ইরান-ইসরায়েল সংঘাত : কারণ ও প্রভাব

মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন

সম্পাদকীয়

ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের কিং তথা রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল নিজেকে অদ্বিতীয় শক্তি হিসেবে দেখতে চায়। সেখানে তারা

2025-06-20T05:45:25+00:00
2025-06-20T05:45:25+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬,
৪ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
সম্পাদকীয়
ইরান-ইসরায়েল সংঘাত : কারণ ও প্রভাব
মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন
প্রকাশ: শুক্রবার, ২০ জুন, ২০২৫, ৫:৪৫ এএম   (ভিজিট : ৫৮৫৯)
ছবি : সময়ের আলো
ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের কিং তথা রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল নিজেকে অদ্বিতীয় শক্তি হিসেবে দেখতে চায়। সেখানে তারা ইরানকে সবচেয়ে ঘোরতর শত্রু মনে করে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের যেকোনো উত্থান ইসরায়েল মেনে নিতে চায় না। ইসরায়েল চায় ইরান সামরিক শক্তিতে যাতে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। তাই তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বা পরমাণু বোমা তৈরির সক্ষমতা অচিরেই সমূলে ধ্বংস করতে চায়। এ জন্য সাম্প্র্রতিক চলমান আগ্রাসী হামলার মাধ্যমে তারা ইরানকে এই কর্মসূচি থেকে বাধ্য করবে বলে মনে হচ্ছে। এ অবস্থা সৃষ্টি হলে আরব দেশের রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হবে। রাষ্ট্র হিসেবে ইরানের সামরিক ও ভূরাজনৈতিক শক্তির কোমর ভেঙে দেওয়া হবে। শিয়া মতাদর্শে বিশ্বাসী লেবাননের কট্টর ইসরায়েলবিরোধী সংগঠন হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেতে পারে।

১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নেতৃত্বে ইরানে ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হয়। এই মহাবিপ্লবের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে পশ্চিমা বলয় থেকে মুক্ত করা। ১৭৮৯ সালে সংঘটিত ফরাসি বিপ্লবের পর ইতিহাসে অন্যতম সফল বিপ্লব হিসেবে গণ্য করা হয় এই মহান বিপ্লবকে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সমর্থিত স্বৈরশাসক রেজা শাহ পাহলভি পরাজিত হয়ে নির্বাসিত হন। রেজা শাহ পাহলভি মূলত পশ্চিমাঘেঁষা শাসক ছিলেন। তার আমলে ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সখ্য ছিল বেশ ভালো। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মিসরের পর দ্বিতীয় দেশ হিসেবে ইরান ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়; যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অবস্থানে ইসরায়েলের জন্য ব্যাপক টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে। বিপ্লব-পরবর্তীতে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মদদপুষ্ট ইরানি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ইরানি বিপ্লবীদের দীর্ঘ ত্যাগ ও জীবন বলিদানের ফসল। খামেনি প্রশাসন ক্ষমতাসীন হওয়ার পর পশ্চিমাবলয়ের বাইরে অবস্থান করে নানা সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করেন। এর মধ্যে অন্যতম বিষয় ছিল পশ্চিমাদের গৃহীত নীতি বর্জন করা এবং ইরানকে ইসলামিক রিপাবলিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। খামেনি প্রশাসন ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্কছেদ করেন এবং ইসরায়েলকে দেওয়া ঐতিহাসিক স্বীকৃতি বাতিল করেন। তখন থেকে ইরান-ইসরায়েল-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ দেখা দেয়।

নবগঠিত রাষ্ট্রটিকে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ১৯৮০ সালে ইরাক কর্তৃক ইরানে হামলা, যা উদীয়মান নতুন রাষ্ট্রটি কিছুটা বাধাগ্রস্ত করে। নবগঠিত রাষ্ট্রটি কালের পরিক্রমায় মার্কিন-ইসরায়েলের বৈরিতার মাঝে নিজেদের সামরিক দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে থাকে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সামরিক কৌশলে বিশ্বের অপরাপর দেশের সঙ্গে পাল্লা দিতে থাকে। ইতিমধ্যে ইরান পারমাণবিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে নিজেদের দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধি করতে থাকে। এই সামরিক সামর্থ্য যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল এবং তার মিত্রদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই দীর্ঘ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার সহযোগীরা ইরানকে থামানোর জন্য আন্তর্জাতিক মহলে নানা কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে থাকে। এরই অংশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথমেই আরব বিশ্বকে করায়ত্ত করে ফেলে। মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে কার্যত ইরানকে আরব দেশগুলো থেকে একঘরে করে ফেলে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে আরবদের মধ্যে বিবদমান বিভিন্ন সংঘাত এবং শিয়া-সুন্নি মতাদর্শ দ্বন্দ্বের কারণে ইরান বিভিন্ন যুদ্ধে জড়িয়ে অনেক আরব দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া আরব এবং মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষায় আরব লিগ ও ওআইসি প্রতিষ্ঠিত হলেও নানা সমস্যার কারণে এই সংস্থাগুলো কার্যত অচল ও ব্যর্থতার পরিচয় বহন করে। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার অকৃত্রিম বন্ধু ইসরায়েলের মাধ্যমে ইরানে বিভিন্নভাবে অভিযান চালায়। বিষয়টি শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ইউরোপীয় মিত্রদের নিয়ে ইরানের ওপর বিভিন্ন সময়ে নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে ইরানের উদীয়মান অর্থনীতিকে বাধাগ্রস্ত করে। এরই মধ্যে ইসরাইল সামরিকভাবে খুবই দক্ষতা ও সমৃদ্ধি অর্জন করে।

ইসরায়েল ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত মোসাদকে ব্যাপকভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে বিভিন্ন অভিযানে প্রেরণ করে। ২০২০ সালের ৩ জানুয়ারি ইরানের শীর্ষস্থানীয় সামরিক কর্মকর্তা কাসেম সুলাইমানি মোসাদ ও এফবিআইর পরিকল্পিত ও নিখুঁত নিশানায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। তা ছাড়া গত বছর ইরানের প্রেসিডেন্ট ইবরাহিম রাইসি বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পেছনে মোসাদের হাত রয়েছে বলে জানা যায়। এভাবে ইসরায়েল বিপ্লবোত্তর ইরানের অভ্যন্তরে নানাভাবে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করে। সম্প্রতি ইসরাইল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সামরিক সহযোগিতা পেয়ে ইরানের ওপর আক্রমণ করে বসে। ইরানও তার পাল্টা জবাব দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধ কি শেষ হবে?

ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের কিং তথা রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল নিজেকে অদ্বিতীয় শক্তি হিসেবে দেখতে চায়। সেখানে তারা ইরানকে সবচেয়ে ঘোরতর শত্রু মনে করে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের যেকোনো উত্থান ইসরায়েল মেনে নিতে চায় না। ইসরায়েল চায় ইরান সামরিক শক্তিতে যাতে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। তাই তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বা পরমাণু বোমা তৈরির সক্ষমতা অচিরেই সমূলে ধ্বংস করতে চায়। এ জন্য সাম্প্র্রতিক চলমান আগ্রাসী হামলার মাধ্যমে তারা ইরানকে এই কর্মসূচি থেকে বাধ্য করবে বলে মনে হচ্ছে।

এ অবস্থা সৃষ্টি হলে আরব দেশের রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হবে। রাষ্ট্র হিসেবে ইরানের সামরিক ও ভূরাজনৈতিক শক্তির কোমর ভেঙে দেওয়া হবে। শিয়া মতাদর্শে বিশ্বাসী লেবাননের কট্টর ইসরায়েল বিরোধী সংগঠন হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে কট্টর ইহুদিবাদের ব্যাপক প্রভাব পড়বে। তুরস্ক, সিরিয়া, মিসরসহ আরব দেশগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে প্রকাশ্যে সম্পর্ক গড়তে বাধ্য হবে। আমেরিকার মিত্র আরব দেশগুলোর প্রতি ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের চাপ সৃষ্টি হবে। ইরানকে সবদিক থেকে কোণঠাসা করা হলে কার্যত ইসরায়েল আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠবে। মধ্যপ্রাচ্যে একক আধিপত্য বিস্তার করবে তারা। আরব দেশগুলো অচিরেই আরও বেশি নুয়ে পড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক দেশগুলো নিজেদের গদি সুসংহত করতে ইসরায়েলের সঙ্গে আঁতাত করবে। মুসলমানদের স্বপ্নের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব তাদের হাতে অচিরেই বিলীন হয়ে যাবে।

সময়ের আলো/এমএইচ


Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: