পূর্বঘোষিত কর্মবিরতি ও গণছুটি ঘোষণার ফলে দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মধ্যে অন্তত ৭০টি সমিতির বেশির ভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মবিরতিতে গেছেন। অনেকে অফিসে গিয়ে নির্ধারিত ফরমে স্বাক্ষর করে গণছুটিতে গেছেন, অনেকে ছুটি না নিয়েই কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন বলে বিভিন্ন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পবিস) কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গণছুটির কারণে বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। তাদের এ গণছুটি দীর্ঘায়িত হলে এবং দাবি-দাওয়ার বিষয়ে কোনো সমাধান না হলে পল্লী বিদ্যুৎ অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ তীব্রভাবে বিঘ্নিত হতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
এদিকে বিদ্যুৎসেবা বিঘ্নিত ও বাধা প্রদানের বিষয়টি উল্লেখ করে এক বিবৃতি দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বুধবার (১০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় পাঠানো ওই বিবৃতিতে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিজ নিজ কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। কাজে যোগ না দিলে কর্মবিরতিতে যাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানায় বিদ্যুৎ বিভাগ। এমন ঘোষণার পরও গণছুটি চালিয়ে যাচ্ছে কর্মকর্তা কর্মচারীরা।
বুধবার জয়পুরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সার্বিক অবস্থা বর্ণনা করে সমিতির পরিচালককে(মনিটরিং) চিঠি দিয়েছেন জেনারেল ম্যানেজার আবু উমাম মো. মাহবুবুল হক। চিঠিতে বলা হয়, বুধবার সমিতির দফতরসহ জোনাল অফিস, সাব-জোনাল অফিস, এরিয়া অফিস এবং অভিযোগ কেন্দ্রে কর্মরত ৪১১ জন কর্মকর্তা/কর্মচারীর মধ্যে ইতঃপূর্বে ২৭৬ জন গণছুটির আবেদন করে তারা গণছুটিতে রয়েছেন। এছাড়া অধিকাংশ কর্মকর্তা/কর্মচারী গণছুটির ফরম পূরণ না করেই অফিস ত্যাগ করে চলে গেছেন। অফিস প্রধান কর্তৃক কর্মকর্তা/কর্মচারীদের জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহ অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে এই ধরনের কর্মসূচি হতে বিরত থাকতে বারবার অনুরোধ করা হয়। তারপরও তারা গণছুটির বিষয়ে অনড় থাকেন। এখন পর্যন্ত লাইনসমূহ চালু রাখা সম্ভবপর হলেও লাইন বন্ধ হলে চালু করা কষ্টকর হবে। এই পবিসের ১০টি সাব-ষ্টেশনের মধ্যে শুধুমাত্র সদর দফতর সাব-ষ্টেশনে লাইন ক্রু দায়িত্ব পালন করছেন। বাকি ৯টি সাব-স্টেশনে ডিউটিরত কোন লাইন ক্রু/জনবল না থাকায় সাব-ষ্টেশনসমূহ অরক্ষিত অবস্থায় আছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ভয়াভহভাবে বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারাদেশের চিত্র প্রায় একই রকম। সরকার পল্লি বিদ্যুতের দাবির বিষয়ে সংবেদনশীল। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি-দাওয়া পূরণে সরকারের প্রচেষ্টা চলছে।
এর আগে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ একটি অত্যাবশ্যক পরিষেবা। এ সেবা প্রদানে বাধাদান বা বিঘ্ন ঘটানো আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিদ্যুৎ সরবরাহ কাজে নিয়োজিত এবং গণছুটির নামে অনুপস্থিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিজ নিজ কর্মস্থলে যোগদানের জন্য নির্দেশ দেওয়া হলো। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি মন্ত্রণালয়।
জানা গেছে, বিভিন্ন জেলায় পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকরা বেশকিছু এলাকায় বিদ্যুতের কর্মীদের কর্মসূচি পালনে ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ অফিসগুলোয় গিয়েও সেবা পাননি গ্রাহকরা।
নেত্রকোণা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, রংপুর পবিস-১ ও ২, কুড়িগ্রাম পবিস, গাইবান্ধা পবিস, নীলফামারী পবিস, ঠাকুরগাঁও পবিস, কুমিল্লা পবিস-১, ২ ও ৪, ঢাকা পবিস-১, ২, ৩ ও ৪, চট্টগ্রাম পবিস ১, ২ ও ৩, গোপালগঞ্জ পবিস, বরিশাল পবিস-২, মৌলভীবাজার পবিস, সিরাজগঞ্জ পবিস-১ ও ২, বগুড়া পবিস-১ ও ২, নাটোর পবিস-১ ও ২, সিলেট পবিস-১ ও ২, নওগাঁ পবিস ১ ও ২, পাবনা পবিস-১ ও ২, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পবিস, জয়পুরহাট পবিস, রাজশাহী পবিস, ফরিদপুর পবিস, লক্ষ্মীপুর পবিস, ময়মনসিংহ পবিস-৩, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পবিস, সাতক্ষীরা পবিস, নরসিংদী পবিস-২, শরীয়তপুর পবিস, বাগেরহাট পবিস, পটুয়াখালী পবিস, মুন্সিগঞ্জ পবিস, যশোর পবিস-২, ময়মনসিংহ পবিস-২, ফেনী পবিস, দিনাজপুর পবিস, মাগুরা পবিস, খুলনা পবিস, বরিশাল-১, জামালপুর পবিস, পিরোজপুর পবিস, ঝিনাইদহ পবিস, মানিকগঞ্জ পবিস, চাঁদপুর-২, মেহেরপুর পবিস, গাজীপুর পবিস, কক্সবাজার পবিস, কিশোরগঞ্জ পবিস, সুনামগঞ্জ পবিস, কুষ্টিয়া পবিস, চাঁদপুর পবিস-১, হবিগঞ্জ পবিস ও নারায়ণগঞ্জ পবিস এর কর্মকর্তা কর্মচারীদের গণছুটিতে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ক্যাবের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, ‘বিআরইবি-পবিস মতবিরোধ দীর্ঘদিনের। দাবি-দাওয়ার পক্ষ-বিপক্ষ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এ বিরোধ নিষ্পত্তি বিদ্যুৎ বিভাগকে করতে হবে। গ্রাহক টাকা দিয়ে বিদ্যুৎ কেনে। সেই সেবা নিতে গিয়ে এ বিরোধ যাতে গ্রাহকের স্বার্থের পরিপন্থি না হয় সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।’
এর আগে পল্লী বিদ্যুতের সংস্কার, চাকরি বৈষম্য দূরীকরণ ও হয়রানিমূলক পদক্ষেপ বন্ধসহ চার দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য গণছুটিতে যাওয়ার ঘোষণা দেয় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) এক সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচির ঘোষণা দেন পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনের সহদফতর সম্পাদক অঞ্জু রানী মালাকার।
পবিস কর্মীদের চার দফা দাবি হলো আরইবি-পিবিএস একীভূতকরণ অথবা অন্যান্য বিতরণ সংস্থার মতো কোম্পানি গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে এবং সব চুক্তিভিত্তিক/অনিয়মিত (মিটার রিডার কাম মেসেঞ্জার, লাইন শ্রমিক ও পৌষ্য বিলিং সহকারী) কর্মীদের নিয়মিতকরণ, মামলা প্রত্যাহার করে চাকরিচ্যুতদের স্বপদে পুনর্বহাল, সব সংযুক্ত ও সাময়িক বরখাস্ত করা এবং অন্যায়ভাবে বদলি করা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদায়ন বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের গঠিত কমিটির প্রতিবেদন দাখিল করে বাস্তবায়ন করা। ২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট থেকে অদ্যাবধি হয়রানিমূলকভাবে চাকরিচ্যুত, বরখাস্ত করা ও সংযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বরখাস্ত আদেশ বাতিল করে আগের কর্মস্থলে পদায়ন করা। জরুরি সেবায় নিয়োজিত লাইন ক্রুদের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ এবং শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচিকালীন যোগদান করতে না পারা পাঁচজন লাইনক্রুকে আগের কর্মস্থলে যোগদানের ব্যবস্থা করা। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া।
এর আগে পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিভিন্ন দাবি আদায়ে গত বছর কর্মবিরতিতে যান। এক পর্যায়ে তারা বিতরণ এলাকায় শাটডাউন কর্মসূচি পালন করেন। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বিঘ্নিত হওয়ার কারণে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট তৈরি হয়। এমনকি গ্রিড বিপর্যয়ের মতো ঝুঁকি তৈরি হয়। পবিসের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে বিদ্যুৎ বিভাগ বেশ কয়েকটি কমিটি গঠন করলেও ওই কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ তোলেন আন্দোলনকারী কর্মীরা। এমনকি আন্দোলনের কারণে চাকরিচ্যুতি, বদলি, মামলা ও হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
সময়ের আলো/জেডআই