বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ড্যাস-৮ উড়োজাহাজের চাকা খুলে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় চলছে তোলপাড়। গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি। দক্ষতার সঙ্গে পাইলট বিমানটি শাহজালালে অবতরণ করাতে সক্ষম হন। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো গেলেও এ ঘটনার কারণ খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসছে নানা তথ্য। মূলত ইঞ্জিনিয়ার বিভাগের গাফিলতি এবং নির্দেশনা না মানায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চাকা খুলে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে, ফ্লাইট শুরুর আগে নিয়ম অনুযায়ী উড়োজাহাজ ইনস্পেকশন করা হয়। এটা রুটিন ওয়ার্ক। এ ছাড়াও উড়োহাজের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। কিন্তু গত দেড় বছর ধরে এই ল্যান্ডিং গিয়ার নির্দেশনা অনুযায়ী রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। উড়োজাহাজ উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় ল্যান্ডিং গিয়ারের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে। ল্যান্ডিং গিয়ারে থাকা গ্রিজ শুকিয়ে যাওয়া বা সেখানে থাকা বিয়ারিংয়ে সমস্যা দেখা যাওয়ার কারণে উড়োজাহাজ উড্ডয়নের সময় চাকা খুলে পড়ে।
বিমান বাংলাদেশ সূত্রে জানা গেছে, ম্যানুফ্যাকচারার কোম্পানির নির্দেশনা অনুযায়ী ল্যান্ডি গিয়ার ৬ মাস পরপর মেইনটেইন্যান্স করার কথা। কিন্তু তা করা হয়নি। এ ছাড়া এর আগেও দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছিল বিমানের ড্যাস-৮ উড়োজাহাজ। ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর ফ্লাইট টেক অব করতে গিয়ে রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে বিমানের ড্যাস-৮ উড়োজাহাজ। কারণ অনুসন্ধান করে দেখা যায় ল্যান্ডিং গিয়ারে থাকা বেয়ারিং ত্রুটির কারণে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস বিভাগ ল্যান্ডিং গিয়ার রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য বেশি কিছু নির্দেশনা দেয়। সেটাও সঠিকভাবে পালন না করায় এমন দুর্ঘটনা হতে পারে।
বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসের চিফ ইঞ্জিনিয়ার এবিএম মুস্তাগিসুর রহমান স্বাক্ষরিত ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বরের ওই নথিতে বলা হয়, নভেম্বরের ২৭-২৮ তারিখে বিমানের চাকা ইনস্টলেশন এবং অপসারণ প্রক্রিয়া এবং হুইল শপে চাকা স্থাপন-বিচ্ছিন্নকরণ প্রক্রিয়া সরেজমিন পরীক্ষা করেন ইঞ্জিনিয়াররা। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, চাকার দুই পাশে ‘এই দিক থেকে বিয়ারিং’ লেখা আছে। কিন্তু বাইরের দিকে ‘এই দিক থেকে বিয়ারিং’ লেখা আছে, যা ভুল। ফলে বিমানে একই চাকা আবার ইনস্টল করার সময়, বিয়ারিং সিল এবং বিয়ারিং পপ আউট হয়ে যেতে পারে। বা প্রথম ইনস্টল করার সময় ভুলভাবে স্থাপন করা হতে পারে অথবা হুইল শপ থেকে ভুলভাবে লাগানো হতে পারে।
ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ত্রুটি এবং হুইল বিয়ারিংয়ের ব্যর্থতা রোধ করা যায় সে জন্য সব রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীদের অবশ্যই পালনের জন্য ৭ দফা সুপারিশ দেওয়া হয়। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে, চাকায় থাকা পুরোনো গ্রিজ বদলে ফেলা। ব্রেক প্রতিস্থাপনের সময় গ্রিজ দূষিত পাওয়া গেলে চাকাও প্রতিস্থাপন করা এবং দূষিত বা পোড়া গ্রিজ পরিবর্তন করা। নাটগুলো ঠিক আছে কি না তা নিশ্চিত করা। বিয়ারিং ঠিকমতো স্থাপন হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করা। এগুলোতে নতুন গ্রিজ দেওয়া হয়েছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া। বিয়ারিং সিল সঠিকভাবে স্থাপন করা, হুইল সঠিকভাবে স্থাপন করা এবং হুইল সঠিকভাবে কাজ করছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া।
অ্যাভিয়েশন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটা ল্যান্ডিং গিয়ার কতগুলো ফ্লাইট ল্যান্ডিং এবং উড্ডয়ন করতে পারবে তা নির্দিষ্ট করা আছে। এরপর গিয়ার পরিবর্তন করতে হয়। এ ছাড়া নির্দেশনা অনুযায়ী রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। প্রতিটি উড়োজাহাজ ফ্লাই করার আগে ইনস্পেকশন করা হয়। ইনস্পেকশন করেন একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার। এই উড়োজাহাজটিও উড্ডয়নের আগে ইনস্পেকশন করে রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে। এত সহজেই এটি খুলে পড়ার কথা না। এই ঘটনার পেছনে সেই ইঞ্জিনিয়ার এবং বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের দায় রয়েছে। এ ছাড়া বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ২০১৭ সালের দুর্ঘটনার পর যে সুপারিশ দিয়েছিল তা পালন করা হয়েছে কি না সেটা তদন্ত করে দেখলেই দুর্ঘটনার কারণ ও দায়ীদের খুঁজে বের করা যাবে।
এ বিষয়ে অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ওয়াহিদুল আলম সময়ের আলোকে বলেন, একটি বিমান ফ্লাই করার আগে চেক করে রিপোর্ট দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু এই রুটিন ওয়ার্কে অনেক সময় ত্রুটি ধরা পড়ে না। তাই রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো নির্দেশনা থাকলে সেটা নিশ্চিত করতেই হবে। না হলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে।
সময়ের আলো/এমএইচ