আমেরিকান প্রেসিডেন্টের নতুন শুল্কনীতি ঘোষণার (গত এপ্রিলে) পর নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে ওয়াশিংটনের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বৈঠক করছে বাংলাদেশ। যার ধারাবাহিকতায় চলমান সপ্তাহেও ওয়াশিংটনে বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বাংলাদেশি পণ্যের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের জেরে বাংলাদেশ ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পক্ষে প্রস্তাব দিয়েছে। এরই মধ্যে সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টাকে এক চিঠিতে জানান যে আগামী ১ আগস্ট থেকে ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ হবে। তবে অর্থ উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি চূড়ান্ত নয়। বুধবারের বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মঙ্গলবার (৮ জুলাই) সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত ৩৫ শতাংশ শুল্ক চূড়ান্ত নয়। ওয়ান টু ওয়ান নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে এটা ঠিক হবে। এই ইস্যুতে আগামীকাল (বুধবার) ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দফতরের (ইউএসটিআর) কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রতিনিধিদের বৈঠক হবে। ওখানে আমাদের বাণিজ্য উপদেষ্টা আছেন। উনি ৩ দিন আগে গেছেন। আজকেই (মঙ্গলবার) কমার্স টিম যাচ্ছে। ৮ তারিখে মিটিং। ওদের ৮ তারিখ মানে কালকে খুব ভোরবেলা। মিটিংয়ের পর আমরা বুঝতে পারবো। কারণ, যেটা দিয়েছে, সেটা ঠিক অফিসিয়াল।
ইউএসটিআর’র সঙ্গে বাণিজ্য উপদেষ্টার বৈঠক হবে। কালকের (বুধবার) পর আপনারা বুঝতে পারবেন। আমরা আশা করি, যাই হোক, সেটার পরিপ্রেক্ষিতে অন্য পদক্ষেপগুলো নেবো। এখন বৈঠকটা মোটামুটি পজিটিভ।
সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন রাখা হয় যে চিঠি তো ইতোমধ্যে ইস্যু হয়ে গেছে, এর জবাবে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট দিয়েছেন কিন্তু এটা ওয়ান টু ওয়ান নেগোসিয়েশনে ঠিক হবে। চিঠি তো বহু আগে দিয়ে দিতো, ৩৫ শতাংশ। এটা আবার ১৪টা দেশের জন্য বলছে একই। কিন্তু ওয়ান টু ওয়ান নেগোসিয়েশন হবে, সেজন্যই তো ইউএসটিআর’র সঙ্গে কথা বলা। এটা ফাইনাল (ট্রাম্পের চিঠি) নয়। চিঠিতে যে সব কন্ডিশন দেওয়া হয়েছে এগুলো কি ফুলফিল করা সম্ভব? সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এখনই আমি কিছু বলতে পারবো না।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম মঙ্গলবার ফেসবুকে বলেন, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি এমন শুল্ক চুক্তির প্রত্যাশা করছে যা উভয় দেশের জন্য লাভজনক হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরেক দফা আলোচনা ৯ জুলাই (বুধবার) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন বর্তমানে ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থান করছেন এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য আলোচনা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানও এই দলে রয়েছেন। সোমবার বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি চিঠি পেয়েছে, যাতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ১ আগস্ট থেকে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে। বাংলাদেশ দল এরইমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনা করেছে। ৯ জুলাইয়ের আলোচনায় বাংলাদেশের পক্ষের নেতৃত্ব দেবেন শেখ বশিরউদ্দিন।
জানা গেছে, বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টাকে গত সোমবার দেওয়া চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, আমরা আপনাদের বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে আগামী বহু বছর একসঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। আপনি যদি আপনার এখনো বন্ধ থাকা বাণিজ্য বাজার যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খুলে দিতে চান, এবং আপনার শুল্ক, অশুল্ক নীতিমালা ও বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা তুলে দেন, তাহলে আমরা সম্ভবত এই চিঠির বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করতে পারি। এই শুল্কহার বাড়ানো বা কমানো যেতে পারে, যা বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ওপর নির্ভর করবে। আপনি কখনোই যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা হতাশ হবেন না। ২০২৫ সালের ১ আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের যেকোনো পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করবে, যা সব খাতভিত্তিক শুল্কহার থেকে আলাদা হবে। শুল্ক এড়াতে ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে পাঠানো পণ্যের ওপর উচ্চতর শুল্কহার প্রযোজ্য হবে। একটি জিনিস পরিষ্কার হতে হবে, ৩৫ শতাংশ শুল্কহারটি আমাদের দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির বৈষম্য দূর করার জন্য যথেষ্ট নয়। আপনি জানেন, যদি বাংলাদেশ বা বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য তৈরি বা উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে আমরা দ্রুত, পেশাদার ও নিয়মিত পদ্ধতিতে সব অনুমোদন দিতে সম্ভাব্য সবকিছু করব, অর্থাৎ, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই।
ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তজা ফেসবুকে বুধবার বলেন, ৩৫ শতাংশ, চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নয়। আলোচনা চলমান। ৯ জুলাই পরবর্তী আলোচনার তারিখ। ভালো কিছুর জন্যে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে এবং সেই সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আমেরিকান প্রেসিডেন্টের নতুন শুল্কনীতি ঘোষণার পর নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে শুরু করে বাণিজ্য, অর্থ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট উইংগুলো ধারাবাহিকভাবে ওয়াশিংটনের নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠক করছে। শুরুতে গত এপ্রিলেই বাণিজ্য উপদেষ্টা ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করে এই ইস্যুতে পরামর্শ নিয়েছেন। সর্বশেষ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান বর্তমানে ওয়াশিংটনে অবস্থান করে এই ইস্যুতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করছেন।
সময়ের আলো/জেডআই