অন্তর্বর্তী সরকার সম্প্রতি একটি অধ্যাদেশ জারি করে বিলুপ্ত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করা এই প্রতিষ্ঠানটির স্থলে গঠন করা হয়েছে দুটি নতুন বিভাগ, ‘রাজস্ব নীতি’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা’। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য করনীতি প্রণয়ন ও কর ব্যবস্থাপনাকে আলাদা করে দক্ষতা বাড়ানো, স্বার্থের সংঘাত হ্রাস এবং দেশের করভিত্তি সম্প্রসারণ।
হঠাৎ এমন একটি বড় সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ‘এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ’-এর ব্যানারে তারা কলমবিরতির কর্মসূচি পালন করছেন। তাদের অভিযোগ, এভাবে আকস্মিকভাবে এনবিআর বিলুপ্তি রাজস্ব প্রশাসনের কাঠামোগত ভারসাম্য নষ্ট করবে এবং অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করবে।
এ বিষয়ে সময়ের আলোকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. রুশাদ ফরিদী বলেন, অর্থনৈতিক সংকটের এই সময়ে এ ধরনের পদক্ষেপে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য জড়িত থাকতে পারে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার নিজ স্বার্থেই চায় না কোনো অস্থিরতা তৈরি হোক। যেকোনো বড় প্রতিষ্ঠানের নিয়োগে রাজনৈতিক সংযোগ থাকে, যদিও কাগজে-কলমে যোগ্য ব্যক্তিকেই নিয়োগ দেওয়ার কথা। তবে বাস্তবে এমন হয় না। তারপরও একেবারে অযোগ্য কাউকে দায়িত্বে বসানো হবে না বলে আমার বিশ্বাস।
সব পর্যায়ে আলোচনা ছাড়া এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত- এ প্রসঙ্গে ড. রুশাদ ফরিদী বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত সব পর্যায়ে আলোচনা করে নেওয়া উচিত ছিল। রাজস্ব দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। হুট করে মধ্যরাতে অধ্যাদেশ জারি না করে আলোচনা করে পদক্ষেপ নিলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসন্তোষ এড়ানো সম্ভব হতো। এ ছাড়া সামষ্টিক অর্থনীতির ক্রান্তিকালে এনবিআর দুই ভাগ করার মতো এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত অনাকাক্সিক্ষত। গণতান্ত্রিক কাঠামোতে আইন ও নীতি প্রণয়নে অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া জরুরি।
আইনের শাসন ও জবাবদিহিতার বিষয়ে তিনি বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারলে দুর্নীতি কমানো সম্ভব। কেউ ৫ লাখ টাকার আয় গোপন করে পার পেয়ে গেলে সে বড় পরিসরে দুর্নীতি করতে উৎসাহ পায়। তাই ভালো কাজের মূল্যায়ন ও খারাপ কাজের জন্য শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার তাগিদ দেন এই অধ্যাপক।
বদলে যাওয়া কাঠামো ও ক্যাডার দ্বন্দ্বের বিষয়ে ড. রুশাদ ফরিদী বলেন, রাজস্ব নীতিনির্ধারণে অবশ্যই শুল্ক ও কর বিষয়ে পারদর্শী ব্যক্তিদের রাখা উচিত। শেখ হাসিনার আমলে যাচ্ছেতাইভাবে ডিসি-এসপির মাধ্যমে দেশ চালানো হতো, এখন ফ্যাসিস্ট পরবর্তী সময়ে সেখান থেকে সরে আসতে হবে। সংশ্লিষ্ট কাজে পারদর্শীকে উচ্চপর্যায়ে জায়গা দেওয়া হবে বলেই তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আইএমএফের চাপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ মানেই খারাপ এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। হ্যাঁ, তাদের ভূরাজনৈতিক এজেন্ডা থাকতে পারে, তবে কর-জিডিপি অনুপাত যদি তারা বাড়াতে বলে, সেটি তো আমাদের অর্থনীতির জন্য ভালো। বর্তমানে এই অনুপাত মাত্র ৭.৪ শতাংশ, যা এশিয়ায় সর্বনিম্ন। দেশে ২৬ লাখ মানুষ কর দেন। বছরের পর বছর ২৬ লাখ রয়ে গেল, এ সংখ্যা বাড়ছে না। জিডিপি বাড়াতে হলে করদাতা বাড়াতে হবে। বাকিরা কেন ট্যাক্স দেয় না, সেটি বের করতে হবে।
দুর্নীতির বাস্তবতা ও কাঠামোগত দুর্বলতার বিষয়ে ড. রুশাদ ফরিদীর বলেন, এনবিআরের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ড. ফরিদীর ভাষায় এখানে এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হতো, যারা দুর্নীতিগ্রস্ত ও দলীয় স্বার্থে কাজ করতেন। এর পরিবর্তন জরুরি। ২০০৭ সালে ফখরুদ্দিন আহমেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এক কড়া পদক্ষেপেই ৮৮ লাখ মানুষ টিআইএন (কর শনাক্তকরণ নম্বর) গ্রহণে আগ্রহী হয়েছিল। অথচ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো উদ্যোগই সে অর্জনের কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারেনি।
ভূমি খাতে স্বচ্ছতা জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, অভিজাত এলাকায় এক কাঠা জমির দাম ১০-২০ কোটি টাকা হলেও রেজিস্ট্রির সময় প্রকৃত মূল্য দেখানো হয় না। এতে বিপুল পরিমাণ কালো টাকা তৈরি হয়। এটি বন্ধ করতে পারলে রাজস্ব আয় ব্যাপকভাবে বাড়বে।
সময়ের আলো/এমএইচ