মানব সমাজে যুগে যুগে কিছু নেতিবাচক মানসিকতা মানুষকে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করেছে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গুজব, কুসংস্কার ও অজ্ঞতা। এই তিনটি সামাজিক ব্যাধি মানুষের চিন্তা-চেতনা, জীবনযাত্রা ও বিশ্বাসকে প্রভাবিত করে, কখনো সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং কখনো মানুষকে শিরক, বিদআত ও কুফরির দিকে ধাবিত করে। ইসলাম যেটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা, এই গুজব, কুসংস্কার ও অজ্ঞতাকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং যুক্তি, প্রমাণ ও ঈমানভিত্তিক জ্ঞানচর্চার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। গুজব হলো মিথ্যা বা ভিত্তিহীন সংবাদ, যা মানুষ না জেনে না বুঝে প্রচার করে।
মানুষ জ্ঞানচর্চার মাধ্যমেই সভ্য হয়েছে। ইতিহাসে প্রত্যক্ষ দেখা যায়-যেখানে জ্ঞান, বিচার ও বিবেকের চর্চা থেমে গেছে, সেখানে গুজব, কুসংস্কার ও অজ্ঞতা দখল নিয়েছে। সমাজে যখন প্রকৃত জ্ঞান ও ইসলামি চেতনা দুর্বল হয়ে যায়, তখন সেখানে অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও গুজবের মতো অন্ধবিশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে।
বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে গুজব আরও দ্রুত ছড়াচ্ছে; গুজব সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ায়, কুসংস্কার ঈমান ও আকিদার ক্ষতি করে, এটি সমাজে চালু থাকায় মানুষ হারায় যুক্তিবোধ; আর অজ্ঞতা মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং ইসলামবিমুখ করে। এ সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র পথ ইসলামের নির্ভুল ও আলোকিত দিকনির্দেশনা।
মানব সমাজে যুগে যুগে কিছু নেতিবাচক মানসিকতা মানুষকে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করেছে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গুজব, কুসংস্কার ও অজ্ঞতা। এই তিনটি সামাজিক ব্যাধি মানুষের চিন্তা-চেতনা, জীবনযাত্রা ও বিশ্বাসকে প্রভাবিত করে, কখনো সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং কখনো মানুষকে শিরক, বিদআত ও কুফরির দিকে ধাবিত করে। ইসলাম যেটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা, এই গুজব, কুসংস্কার ও অজ্ঞতাকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং যুক্তি, প্রমাণ ও ঈমানভিত্তিক জ্ঞানচর্চার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। গুজব হলো মিথ্যা বা ভিত্তিহীন সংবাদ, যা মানুষ না জেনে না বুঝে প্রচার করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের জিহ্বা দিয়ে তা গ্রহণ করছিলে এবং তোমরা এমন কথা বলছিলে, যার কোনো জ্ঞান তোমাদের ছিল না’। (সুরা নূর : ১৫)
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে গুজব এক অদৃশ্য ভাইরাসে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক কিছু গুজব যেমন, ‘পাহাড় কেটে স্বর্ণ পাওয়া যাচ্ছে’, ‘বাচ্চা ধরা দল এসেছে’, ‘ওষুধে সাপের বিষ আছে’-এসবের ফলে লোকজন আতঙ্কে পড়ে, নিরপরাধ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা পর্যন্ত করেছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি যা শুনে, তাই বলে বেড়ায়, সে মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫)। অতএব, সত্য যাচাই না করে কোনো সংবাদ ছড়ানো ইসলামে মারাত্মক অপরাধ। কুসংস্কার হলো বুদ্ধিবৃত্তি ও শরিয়তবিরোধী অন্ধ বিশ্বাস। যেমন : ‘নজর লেগে গেলেই দুর্ঘটনা হবে’, ‘কাক ডাকা মানেই অমঙ্গল’, ‘কালো বিড়াল পথ পার হলে বিপদ আসবে’, ‘গণক/ফকির হাত দেখে ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারে’ এসবই কুসংস্কার। ইসলামে কুসংস্কার নিষিদ্ধ। হাদিসে এসেছে, ‘সংক্রমণ (অর্থাৎ নিজের ইচ্ছায় ছড়ানো), অশুভ লক্ষণ, অলৌকিক পাখি ও নির্দিষ্ট মাসের অমঙ্গল, এসবের কোনো ভিত্তি নেই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৭০৭)
অর্থাৎ কাক ডাকা অমঙ্গলের লক্ষণ, নববর্ষে না খেলে সারা বছর কষ্টে কাটবে, ফল খারাপ আসবে, দৈব সংকেত পেলাম এসব ভ্রান্ত বিশ্বাস ইসলামে নেই। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি অশুভ লক্ষণের কারণে কোনো কাজ থেকে বিরত থাকে, সে শিরক করল’ (আহমাদ, হাদিস : ৯৭৫২)। তাই গৃহে বা সমাজে প্রচলিত কুসংস্কারগুলো বর্জন করে ঈমানি বিশ্বাসে দৃঢ় থাকতে হবে।
ইসলামে জ্ঞানকে আল্লাহর দান এবং অজ্ঞতাকে ধ্বংসের কারণ বলা হয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান’ (সুরা যুমার : ৯)? আর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক মুসলিমের ওপর জ্ঞান অর্জন করা ফরজ’ (ইবনু মাজাহ, হাদিস : ২২৪)। অজ্ঞতা মানুষকে ভুলপথে পরিচালিত করে।
যে সমাজে ইসলামি জ্ঞানের অভাব থাকে, সেখানে কুসংস্কার ও গুজব সহজে বিস্তার লাভ করে। যেমন-কেউ ভাবে, ‘বেশি বেশি সুরা পড়লে ব্যবসায় ক্ষতি হয়/দুঃখ বাড়ে’। কেউ বিশ্বাস করে, ‘বৃষ্টির পানি পাথরের সঙ্গে রাখলে বাচ্চার মুখ ফর্সা হয়।’ কেউ বলে, ‘বিষয়টি হাদিসে নেই’ অথচ তাকে হাদিস পড়তে দেখা যায় না! এসবই অজ্ঞাতপ্রসূত কথা। এমন অজ্ঞতাই মানুষকে গোমরাহির দিকে টেনে নেয়। ইমাম ইবনুল কাইয়ুম (রহ.) বলেন, ‘সবচেয়ে ভয়াবহ বিপদ হলো অজ্ঞতা, আর নিজেকে জ্ঞানী মনে করা।’ ইমাম গাযালী (রহ.) বলেন, ‘অজ্ঞতা এমন এক অন্ধকার, যা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো ইলম।’ (ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন)
গুজব, কুসংস্কার ও অজ্ঞতার ফলে সমাজে নানাবিধ বিপর্যয় সংঘটিত হয়। উদাহরণস্বরূপ-১. সামাজিক বিশৃঙ্খলা, ২. নিরীহ মানুষের ওপর জুলুম, ৩. সময় ও সম্পদের অপচয়, ৪. দ্বীনের ভুল ব্যাখ্যা ছড়ানো, ৫. ঈমান ও তাওহিদে দুর্বলতা। গুজব, কুসংস্কার ও অজ্ঞতার বিষাক্ত ছোবল ও মহাসংকট থেকে মুক্তির একমাত্র পথ ইসলামের নির্ভুল ও আলোকিত দিকনির্দেশনা।
১. যাচাই ছাড়া কিছু বিশ্বাস না করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা-ই পাই, তা শেয়ার করা বা বিশ্বাস করা ঠিক নয়; বরং কুরআনের নির্দেশনা অনুসারে ‘ফাতাবাইয়ানু’ অর্থাৎ যাচাই করা জরুরি। যে সংবাদ বা ঘটনার সঠিক প্রমাণ নেই, তা যাচাই না করে প্রচার করা গুনাহ।
২. কুরআন ও সহিহ হাদিস নির্ভর ইসলাম চর্চা। অজ্ঞতা ও কুসংস্কার দূর করতে হলে মানুষের মাঝে সহিহ আকিদা, সহিহ হাদিস ও আলেমদের সঠিক ব্যাখ্যা প্রচার করতে হবে।
৩. জ্ঞান অর্জন ও প্রচার করা। মসজিদ, মাদরাসা, স্কুল-কলেজ এবং গণমাধ্যমে ইসলামি শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। শুধু শোনা বা লোকমুখে প্রচলিত কথায় বিশ্বাস না করে আলেমদের কাছে জিজ্ঞাসা করে জানতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি না জানো, তা হলে জ্ঞানীদের নিকট জিজ্ঞেস করো।’ (সুরা নাহল : ৪৩)
৪. সচেতন সমাজ গঠন করা। পরিবার থেকেই কুসংস্কারের প্রতিরোধ শুরু করতে হবে। পাশাপাশি আলেমদের দায়িত্ব হলো খুতবা, ওয়াজ ও দাওয়াতের মাধ্যমে মানুষকে এই অন্ধকার থেকে মুক্ত করার জন্য সচেতনতা সৃষ্টি করা।
৫. তাওহিদের দৃঢ়তা। মুসলমানের ঈমান থাকতে হবে-‘অমঙ্গল, রোগ, বিপদ সবই আল্লাহর হুকুমে হয়। কোনো প্রাণী, বস্তু বা মানুষ নিজের ইচ্ছায় উপকার বা ক্ষতি করতে পারে না।’ (সুরা ইউনুস : ১০৭)
গুজব, কুসংস্কার ও অজ্ঞতা-এই তিনটি সমাজের অগ্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা। ইসলাম চায় একটি সচেতন, জ্ঞানভিত্তিক ও ঈমানদার সমাজ। আর সে লক্ষ্যে কুরআন-হাদিস আমাদের দিকনির্দেশনা দিয়ে রেখেছে। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজে সচেতন হওয়া, অন্যকে সচেতন করা এবং ইসলামি শিক্ষার আলোকে কুসংস্কার ও গুজবমুক্ত একটি সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখা। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তওফিক দান করুন।
সময়ের আলো/এমএইচ