বাণিজ্যে একের পর এক খড়গ

এসএম আলমগীর

অর্থনীতি

অভ্যন্তরীণ ও বাইরের একের পর এক সংকটে খড়গ নেমে এসেছে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ৩৭ শতাংশ শুল্কের বোঝা

2025-05-19T02:38:15+00:00
2025-05-19T02:38:15+00:00
 
  শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬,
১৩ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
অর্থনীতি
বাণিজ্যে একের পর এক খড়গ
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ মে, ২০২৫, ২:৩৮ এএম 
ছবি : সময়ের আলো
অভ্যন্তরীণ ও বাইরের একের পর এক সংকটে খড়গ নেমে এসেছে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ৩৭ শতাংশ শুল্কের বোঝা এখনও ঘাড়ের ওপর ঝুলে আছে। গত (১৫ এপ্রিল) ভারত বাতিল করেছে বাংলাদেশের ট্রান্সশিপমেন্ট। আর সর্বশেষ শনিবার স্থলবন্দর দিয়ে তৈরি পোশাকসহ বেশ কিছু বাংলাদেশি পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে প্রতিবেশী দেশটি। এর সঙ্গে আছে অভ্যন্তরীণ সংকট-বহুমুখী ব্যাংকিং বিড়ম্বনা, ইডিএফ ফান্ড বন্ধ করা, ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল বাতিল করা, প্রণোদনা বন্ধ করে দেওয়া। সর্বোপরি গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে স্থবিরতা।

দেশের উদ্যোক্তা ও রফতানিকারকরা বলছেন, এত এত সংকটের কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য আইসিইউতে চলে গেছে। দ্রুত সংকটগুলো সমাধান না করলে এর পর ব্যবসা-বাণিজ্য কোমায় যাবে এবং শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যাবে শিল্প-কারখানা। ব্যবসায়ীরা আরও বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যেভাবে বাণিজ্য ‘যুদ্ধ বেধেছে’, ঠিক সেভাবেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’ বেধে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগেই থামানো দরকার।

আর অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ভারত-বাংলাদেশ যেভাবে পাল্টাপাল্টি ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা উভয় দেশের জন্যই মঙ্গলজনক না। এতে ক্ষতি হচ্ছে দুই দেশের ব্যবসায়ী এবং জনগণের। তাই দ্রুত এই সংকট সমাধানে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো দরকার। যদিও রোববার বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশিরউদ্দিন বলেছেন, স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশি পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় বেশি ক্ষতি হবে ভারতেরই।

মূলত গত বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুস্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে থাকে ভারতের। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের তরফ থেকে সহযোগিতামূলক আচরণ দেখানো হলেও ভারত সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে বৈরিতা বাড়াতেই থাকে।

এই বৈরিতার মধ্যেই গত ২৭ মার্চ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানি বন্ধ করে দেয়। যদিও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক টানাপড়েনের জন্য বাংলাদেশ সরকার এ সিদ্ধান্ত নেয়নি, সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল মূলত দেশীয় বস্ত্রকল মাকিলকের সংগঠন বিটিএমএর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে। সরকারের এ সিদ্ধান্তের পর গত (৮ এপ্রিল) এ বিষয়ে সার্কুলার জারি করলে বন্ধ হয়ে যায় স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানি। এর ঠিক ৬ দিন পর, গত (১৫ এপ্রিল) ভারত সরকার বাংলাদেশে ট্রান্সশিপমেন্ট বাতিল করে দেয়। আর সর্বশেষ শনিবার স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশের তৈর পোশাকসহ বেশ কিছু পণ্য আমদানি বন্ধ করল ভারত। এর মধ্যে রয়েছে, বাংলাদেশি তৈরি পোশাক ও কিছু খাদ্যপণ্য।

ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক বাণিজ্য অধিদফতর (ডিজিএফটি) শনিবার এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানায়। এতে বলা হয়, ভারতের ব্যবসায়ীরা কলকাতা ও মুম্বাইয়ের নবসেবা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানি করতে পারবেন। এতে আরও উল্লেখ করা হয়, অবিলম্বে নতুন এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। পাশাপাশি ভারতের আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরাম ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন (এলসিএস)/ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্ট (আইসিপি) এবং পশ্চিমবঙ্গের চ্যাংড়াবান্ধা ও ফুলবাড়ী শুল্ক স্টেশন দিয়ে ফল এবং ফলের স্বাদযুক্ত পানীয়, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক পণ্য ইত্যাদি রফতানি করা যাবে না। তবে ভারত মাছ, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), ভোজ্য তেল ও ভাঙা পাথর নিষেধাজ্ঞার আওতায় রাখেনি। ডিজিএফটি জানিয়েছে, ভারতের বন্দর ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে বাংলাদেশি পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে এ বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে না।

ভারত সরকারের এ সিদ্ধান্তের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে গতকাল থেকেই। দেশটির এ সিদ্ধান্তে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বাংলাদেশের রফতানিকারকরা।

তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ সময়ের আলোকে বলেন,‘ভারত সরকারের এ সিদ্ধান্ত আমরা শঙ্কিত। স্থলবন্দর ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা ভারতে বাংলাদেশি পোশাক রফতানির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এটি মূলত আমাদের পোশাক রফতানির ওপর একটি অশুল্ক বাধা। যেহেতু এখন সমুদ্রবন্দর দিয়ে চালান পাঠাতে হবে, তাই লিড টাইম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং ফলস্বরূপ বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি করা ভারতীয় আমদানিকারকদের খরচ বাড়বে। দেশটির সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে উভয় দেশের ব্যবসায়ী ও জনগণের ক্ষতি হবে। এ ছাড়া আমি মনে করি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যেভাবে ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’ বেধেছে, সেভাবেই ভারত-বাংলাদেশ ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’ বেধেছে। স্থলবন্দর দিয়ে ভারত আমদানি বন্ধ করায় আমাদের সমুদ্রবন্দর দিয়ে পণ্য রফতানি করতে হবে। এতে খরচ ও সময় বেড়ে যাবে কয়েকগুণ। তাই আমি মনে করি এই সংকট দূর করার জন্য দুই দেশের সরকার পর্যায়ে আলোচনা করে করে দ্রত সমাধানে আসা। এভাবে পাল্টাপাল্টি ব্যবস্থা নিতে থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে উভয় দেশ।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সময়ের আলোকে বলেন, শনিবার ভারত সরকার স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশের বেশকিছু পণ্য আমদানিতে যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আমি মনে করি সেটি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাল্টা একটি ব্যবস্থা গ্রহণ। কারণ আগে আমরা স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানি বন্ধ করেছি, এখন তারা পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশি পণ্য প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিল। এর আগে অবশ্য ভারত বাংলাদেশের ট্রান্সশিপমেন্টও বাতিল করেছে। সুতরাং আমি মনে করি এটা পাল্টাপাল্টি ব্যবস্থা গ্রহণ। আমি মনে করি ভারত সরকারের এই সিদ্ধান্তে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে দুই দেশের জনগণও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক দিন থেকেই দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করা কঠিন হয়ে উঠেছে। নানামুখী সংকট বাড়তে বাড়তে ব্যবসা-বাণিজ্য এখন আইসিইউতে আছে। আইসিইউতে যদি ভালো চিকিৎসা না মেলে তা হলে ‘রোগী’ কিন্তু আর ফেরত আসবে না। অর্থাৎ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ব্যবসা-বাণিজ্য আইসিইউ থেকে চলে যাবে লাইফ সপোর্টে, সর্বোপরি বিদায় নেবে। ক্যানসারের রোগী যেভাবে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়, আমরা যারা ব্যবসায়ী তাদেরও এখন ওই অবস্থা হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ এবং বাইরের নানা রকম প্রতিবন্ধকতায় মূলত এখন ব্যবসা-বাণিজ্য কঠিন হয় উঠেছে। অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যে আছে- বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতিবাচক কিছু সিদ্ধান্ত। যেমন- রফতানি খাতের জন্য যত সুবিধা ছিল একটা একটা করে সেগুলো প্রত্যাহার করে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রথমে ইডিএফ বন্ধ করা হলো, প্রণোদন বন্ধ করা হলো, রফতানিকারকদের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার যে ফান্ড ছিল সেটিও বন্ধ করা হয়েছে গত এপ্রিল থেকে। এর পর ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়ানো হয়েছে অত্যাধিক। ব্যাংকগুলো ব্যাক টু ব্যাক এলসি দিচ্ছে না, দেরি করছে। ব্যাক টু ব্যাক এলসি না দেওয়ায় আমরা সময়মতো পণ্য রফতানি করতে পারছি না। সময়মতো পণ্য দিতে না পারায় বিদেশি ক্রেতারা ডিসকাউন্ট রেট দিচ্ছে। এ কারণে রফতানিকারকরা মোটা অঙ্কের অর্থের ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
 
গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট তো রয়েছেই। শিল্প কারখানায় ১৫ পিএসআই গ্যাস দেওয়ার কথা, অথচ আমরা পাচ্ছি মাত্র ৪ থেক ৫ পিএসআই। নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ আগে থেকেই পায় না, এখন গরমকাল আসায় বেড়েছে লোডশেডিং। ভারতের একের পর এক বিধিনিষেধ এবং মার্কিন সরকারের বাড়তি শুল্কের বোঝা, সেই সঙ্গে দেশের সংকটে ব্যবসায়ীরা এখন আতঙ্কের মধ্যে আছে। 

বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের চিত্র

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য গ্যাপ অনেক বেশি। প্রতি বছর বাংলাদেশ যে পরিমাণে পণ্য রফতানি করে ভারতে, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি পণ্য রফতানি করে ভারত বাংলাদেশে। গত পাঁচ বছরে দুই দেশের আমদানি-রফতানির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে-২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতে পণ্য রফতানি করে ১০৯৬ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন ডলারের। এর বিপরীতে ভারত বাংলাদেশে পণ্য রফতানি করে ৫৭৯৩ দশমিক ৫৭ মিলিয়ন ডলারের, এ বছর বাণিজ্য ভারতের সঙ্গে ঘাটতি থাকে ৪৬৯৭ দশমিক ১৯ মিলিয়ন ডলার। এর পর ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ রফতানি করে ১২৭৯ দশমিক ৬৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য, ভারত বাংলাদেশে রফতানি করে ৮৫৯৩ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন ডলারের পণ্য, ঘাটতি থাকে ৭৩১৩ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন ডলারের। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ রফতানি করে ১৯৯১ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন ডলারের, ভারত রফতানি করে ১৩৬৮৯ দশমিক ৯৫ মিলিয়ন ডলারের, ঘাটতি ১১৬৯৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ রফতানি করে ১৭৭৫ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন ডলারের, ভারত রফতানি করে ৯৪৯২ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন ডলারের, ঘাটতি ৭৭১৬ দশমিক ৬৯ মিলিয়ন ডলারের। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ রফতানি করে ১৫৬৯ দশমিক ২৪ মিলিয়ন ডলারের পণ্য, ভারত রফতানি করে ৯০০০ দশমিক ১৫ মিলিয়ন ডলারের পণ্য, ঘাটতি থাকে ৭৪৩০ দশমিক ৯১ মিলিয়ন ডলারের।

ইপিবির তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে ভারতে সবচেয়ে বেশি রফতানি হয় তৈরি পোশাক। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভারতে ৫৪ কোটি ৮৮ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করেছেন বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা। ভারত স্থলপথে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানি নিষিদ্ধ করায় এ ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন বাংলাদেশের রফতানিকারকরা। এ ছাড়া ভারতের নতুন বিধিনিষেধের কারণে কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রফতানিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে বলে বলছেন খাতটির রফতানিকারকরা। গত অর্থবছর ভারতে ১৫ কোটি ৬৮ লাখ ডলারের কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রফতানি হয়েছে।

ইপিবির তথ্যানুযায়ী, গত অর্থবছর বাংলাদেশ থেকে ভারতে ৪ কোটি ৪০ লাখ ডলারের প্লাস্টিক পণ্য, ৩ কোটি ১৩ লাখ ডলারের তুলা ও তুলার সুতার ঝুট ও ৬৫ লাখ ডলারের আসবাব রফতানি হয়। স্থলবন্দর ব্যবহার করে এসব পণ্য বেশি রফতানি হতো। এখন স্থলবন্দর দিয়ে রফতানিতে বিধিনিষেধ দিয়েছে ভারত। ফলে এসব পণ্যের রফতানিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে খাত-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বুড়িমারী সীমান্তে আটকে গেল প্রাণের ১৭ ট্রাক পণ্য স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি বন্ধ করার পরের দিন গতকাল থেকেই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশি পণ্য রফতানিতে। বিধিনিষেধের কারণে গতকাল বুড়িমারী সীমান্তে আটকে যায় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ১৭ ট্রাক খাদ্যপণ্য। এসব ট্রাকবোঝাই পণ্য গতকাল সকালে বুড়িমারী সীমান্ত পার হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি যাওয়ার কথা ছিল। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাণ আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল সময়ের আলোকে বলেন, ‘ভারত সরকারের বিধিনিষেধের কারণে আমাদের খাদ্যপণ্যবোঝাই ১৭ ট্রাক রফতানি পণ্য বুড়িমারী স্থলবন্দরে আটকে গেছে। এসব ট্রাক আমরা ফিরিয়ে আনছি। ট্রাকগুলোতে প্রায় সোয়া এক লাখ কোটি ডলার বা ১ কোটি ২০ লাখ টাকার পণ্য ছিল। ভারত সরকারের বিধিনিষেধের কারণে আমরা নতুন করে আর কোনো পণ্য স্থলপথে পাঠানোর উদ্যোগ নিইনি। পুরো পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।

তিনি আরও বলেন, আমরা প্রতি বছর ভারতে ৫০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করি। দেশটির সরকারের এ সিদ্ধান্তের ফলে রফতানি বাধাগ্রস্ত হবে, কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ ভারতে আমরা যতটা রফতানি করি তার পুরোটাই স্থলবন্দর দিয়ে। ৭টির বন্দরের মধ্যে ৫টিতেই বন্ধ করেছে, বাকি দুটিতে কি হবে সেটিও জানি না।

বেনাপোল বন্দরে আটকে গেছে পণ্যবাহী ৩৬টি ট্রাক সময়ের আলোর বেনাপোল সংবাদদাতা শহিদুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশ থেকে স্থলবন্দর দিয়ে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য, পোশাকসহ প্রায় সাত ধরনের পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রফতানিতে। শনিবার ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক বাণিজ্য অধিদফতর (ডিজিএফটি) এক বিবৃতিতে স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ হতে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য, তৈরি পোশাক পণ্যসহ সাত ধরনের পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় ভারতে প্রবেশের অপেক্ষায় ৩৬টি গার্মেন্টস পণ্যবোঝাই বাংলাদেশি ট্রাক বেনাপোল বন্দরে আটকে আছে। ওই নিষেধাজ্ঞা আদেশে বাংলাদেশ হতে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য, তৈরি পোশাক পণ্যসমূহ শুধু কলকাতা সমুদ্রপথে আমদানি করা যাবে উল্লেখ করেছেন।

ভারতের পেট্রাপোল ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়াড়িং এজেন্ট স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কার্তিক চক্রবর্তী বলেন, বাংলাদেশ থেকে বেশ কয়েকটি পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ভারত। যেসব পণ্যের এলসি/টিটি ইতিমধ্যে হয়ে গেছে সেসব পণ্য যাতে আমদানি করা যায় তার জন্য কাস্টমসে আলোচনা চলছে।

বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের কাস্টমস বিষয়ক সম্পাদক আবদুল লতিফ বলেন, ভারত সরকার স্থলবন্দর দিয়ে গার্মেন্টসসামগ্রী আমদানি নিষেধাজ্ঞা জারি করায় বিপাকে পড়েছে ব্যবসায়ীরা। স্থলপথে এসব পণ্য রফতানিতে খরচ অনেক কম হতো কিন্তু সমুদ্র ও বিমানপথে পণ্য রফতানিতে খরচ অনেক বেশি হবে।

বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক (ট্রাফিক) মামুন কবির তরফদার বলেন, এ সংক্রান্ত কোনো চিঠি আমরা পায়নি। পত্র পত্রিকায় দেখেছি। বেনাপোল বন্দর দিয়ে শনিবার পর্যন্ত সব পণ্য রফতানি হয়েছে। তবে রোববার সকাল থেকে অন্যান্য পণ্য রফতানি হলেও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য, পোশাক জাতীয় কোনো পণ্য রফতানি হয়নি। বিভিন্নভাবে জানতে পেরেছি ৩০-৩৫ ট্রাক পণ্য এখানে আটকে আছে।

কী বলছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা

এ বিষয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার সময়ের আলোকে বলেন, পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ভারত সরকার যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, তা দুই দেশের বাণিজ্যের জন্য ভালো খবর নয়। দুই দেশের মানুষের জন্যও এটা ভালো পদক্ষেপ নয়। এতে আঞ্চলিক বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হবে। ভারতের এই বিধিনিষেধের ফলে এখন আমাদের বাণিজ্য ব্যয় বেড়ে যাবে। কারণ, এখন অনেক পথ ঘুরে ভারতে পণ্য রফতানি করতে হবে। আগে সহজে বিভিন্ন স্থলবন্দর ব্যবহার করে দেশটিতে পণ্য পাঠানো যেত। কয়েক বছর ধরে ভারতে আমাদের পোশাক রফতানির পরিমাণ বাড়ছিল। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা সাফটার আওতায় দেশটিতে আমাদের রফতানি বাড়ছিল। এখন সেখানে ভাটা পড়তে পারে।

ভারতের ক্ষতির পাল্লাই ভারী : বাণিজ্য উপদেষ্টা

বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানিতে ভারতের বিধিনিষেধের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশিরউদ্দীন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা বাণিজ্য উদারীকরণে বিশ্বাসী। ব্যবসায় অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে কাজ করতে হবে। ভোক্তা ও ব্যবসায়ীর স্বার্থ রক্ষা করা আমাদের কাজ। ভারতের সঙ্গে আমাদের যে ব্যবসা, তাতে ভারতের পাল্লাই ভারী। এক দিনে এই বাণিজ্যঘাটতি কমবে না। এটা দূর করতে বেশ সময় লাগবে।’ গতকাল রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন বাণিজ্য উপদেষ্টা।

সেখ বশিরউদ্দীন বলেন, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানিতে ভারতের বিধিনিষেধের বিষয়ে জেনেছেন তিনি। তার ভিত্তিতে বিচার-বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে, বাংলাদেশের কী করণীয়, তা নির্ধারণের কাজ শুরু হয়ে গেছে।

সময়ের আলো/এমএইচ



Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: