কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রয়োজন

সৈয়দ ফারুক হোসেন

সম্পাদকীয়

বেকারত্ব জাতি, পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য অভিশাপ। বেকারত্ব শুধু একটি আর্থিক পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি সামাজিক সংকেত, একটি রাষ্ট্রীয়

2025-08-21T10:03:27+00:00
2025-08-21T10:03:27+00:00
 
  বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬,
১০ আষাঢ় ১৪৩৩
বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
সম্পাদকীয়
কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রয়োজন
সৈয়দ ফারুক হোসেন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২১ আগস্ট, ২০২৫, ১০:০৩ এএম 
গ্রাফিক: সময়ের আলো
বেকারত্ব জাতি, পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য অভিশাপ। বেকারত্ব শুধু একটি আর্থিক পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি সামাজিক সংকেত, একটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। বেকারত্ব দেশ ও সমাজের জন্য একটি অভিশাপ। কোনো শিক্ষার্থী যখন অনার্স-মাস্টার্স শেষ করেও চাকরি পান না, তখন তার মধ্যে বিষণ্নতা বহু গুণ বেড়ে যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, গত বছরের শেষে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ১০ হাজার। ২০২৪ সাল শেষে দেশে বেকারত্বের হার ছিল ৪.৪৮ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে ছিল ৪.১৫ শতাংশ। দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গত ১০ বছরে দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকার বেড়েছে সাড়ে ২৪ শতাংশ। 

প্রতি বছর উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কয়েক লাখ ছাত্রছাত্রী পাস করে বের হচ্ছেন। কিন্তু সে তুলনায় তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। বাংলাদেশে যে বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ-তরুণী বেকার বসে আছেন তারা একেবারে চাকরি পাচ্ছেন না কিংবা পছন্দমতো চাকরি পাচ্ছেন না। মেস করে থাকেন, মানবেতর জীবনযাপন করেন, আর একটি সম্মানজনক চাকরির জন্য দিনের পর দিন চেষ্টা করতে থাকেন। বেকারের নীরব যন্ত্রণা কেউ অনুভব করতে পারে না, কেউ বুঝতে চায় না তাদের অনুভূতি। তাই দেশের বেকারত্ব দূরীকরণে গবেষণালব্ধ পদক্ষেপ প্রয়োজন। 

কাজের সুযোগ না পেয়ে অনেকেই মাদকসহ নানাবিধ অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। হতাশায় জীবন কাটাচ্ছেন। অনেকেই বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথ। সবচেয়ে দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে সেই তরুণ প্রজন্ম, যারা দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। 

যখন একজন ব্যক্তি কর্মসংস্থান খুঁজে পায় না, তখন তার অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এবং জীবনযাত্রার মান কমে যায়। একই সঙ্গে এটি হতাশা, মানসিক চাপ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণ হতে পারে। বেকারত্ব সমাজের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকিস্বরূপ। যখন বিপুলসংখ্যক মানুষ বেকার থাকে, তখন অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায় এবং সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেয়। এ ছাড়া, বেকারত্ব দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও বাধা সৃষ্টি করে। দেশের মূল্যবান জনশক্তি অকেজো হয়ে পড়ে এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। 

মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত বেকারদের মধ্যে যারা পরিবারের সঙ্গে থাকেন, নানা টানাপড়েন তাদের অসহায় করে তোলে, মানসিক চাপে থাকেন সব সময়। 

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। ফলে উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও অনেক তরুণ-তরুণী চাকরি পাচ্ছেন না। এ সমস্যা কাটিয়ে উঠতে কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প নেই। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর দক্ষতা অর্জন করতে হবে। সরকারি চাকরির পেছনে না ছুটে কীভাবে উদ্যোক্তা হওয়া যায়, সে বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। যে ধরনের শিক্ষা তরুণরা পাচ্ছেন এবং তারা যে কাজ করতে পারেন, সেই ধরনের কাজ সৃষ্টি হচ্ছে না। আবার যে ধরনের কাজ সৃষ্টি হচ্ছে, এখনকার শিক্ষিত তরুণরা সেই ধরনের কাজ করার দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না। ফলে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। 

এ ছাড়া শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে দক্ষতার অভাব এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার অমিল বেকারত্বের অন্যতম কারণ। তবে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো—উচ্চশিক্ষিত বেকারদের সংখ্যা। এদের একটি বিশাল অংশ গ্রামাঞ্চলে বসবাস করেন, যাদের অধিকাংশেরই দক্ষতা বা প্রশিক্ষণ নেই। ফলে নগরভিত্তিক আধুনিক চাকরির বাজারে তারা প্রতিযোগিতা করতে পারছেন না। শিক্ষিত হয়েও চাকরি না পাওয়ার বেদনা অনেকের মানসিক স্বাস্থ্যেও প্রভাব ফেলছে। ফলে নানাবিধ অনৈতিক কর্মকাণ্ডের হারও ক্রমেই বাড়ছে। আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলছেন অনেকে, অনেকে আবার বিদেশে পাড়ি দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে পড়ছেন। এতে করে দেশের সামগ্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ধারা হুমকির মুখে পড়ছে। 

এদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তা সংকট এবং দেশীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ হ্রাসের ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে গেছে। ফলে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। প্রতি বছর উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কয়েক লাখ ছাত্রছাত্রী পাস করে বের হচ্ছেন। কিন্তু সে তুলনায় তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। যদিও এ মুহূর্তে সরকারি প্রতিষ্ঠানে সাড়ে চার লাখের বেশি পদ শূন্য রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি যে হারে বড় হয়েছে সেই অনুপাতে বাড়েনি কর্মসংস্থান। বরং বাড়ছে বেকারত্বের অভিশাপ। এদের মাঝে আবার শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি। তাই দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে শিক্ষিত বেকার। যেটির জন্য দায়ী শিক্ষাব্যবস্থার গলদ। তরুণদের শুধু উচ্চ শিক্ষিত নয়, বরং দক্ষ হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। এ জন্য প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। যুবকরাই সমাজ বদলে দিতে পারে। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষিত বেকারত্ব আমাদের মূল সমস্যা। সবাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে চাকরির পেছনে ছোটে, অথচ বিদেশে গিয়ে সাধারণ কাজ করে। দেশে ছোটখাটো উদ্যোগ নেওয়ার মানসিকতা বাড়াতে হবে। এটি কেবল একজন ব্যক্তির জীবনকে প্রভাবিত করে না, বরং পুরো সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। 

প্রতি বছর শ্রমবাজারে ২০-২২ লাখ তরুণ গোষ্ঠী নতুন করে যুক্ত হচ্ছে। এদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষের দেশে কর্মসংস্থান হচ্ছে না। আবার বেকারদের চার-পঞ্চমাংশের বেশি বয়সে তরুণ। সার্বিকভাবে কয়েক বছর ধরে দেশে বেকারের মোট সংখ্যা প্রায় অপরিবর্তিত। দেশে এখন প্রতি তিনজন বেকারের মধ্য একজন উচ্চশিক্ষিত। তারা বিএ কিংবা এমএ ডিগ্রি নিয়েও চাকরি পাচ্ছেন না। ফলে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের মধ্যে হতাশা প্রকট হয়েছে। বিভিন্ন জরিপেও উঠে এসেছে, দেশের তরুণরা নিজের ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে চিন্তিত। অর্থনীতি এগিয়ে গেলেও তারা নিজেদের কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন। বেকারত্ব একটি গুরুতর সমস্যা যা ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের জন্য ক্ষতিকর। এর থেকে মুক্তি পেতে হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। বেকারত্ব একটি মারাত্মক সামাজিক সমস্যা—যা ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজের ওপর বিভিন্নভাবে প্রভাব ফেলে। 

বিপুলসংখ্যক বেকার বাংলাদেশে অন্যতম প্রধান সমস্যা। অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্প্রসারণ হলেও কর্মসংস্থান সেই অনুসারে বাড়ানো যাচ্ছে না। শোভন চাকরি না পেয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েও অনেকে টিউশনি, পাঠাও-উবারে ডেলিভারিম্যান, বিক্রয়কর্মীসহ নানা ধরনের কাজ করে জীবন ধারণ করছেন। এমনকি তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির সরকারি চাকরির জন্যও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরা আবেদন করছেন। দেশে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা সর্বজনীন বা কর্মমুখী নয়। তাই শিক্ষার সঙ্গে কর্মের সংযোগ স্থাপন করা যাচ্ছে না। 

পাশাপাশি কর্মহীন বিপুল এ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানে সরকারের পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। বাস্তবতাবিমুখ শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ, কারিগরি শিক্ষাকে উপেক্ষা, যুবশক্তির অবমূল্যায়ন, সমৃদ্ধিবিমুখ চিন্তাসহ নানা কারণে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণীর একটি বড় অংশই বেকার থেকে যাচ্ছে। তারা বোঝা হচ্ছেন পরিবার ও রাষ্ট্রের। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে চাকরি না পেয়ে বিপুলসংখ্যক এই বেকার চরম হতাশা ও মানসিক চাপে ভুগছেন। 

তবে বেসরকারি খাতে কী পরিমাণ কর্মসংস্থান রয়েছে তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে। কর্মসংস্থান মানুষের জীবনকে উন্নত করে, আত্মমর্যাদা বাড়ায় এবং সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য কর্মসংস্থান অত্যন্ত জরুরি। তাই, বেকারত্ব দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বেকারত্বের যে ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা যাচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে বহুমাত্রিক কাঠামোগত ও নীতিগত সমস্যা। 

প্রধানত তিনটি অর্থনৈতিক কারণকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা যায়—প্রথমত দীর্ঘদিন ধরে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ, যা ভোক্তা ব্যয় সংকোচনের মাধ্যমে চাহিদা হ্রাস করছে; দ্বিতীয়ত একটি কার্যকর ও টেকসই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের অভাব, যেখানে উদ্যোক্তারা নতুন উদ্যোগ গ্রহণে পর্যাপ্ত প্রণোদনা বা নিরাপত্তা পাচ্ছেন না এবং তৃতীয়ত ব্যাংকিং খাতে ঋণের ওপর উচ্চ সুদহার, যা যেকোনো শিল্প প্রসারণ বা নতুন উদ্যোগ শুরু করার পথে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এই প্রেক্ষাপটে বেকারত্বকে আর শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখলেই চলবে না। 

এটি একটি বহুমাত্রিক সামাজিক সংকট, যা তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য, মূল্যবোধ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। বেকারত্ব মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত ও পেশাগত প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য সরকারি ও বেসরকারি সর্বস্তরের সম্মিলিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বেকারত্বের এই ক্রমবর্ধমান হার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই, সময়োপযোগী ও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এ সংকট মোকাবিলা করা অত্যন্ত জরুরি।


লেখক : সাবেক রেজিস্ট্রার, জাবিপ্রবি



Loading...
Loading...
সম্পাদকীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: