দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, এটি এখন জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। কেননা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাত ১০ শতাংশের নিচে আছে। আগামী (২০২৫-২৬) অর্থবছরেও ১০ শতাংশের নিচে থাকছে। পরোক্ষ কর বৃদ্ধির হার বেশি। তার মানে হচ্ছে সাধারণ মানুষের ওপরই করের বোঝা বাড়ছে। এ ছাড়া দেশ একটা অনিশ্চয়তার দিকে চলে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় বাজেট আর অর্থনৈতিক নীতি কিছুই কাজ করবে না বলে জানিয়েছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।
সোমবার (১৯ মে) রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে অর্থনীতি ২০২৫-২৬ : নীতি সংস্কার ও জাতীয় বাজেট শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন অর্থনীতিবিদরা। এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ এ সেমিনার আয়োজন করে।
এ সময় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দুইভাগ করার প্রক্রিয়াটি ঠিক হয়নি। আলোচনা ব্যতিরেকে, পেশাজীবীদের জায়গা সংকুচিত ও অন্যান্য অংশীজনকে নিয়ন্ত্রণে রেখে যেটি করা হয়েছে, সেটি ঠিক হয়নি। এখন ঠিক করা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, এনবিআর নিয়ে বর্তমানে যে আলোচনা চলছে সে বিষয়ে বলতে গেলে বলব-দুইভাগ করা ঠিক আছে। এটি আমাদের শ্বেতপত্রে সুপারিশে ছিল। কিন্তু যে প্রক্রিয়ায় করা হয়েছে, সেটি ঠিক হয়নি।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি আমরা পরিসংখ্যান দেখি, তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি কমেছে, ঋণপ্রবাহ তেমন উল্লেখযোগ্য নয়, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে, এডিআই কমেছে ও পুঁজিবাজারের সব সূচক নিম্নমুখী। এ অবস্থায় কর্মসংস্থান কীভাবে হবে? বেকারত্বের হার বেড়েছে ৪ শতাংশের বেশি। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি, অর্থাৎ তাদের প্রকৃত মজুরি কমে যাচ্ছে।
সিপিডির এই সম্মানীয় ফেলো বলেন, দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, এটি এখন জোর দিয়ে বলতে পারছি না। জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশের নিচে আছে। এটি বাড়াতে হবে। আগামী অর্থবছরেও ১০-এর নিচে থাকছে। পরোক্ষ করের বৃদ্ধির হার বেশি। তার মানে হচ্ছে সাধারণ মানুষের ওপরই করের বোঝা বাড়ছে।
বাজেটে ব্যয়ের তথ্য উল্লেখ করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, রাজস্ব ব্যয়ের দুটি খাত সবচেয়ে বেশি হচ্ছে- প্রথমটি সুদ ব্যয় আর দ্বিতীয়টি ভর্তুকি। সরকারের অর্থনীতি পরিচালনা কোনো ঘোষিত নীতিমালার আলোকে হচ্ছে না, তা চলছে অ্যাডহক ভিত্তিতে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার দুর্বলতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য মুদ্রানীতি এখনও প্রতিফলিত হয়নি। ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে এলে আমরা একটা সিগন্যাল পাব। বাংলাদেশে এ মুহূর্তে চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। যুব দারিদ্র্য বাড়ছে এটি বলাবাহুল্য।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারের বেশ কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করার বিষয়টি আমাদের নজরে রেখেছেন। টাস্কফোর্স থেকে বলেছি দ্বিবার্ষিক পরিকল্পনা তৈরি করা দরকার। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে এই সরকার আসলেও তারা অর্থনৈতিক বৈষম্য মোকাবিলায় যথেষ্ট পদক্ষেপ নিতে পারেনি। যে ফিসক্যাল পলিসি নিয়ে কাজ হচ্ছে, সেটিও কিন্তু গত সরকারের। পুরোনো যে কাঠামো রয়েছে সেটিকেই ধুয়ে-মুছে কাজ করা হচ্ছে, সেটি আমাদের পছন্দ হয়নি।
তিনি আরও বলেন, টাস্কফোর্সের যে সুপারিশ ছিল, সেটি ধরে যে গতি আসার কথা ছিল, তা আমরা দেখতে পাইনি। বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশ, বাংলাদেশ-মিয়ানমার দিয়ে জটিলতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, একইভাবে বৈষয়িক অর্থনীতির পরিস্থিতিও খুবই জটিল। বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাপনা খুবই সংকটের মধ্যে আছে। এ সংকটের মধ্যেই আগামী বাজেট করতে যাচ্ছে সরকার।
দেশের আমলাতন্ত্র আরও শক্তিশালী হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে চোরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। চোরতন্ত্রে ছিলেন আমলা, ব্যবসায়ী আর রাজনীতিবিদরা। এখন রাজনীতিবিদরা পালিয়ে গেছেন, ব্যবসায়ীরা ম্রিয়মাণ আর আমলারা পুরো শক্তি নিয়ে পুনরুজ্জীবিত।
এর আগে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী তার বক্তব্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক যাত্রার বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘বাস্কেট কেস’ ধরনের পুরোনো, নেতিবাচক ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে দেশের উন্নয়ন ও সক্ষমতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হওয়ার ওপর তিনি জোর দেন। পাশাপাশি স্থিতিশীল ও ন্যায্য আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামোর অনুপস্থিতির দিকটি তুলে ধরেন, যা আজকের দিনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
আলোচনায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুকে উপেক্ষা করছে। এর মাধ্যমে দেশ একটা অনিশ্চয়তার দিকে চলে যাচ্ছে। এমন অবস্থায় বাজেট বলুন আর অর্থনৈতিক নীতি, কিছুই কাজ করবে না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো নেওয়া এই সরকারের প্রধান দায়িত্ব। এ মুহূর্তে আমরা কোথায় যাচ্ছি, আগামী দিনে বাংলাদেশ কোথায় যাবে, এ সরকার কত দিন থাকবে, নির্বাচন কবে হবে, নির্বাচনের পরে বাংলাদেশ কোথায় যাবে এ বিষয় সবার মনে কাজ করছে। এখানে আমরা কোনো নিশ্চয়তা দেখতে পাচ্ছি না।
একটি প্রশ্নবিদ্ধ জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) ওপরে ভিত্তি করে বাজেট তৈরি হচ্ছে মন্তব্য করে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এর মাধ্যমে মূলত আমরা বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের বাজেটের ধারাবাহিকতা দেখতে পাচ্ছি। সেখান থেকে আলাদা করে কোনো কিছু করা হয়নি। বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক পটভূমি কতটুকু চিন্তা করা হয়েছে, সেই প্রশ্নগুলো আমাদের করা দরকার।
সময়ের আলো/এমএইচ