নতুন বাংলাদেশে যেসব বিষয়ে সংস্কার অতি জরুরি তার মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থা অন্যতম। বিগত সরকারের আমলে শিক্ষাব্যবস্থায় খুবই খারাপ একটি সিদ্ধান্ত ছিল দলীয় বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারিকরণ। শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি ও বৈষম্য দূরীকরণের জন্য প্রয়োজন ছিল বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণের মাধ্যমে সবস্তরের শিক্ষকদের জন্য সমঅধিকার নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রব্যবস্থায় টেকসই উন্নয়ন করতে হলে সমৃদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন। আর শিক্ষক সমাজকে ভুখা রেখে সমৃদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। যতদিন পর্যন্ত শিক্ষকদের অর্থনৈতিকভাবে সুরক্ষিত করা সম্ভব হবে না ততদিন পর্যন্ত মানসম্মত সুশিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
শিক্ষক হলো মানবসভ্যতাকে শানিত করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। আর এ কারণেই আমরা বলি শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন শিক্ষকরা। শিক্ষার মাধ্যমে মানব সন্তানের অন্তর্নিহিত গুণাবলি ও সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটে। শিক্ষার্থীদের মনোজগতের সুপ্ত গুণাবলিকে বিকশিত করতে অনুসন্ধিৎসু পথে পরিচালিত করে শিক্ষক। শিক্ষকের শিক্ষণ প্রবাহ দ্বারা উৎকর্ষতার পথে সঞ্চালিত হয় শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীদের সামনে শিক্ষক যেভাবে জ্ঞানের অবতারণা ঘটান পরবর্তী জীবনে সেভাবেই শিক্ষার্থীদের মানসিকতা গড়ে ওঠে। তাই জ্ঞান-বিজ্ঞানে আধুনিক ও সভ্য জাতি গঠনে সুশিক্ষা প্রদান গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীর ভেতরের গুণাবলিকে বিকশিত করা। নানা কারণে আমরা সেই উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হচ্ছি। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে শিক্ষার উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুতি যাতে না ঘটে সেই হিসেবে কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা। রাষ্ট্র শিক্ষাকে কতখানি গুরুত্ব দিচ্ছে তা শিক্ষকদের বেতন কাঠামোর ওপর চোখ দিলেই বোঝা যায়। দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সুশিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর ওপর আর সেই জনগোষ্ঠী তৈরির কারিগরদের অভুক্ত থাকতে হয়। ভবিষ্যৎ নাগরিকদের কথা চিন্তা করে শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষক সমাজের জীবনমান উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ নিতে হবে।
নাগরিকদের কল্যাণে রাষ্ট্র প্রাথমিক শিক্ষাকে ইতিমধ্যেই বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করেছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরেও শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে প্রণোদনামূলক নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। দেশ উন্নয়নের তথাকথিত মহাসড়কে উঠলেও অবহেলার সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক সমাজ। আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক সমাজ। শিক্ষা খাতে তাদের অবদানকে ন্যূনতম গুরুত্ব দেয়নি রাষ্ট্র। জাতীয় বেতন স্কেলের শুধু মূল বেতন পেয়ে খুবই অসহায়ত্বের নিরীহ ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা। দীর্ঘকাল ধরেই পদে পদে বঞ্চিত করা হচ্ছে দেশগড়ার কারিগরদের। অর্থের মানদণ্ডেই জগতের প্রায় সবকিছু মূল্যায়ন করা হয়। শিক্ষক সমাজের মূল্যায়নও এই মানদণ্ডের বাইরে নয়। অথচ স্নাতক সম্পন্ন করে এবং শিক্ষকতার প্রতিযোগিতামূলক পেশাগত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জাতীয় মেধাতালিকায় স্থান লাভ করে মাধ্যমিক স্তরে নিয়োগপ্রাপ্ত বাংলাদেশের একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষকের প্রারম্ভিক বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা মাত্র। একজন নতুন শিক্ষকের চাকরির শুরুর বেতন দেখলেই বোঝা যায় শিক্ষকরা হচ্ছেন বাংলাদেশের সবচেয়ে বঞ্চিত ও নিরীহ জনগোষ্ঠী।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বেতন-ভাতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শিক্ষকরা সবচেয়ে পিছিয়ে। এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন দেশের শিক্ষকদের বেতনের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় যুদ্ধবিধ্বস্ত কয়েকটি দেশ ছাড়া প্রায় সব দেশের শিক্ষকের বেতন বাংলাদেশের তুলনায় বেশি।
প্রতিবেশী দেশ ভারতের শিক্ষকদের বেতন কাঠামো বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ ও মাদরাসায়। দেশে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৩৩ হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ৩ লাখ ৯৮ হাজার ৬৮ জন। যারা মান্থলি পে-অর্ডার বা মাসিক বেতন আদেশের মাধ্যমে সরকারের কাছ থেকে বেতন পেত। কিন্তু এই বেতন প্রাপ্তির জন্য যে বেতন তালিকা তৈরি করতে হতো সেখানে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতির স্বাক্ষর প্রয়োজন হতো। এ বিষয়টি নিয়ে প্রায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা ভোগান্তির শিকার হতেন। সেই ভোগান্তি থেকে মুক্তি লাভের জন্য গত বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবসে ইলেক্ট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার পদ্ধতিতে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়ার ঘোষণা দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু গত জানুয়ারি থেকে বেতন-ভাতা প্রাপ্তি সহজিকরণের লক্ষ্যে শুরু হওয়া ইলেক্ট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার পদ্ধতি স্কুল-কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেকায়দায় ফেলেছে। দ্রুত সময়ে ও ঝামেলামুক্তির বদলে এখন বেতন পাওয়া নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েছেন লাখ লাখ শিক্ষক। মে মাসের ২২ তারিখ অতিক্রম হয়ে গেলেও এপ্রিল মাসের বেতন এখনও পর্যন্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রদান করা হয়নি। শুনতে অপ্রিয় হলেও সত্য যে স্বাধীনতার ৫৪ বছরে রাজনৈতিক দল ও ক্ষমতাসীনদের উদাসীনতা-দুর্নীতির কারণে শিক্ষাকাঠামো ক্রমশ ভেঙে পড়েছে। স্কুল-কলেজ ও মাদরাসায় এনটিআরসিএ কর্তৃক শিক্ষক নিয়োগে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও এমপিও করতে গিয়ে প্রায়ই চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নতুন শিক্ষকদের। রাষ্ট্র ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান এসব অনাচার ও বৈষম্য দূরীভূত করতে জনগণকে আশার আলো দেখিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। দেশের শিক্ষক সমাজ আশায় বুক বেঁধে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিল যে এবার শিক্ষক সমাজের দীর্ঘদিনের অচলায়তন ভাঙবে।
শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির জন্য আন্দোলন করতে হচ্ছে। বিষয়টি জাতিগতভাবে দুঃখের। শতভাগ ঈদ বোনাসের জন্য মাসের পর মাস রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের বারান্দায় শিক্ষক-কর্মচারীরা অবস্থান করেও পাচ্ছে না যথাযথ ন্যায্য সম্মান ও অধিকার। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে চলমান আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে উৎসব ভাতা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব পাঠায়।
১৫ এপ্রিল অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বাজেট মনিটরিং ও সম্পদ কমিটির সভায় এই প্রস্তাবে সম্মতি দেওয়া হয় যা আসন্ন ঈদুল আজহা থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় একবিংশ শতাব্দীতে এসেও জাতি গঠনের কারিগরদের জন্য ঈদ বোনাস মূল বেতনের ৫০ শতাংশ করা হঠকারী সিদ্ধান্ত নয় কি? এর চেয়েও লজ্জাকর বিষয় হলো- দুর্মূল্যের এই বাজারে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয় ১ হাজার টাকা মাত্র! এনটিআরসিএ কর্তৃক শিক্ষক নিয়োগে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে বাড়ি থেকে শত শত মাইল দূরে ১ হাজার টাকায় বাড়ি ভাড়া পাওয়া যে অসম্ভব একটা বিষয়, বিগত সরকার বোঝার সামান্যতম চেষ্টাও করেনি। শুধু তাই নয়, স্কুল-কলেজ, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকদের চরম বৈষম্যের জালে বেঁধে রাখা হয়েছে পদোন্নতিতেও। রাষ্ট্রব্যবস্থা বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক সমাজকে কতটা অবহেলার চোখে দেখে তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত হলো- অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট নামক দুটি প্রতিষ্ঠান। বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মূল বেতন থেকে প্রতি মাসে ১০ শতাংশ অর্থ কর্তন করে রাখা হয় এই প্রতিষ্ঠান দুটির জন্য। সেই অর্থ দিয়ে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের এককালীন অবসর সুবিধা বাবদ অর্থ প্রদান করা হয়। কিন্তু অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের এই টাকা প্রাপ্তিতে কত কষ্ট!
বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবসর সুবিধাপ্রাপ্তি হলো- ঘরের চাবি পরের হাতে থাকার মতো অবস্থা। বাংলাদেশে আর কোনো পেশাজীবীকে এভাবে নিজের বেতনের টাকা রাষ্ট্রকে দিয়ে যথাসময়ে প্রাপ্তিতে ভুগতে হয় বলে মনে হয় না। সম্প্রতি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক শিক্ষা ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ মন্তব্য করেন যে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য জমানো ৬ হাজার কোটি টাকা যে ব্যাংকে রাখা হয়েছিল, সেটি দেউলিয়া হওয়ায় শিক্ষকদের সঞ্চয়ের কোনো টাকা এখন আর নেই। বিগত কয়েক বছর ধরে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে নেওয়া হলেও সে টাকাও শিক্ষক-কর্মচারীদের পেনশন হিসেবে বিতরণ করা হয়নি।
নতুন বাংলাদেশে যেসব বিষয়ে সংস্কার অতি জরুরি তার মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থা অন্যতম। বিগত সরকারের আমলে শিক্ষাব্যবস্থায় খুবই খারাপ একটি সিদ্ধান্ত ছিল দলীয় বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারিকরণ। শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি ও বৈষম্য দূরীকরণের জন্য প্রয়োজন ছিল বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণের মাধ্যমে সবস্তরের শিক্ষকদের জন্য সম-অধিকার নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রব্যবস্থায় টেকসই উন্নয়ন করতে হলে সমৃদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন।
আর শিক্ষক সমাজকে ভুখা রেখে সমৃদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। যতদিন পর্যন্ত শিক্ষকদের অর্থনৈতিকভাবে সুরক্ষিত করা সম্ভব হবে না ততদিন পর্যন্ত মানসম্মত সুশিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থার অপরিহার্য পূর্বশর্ত হচ্ছে শিক্ষায় জাতীয়ভাবে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ। জাতীয় বাজেটের প্রতিটি অর্থবছরেই শিক্ষা খাত অতি অবহেলার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে টেকসই অগ্রযাত্রায় সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে শিক্ষকদের উপেক্ষা করে মানসম্মত শিক্ষা অর্জনের অপচেষ্টা। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে টিকে থাকতে হলে শিক্ষার্থীদের সৃষ্টিশীল করে গড়ে তুলতে হবে, তার জন্য শিক্ষার ধরন পরিবর্তন করতে হবে। এ জন্য শিক্ষায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থাকে বিশ্বমানের করে তুলতে হবে। এর জন্য অবশ্যই স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে শিক্ষকদের বেতন অনেক আকর্ষণীয় হতে হবে। ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা শিক্ষকতার পেশা বেছে নিতে উৎসাহী হবে। শিক্ষক সমাজকে অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত করে উন্নত রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব নয়। যে শিক্ষকের পুরো কর্মজীবনটাই রাষ্ট্রের একটি সম্পদ, সেই সম্পদকে কাজে লাগাতে না পারলে এর ব্যর্থতার দায়ভার কার?
সময়ের আলো/এমএইচ