ধপরিকর। একই সঙ্গে তারা এই ধরনের আইন করে যাবেন, যাতে এই অপরাধগুলো ভবিষ্যতে না হয়।

এএডি/


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: