এ ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের কোনো বিকল্প নেই। আসুন সবাই সুস্থ থাকার জন্য সতর্ক থাকি। মশাবাহিত এই রোগ নিয়ন্ত্রণে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে সচেতনতা তৈরিতে (অ্যাওয়ারনেস) ক্যাম্পেইন, মশার বংশবিস্তারের স্থান নির্মূল ও লার্ভা নিধন। তা ছাড়া বয়স ও এলাকা ভিত্তিতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী এবং এতে মৃত্যু তথ্য শ্রেণিবিন্যাস করছে সরকার। দেশজুড়ে ডেঙ্গু রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য সব হাসপাতালে আলাদা ইউনিট করা হয়েছে। এরপরও ডেঙ্গু মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। গুরুতর এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দফতরের সমন্বিত প্রচেষ্টা জরুরি।
ফের ডেঙ্গু সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের প্রায় ৬০টি জেলায় এটির প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি দেখা দিয়েছে বরিশাল বিভাগে। গত দুদিনেই দেশে ডেঙ্গুতে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং এক দিনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে প্রায় ২০০ রোগী। গতকাল মৃত্যু হয়েছে একজন। সে চট্টগ্রাম বিভাগের লোক। দেশে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার রোগী। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৩৬৪ জন। অর্থাৎ মোট আক্রান্তের ৪৪ শতাংশ এই বিভাগে। এর মধ্যে বরগুনা জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। ডেঙ্গু একটি মশাবাহিত রোগ ও বর্তমানে এক আতঙ্কের নাম। এ বছরের জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২৩ জন। এর মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ ঢাকা বিভাগে মারা গেছেন ১৫ জন। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের হাসপাতালগুলোতে মৃত্যু হয়েছে ১৩ জন।
সারা দেশে গত বছরের তুলনায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। ঢাকা মহানগরীতে মশার দাপট এখন আর ঋতুভিত্তিক কোনো বিষয় নয়, বরং বছরজুড়ে চলমান এক নাগরিক সংকটে রূপ নিয়েছে। দিনের বেলায় ডেঙ্গু রোগবাহী এডিস, আর সন্ধ্যার পর কিউলেক্সের আক্রমণে অতিষ্ঠ নগরবাসী। বাড়ছে ডেঙ্গু সংক্রমণের সংখ্যা। রাজধানীবাসীর অভিযোগ, প্রতিদিন ঘরে-বাইরে মশার কামড়ে শিশু-বৃদ্ধসহ সব বয়সি মানুষ জ্বর, চুলকানিসহ আরও কিছু রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। ফলে একদিকে ডেঙ্গু আতঙ্ক, অন্যদিকে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা হয়ে উঠেছে অস্বস্তির।
স্ত্রী এডিস মশার কামড়ে এ রোগ হয়। ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এই রোগের জীবাণুর নাম ডেঙ্গু ভাইরাস। এই ভাইরাসের চারটি প্রজাতি আছে। চার ধরনের ভাইরাসের কারণে একজন মানুষের একাধিকবার ডেঙ্গু আক্রান্তের আশঙ্কা থাকে। দ্বিতীয়বার আক্রান্তদের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে পারে। এ রোগের একমাত্র ধারক হচ্ছে মানুষ। স্ত্রী জাতীয় এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে এ রোগ বিস্তার লাভ করে। সাধারণত দিনের বেলায় এ মশা কামরায়। নারী এডিস মশা আক্রান্ত মানুষের শরীর থেকে রক্ত নিয়ে এ রোগ ছড়ায়। ডেঙ্গু রোগের জীবাণু আক্রান্ত নারী মশার শরীরে ১০-১৫ দিন সুপ্ত অবস্থায় থাকে। তা পরবর্তীতে কামড়ের মাধ্যমে অন্য মানুষকে আক্রান্ত করে। আমাদের দেশে সাধারণত বর্ষাকাল ও বর্ষা-পরবর্তী মৌসুমে এ রকম পরিবেশ বিরাজ করে। জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। এরা গাছের গর্তে, প্লাস্টিকের পাত্রে, বাঁশের কাণ্ডে, ডাবের খোসা ও জমে থাকা পানিতে সবচেয়ে বেশি ডিম পাড়ে। এদের ডিম শুকনো জায়গায় এক বছরের বেশি থাকে এবং পানির সংস্পর্শে এলে এরা দ্রুত বিস্তার লাভ করে। বিস্তার নির্ভর করে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার ওপর। সাধারণত ২৫-৩০ ডিগ্রি তাপমাত্রা এবং ৮০ শতাংশ আর্দ্রতায় ডেঙ্গুর জীবাণু বেশি বিস্তার লাভ করে।
১৯৭০ সালের পূর্বে বিশ্বজুড়ে মাত্র ৯টি দেশে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। কিন্তু বর্তমানে শতাধিক দেশে ডেঙ্গু রোগের প্রভাব দেখা যায়। বিগত ১০-১৫ বছর ধরে ডেঙ্গুর প্রভাব এবং হেমোরেজিক জ্বরের জন্য বেশ কিছুসংখ্যক মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং মারা যান। আমাদের দেশে প্রথম ডেঙ্গুর মহামারি হয়েছিল ২০০০ সালে। সে বছর ডেঙ্গু রোগে ৯৩ জন মানুষ মারা যান। ২০০২ সালে মারা যায় ৫৮ জন। ২০১৮ সালে সর্বমোট ১০ হাজার মানুষের বেশি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন। ২৬ জনের মৃত্যু হয়। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী ২০২৩ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত মোট ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল ৫১ হাজার ৮৩২ জন এবং মারা গেছে ২৫১ জন। আর দশটা ভাইরাস জ্বরের মতো ডেঙ্গু জ্বরও নিজে থেকে সাত দিনের মধ্যে সেরে যায়। কিন্তু ডেঙ্গুর সংকটকাল শুরু হয় জ্বর ছাড়ার পর ২৪-৪৮ ঘণ্টা। এ সময় হঠাৎ রক্তচাপ কমে যাওয়া ও অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্লিডিং, রক্তনালি থেকে জলীয় অংশ বের হয়ে রক্তচাপ কমে যাওয়া। এসব ক্ষেত্রে উপযুক্ত চিকিৎসা না দিলে মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে।চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জ্বরের এক দিন পরই পরীক্ষা করালে ভালো। জ্বরের চার-পাঁচ দিন পার হলে আইজিজি ও আইজিএম পরীক্ষা করাতে হবে। রোগীর জটিলতা হলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী অন্যান্য পরীক্ষারও করা দরকার হতে পারে। ডেঙ্গু উপসর্গ ও লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে শরীরের তাপমাত্রা ১০৪ থেকে ১০৫ এ উন্নীত হওয়া। মাথাব্যথা, মাংস পেশি ও চোখের পেছনে ব্যথা, পেটে ব্যথা এবং হাড়ে বিশেষ করে মেরুদণ্ডে ব্যথা। অরুচি ও বমি বমি ভাব ও বমি করা। চামড়ার নিচে রক্তক্ষরণ, চোখে রক্ত জমাট বাধা। লালচে/কালো রঙের পায়খানা, দাঁতের মাড়ি, নাক, মুখ ও পায়খানার রাস্তা দিয়ে রক্তপাত হওয়া। শরীরে হামের মতো দানা দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে জ্বর থেকে সেরে ওঠার সময় সতর্ক থাকতে হবে। কারণ এ সময়ই জটিলতাগুলো দেখা যায়। তাই জ্বর কমলেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছে এটি ভাবা যাবে না। কয়েক দিন অবশ্যই বিশ্রাম নেওয়া উত্তম। দ্রুত রোগ নির্ণয় ডেঙ্গু রোগের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা কিছু কিছু রোগী খুবই অল্প সময়ে অবস্থা খারাপ হয়ে মারা যেতে পারে। শনাক্ত হলে প্রাথমিকভাবে করণীয়ের মধ্যে রয়েছে বাসায় বিশ্রাম নেওয়া, ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল খাওয়া, তরল খাবার যেমন- স্যালাইন, ডাব, স্যুপ, ফলের জুস, দুধ খাওয়া। অন্যান্য খাবারও খাওয়া। দিনে কয়েকবার রক্তচাপ মাপা। প্রস্রাবের পরিমাণ লক্ষ করুন। যেহেতু ডেঙ্গু জ্বরের উৎপত্তি ডেঙ্গু ভাইরাসের মাধ্যমে এবং এই ভাইরাসবাহিত এডিস ইজিপ্টাই নামক মশার কামড়ে হয়ে থাকে। এই ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশা কোনো ব্যক্তিকে কামড়ালে সেই ব্যক্তি চার থেকে ছয় দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। এই আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো জীবাণুবিহীন এডিস মশা কামড়ালে সেই মশাটি ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। এভাবে একজন থেকে অন্যজনে মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়িয়ে থাকে। ডেঙ্গু ভাইরাস চার ধরনের হয়।
তাই ডেঙ্গু জ্বরও চারবার হতে পারে। তবে যারা আগেও ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে রোগটি হলে সেটি মারাত্মক হওয়ার ঝুঁকি শিশু-কিশোর, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী ও অন্যান্য ক্রনিক রোগ থাকলে বেশি সচেতন থাকতে হবে। জনমনে এই ডেঙ্গু সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করে দ্রুত শনাক্ত করে রোগের চিকিৎসা শুরু করা প্রয়োজন। তা হলে এই রোগের মৃত্যুর হার কমানো যাবে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রতিরোধ হিসেবে এ সময়ে ফুলহাতা জামা ও প্যান্ট পরিধান করা। ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করা (দিনে ও রাতে)। মশার কয়েল/অ্যারোসল ব্যবহার করা। রিপিলেন্ট ওয়েল ব্যবহার করা। বাড়ির ভেতর ফুলের টব এবং বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া। দরজা-জানালায় মশা প্রতিরোধক জাল লাগানো। ফুলের টব, প্লাস্টিকের পাত্র, ভাঙা হাঁড়ি-পাতিল, টিনের কৌটা, গাড়ির পরিত্যক্ত টায়ার, ভাঙা কলস, ড্রাম, নারিকেল এবং ডাবের খোসা, কনটেইনার, এয়ার কন্ডিশনার রেফ্রিজারেটরের তলায় পানি জমতে না দেওয়া। এদিকে সমন্বিতভাবে বাহক নিয়ন্ত্রণ হিসেবে এডিস মশার নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায় হলো লার্ভার উৎপত্তি রোহিতকরণ।
অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে প্রতিরোধ হিসেবে হাসপাতালে ভর্তি জ্বরে আক্রান্ত রোগীকে মশারি ব্যবহার করতে হবে। মশার লার্ভার জন্মস্থান ঘন ঘন পরিষ্কার করতে হবে। হাসপাতালের আন্তঃবিভাগ ও বহির্বিভাগে নিয়মিত ফগিং করতে হবে। সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে রোগীর প্রতিবেদন পাঠাতে হবে। সামাজিক পর্যায়ে প্রতিরোধের জন্য মানুষের মাঝে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। মশা নিধনে সামাজিক আন্দোলনও গড়ে তুলতে হবে। মশা নিধনে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রচার চালানো যেমনÑরেডিও, টেলিভিশনে প্রচার, মাইকিং, পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন ইত্যাদি। আমাদের সবাইকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে ডেঙ্গু রোগ পরিস্থিতিতে ইদানীং উপসর্গের ধরন পাল্টে আমাদের আক্রান্ত করছে।
এ ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের কোনো বিকল্প নেই। আসুন সবাই সুস্থ থাকার জন্য সতর্ক থাকি। মশাবাহিত এই রোগ নিয়ন্ত্রণে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে সচেতনতা তৈরিতে (অ্যাওয়ারনেস) ক্যাম্পেইন, মশার বংশবিস্তারের স্থান নির্মূল ও লার্ভা নিধন। তা ছাড়া বয়স ও এলাকা ভিত্তিতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী এবং এতে মৃত্যু তথ্য শ্রেণিবিন্যাস করছে সরকার।
দেশজুড়ে ডেঙ্গু রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য সব হাসপাতালে আলাদা ইউনিট করা হয়েছে। এরপরও ডেঙ্গু মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। গুরুতর এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দফতরের সমন্বিত প্রচেষ্টা জরুরি। সরকারের যেসব প্রতিষ্ঠান বা যারা এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছে তাদেরকে চাকরি নয় বরং সেবার মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে। কোনো ভূখণ্ডে যদি একবার ডেঙ্গু দেখা দেয় তবে সেটিকে পুরোপুরিভাবে নির্মূল করার কোনো উপায় নেই। বড়জোর নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আর এই নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায় হলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন।
সময়ের আলো/এমএইচ