দক্ষিণ এশিয়া কি জেন-জি বিপ্লবের উর্বর ক্ষেত্র- এই প্রশ্নটি আজকের বাস্তবতায় গভীর গুরুত্ব পেয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো একদিকে এই প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলকেও ভাবাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে তরুণদের আন্দোলন নতুন নয়, কিন্তু এবারকার তরুণ প্রজন্ম, বিশেষত জেন-জি, তাদের হাতে রয়েছে ডিজিটাল প্রযুক্তি, আন্তঃদেশীয় যোগাযোগ এবং প্রজন্মগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে গভীর ক্ষোভ। ফলে তাদের নেতৃত্বে যে প্রতিবাদ ও আন্দোলন গড়ে উঠছে, তা অতীতের যেকোনো ছাত্র-যুব আন্দোলনের থেকে ভিন্ন চরিত্র বহন করছে।
নেপালের ঘটনাটি এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দেশটির প্রায় ৩০ মিলিয়ন মানুষের রাষ্ট্রীয় কাঠামো দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিতিশীল। রাজতন্ত্র পতন, গৃহযুদ্ধ, সাংবিধানিক সংশোধন- সবকিছুই জনগণকে ক্লান্ত করে তুলেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের আন্দোলন একেবারেই নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্ত ছিল এই ক্ষোভের বিস্ফোরণের প্রাথমিক উপলক্ষ। রাজপথে নেমে আসা তরুণদের মধ্যে অন্তত ৭০ জন পুলিশের গুলিতে নিহত হলেও আন্দোলন থেমে যায়নি। বরং প্রযুক্তি-সচেতন তরুণরা ডিজিটাল স্পেসকেই নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত করে। প্রবাসী নেপালিরাও ডিসকর্ড নামের এক অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করার অভিনব প্রচেষ্টা চালায়। এটি নিছক নাটকীয়তা নয়, বরং তরুণদের বিকল্প রাজনৈতিক কল্পনার প্রকাশ। তারা বুঝিয়ে দিয়েছে যে, প্রচলিত নির্বাচনি ব্যবস্থার বাইরে থেকেও জনগণের কণ্ঠস্বর সংগঠিত করা যায় এবং রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ জানানো সম্ভব।
একইভাবে শ্রীলঙ্কার উদাহরণও গভীর তাৎপর্যময়। ২০২২ সালে ভয়াবহ আর্থিক সংকটে পড়া দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতি, ডলার ঘাটতি, খাদ্য ও জ্বালানির অভাব এক অচলাবস্থা তৈরি করে। মানুষ যখন প্রতিদিনের নিত্যপ্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন রাজা পাকসে পরিবারের বিলাসবহুল জীবনযাপন তরুণদের ক্ষোভকে আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। তারা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরে এবং দ্রুত স্লোগান, ব্যানার, ক্যাম্পেইন ছড়িয়ে দেয় সারা দেশে। তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সেই প্রতিবাদ এতটাই ব্যাপক হয়ে উঠে যে, অবশেষে রাজা পাকসে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। এটি শুধু এক সরকারের পতন নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতীকী উত্থান।
বাংলাদেশের ঘটনা আরও নাটকীয়। ২০২৪ সালে ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়েছিল নির্দিষ্ট দাবিকে কেন্দ্র করে। কিন্তু দ্রুতই এটি সর্বাত্মক সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। শত শত তরুণ নিহত হন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রক্তাক্ত সংঘর্ষের ময়দানে পরিণত হয়, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট করে সরকার আন্দোলন থামানোর চেষ্টা চালায়। কিন্তু ডিজিটাল নেটওয়ার্কে অভ্যস্ত তরুণরা ব্ল্যাকআউটের মধ্যেও বিকল্প অ্যাপ ও ভিপিএন ব্যবহার করে আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে দিতে থাকে। এই প্রজন্ম জানত কীভাবে ডিজিটাল অবরোধ ভাঙতে হয়, কীভাবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কাছে নিজেদের কণ্ঠ পৌঁছে দিতে হয়। অবশেষে শেখ হাসিনার সরকার পতন হয় এবং তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। ইতিহাস সাক্ষী যে, এ অঞ্চলে তরুণদের নেতৃত্বে এক সরকারকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে।
প্রশ্ন জাগে- এই তিন দেশের ঘটনার অভিন্ন সূত্র কী? হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলির বিশ্লেষণ এখানে প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণির দুর্নীতি তরুণদের ক্ষোভের মূল উৎস। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ৫০ শতাংশ জনগণের বয়স ২৮ বছরের নিচে। তারা এমন একসময় বেড়ে উঠেছে যখন ২০০৮-০৯ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও ২০২০ সালের কোভিড-১৯ মহামারি তাদের শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের স্বাভাবিক প্রবাহকে ভেঙে দিয়েছে। একদিকে তারা ডিজিটালভাবে বিশ্বসংযুক্ত, অন্যদিকে জাতীয় রাজনীতিতে তাদের কণ্ঠস্বর প্রায় অগ্রাহ্য।
আরেকটি বড় কারণ হলো- প্রজন্মগত ব্যবধান। নেপালের অলি, বাংলাদেশের শেখ হাসিনা, শ্রীলঙ্কার রাজা পাকসে- সবাই ছিলেন সত্তরের কোঠায়, যখন আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা তরুণদের বয়স মাত্র কুড়ির কোঠায়। এই ব্যবধান শুধু বয়সের নয়, জীবনধারারও। বিলাসবহুল প্রাসাদে বসবাসকারী বৃদ্ধ নেতাদের পাশে ক্ষুধার্ত ও বেকার তরুণদের হতাশা এক ধরনের তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করেছে। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ধরনের প্রজন্মগত বৈপরীত্য ইতিহাসে বহুবার বিপ্লবের জন্ম দিয়েছে।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রুমেলা সেনের মতে, এই আন্দোলনগুলোর পেছনের আসল শক্তি হলো- রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির আকাক্সক্ষা। তরুণরা শুধু ক্ষোভে নয়, বরং ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার দাবি নিয়ে আন্দোলনে নেমেছে। তারা প্রযুক্তিতে দক্ষ, তারা জানে কীভাবে বিকেন্দ্রীভূত সংগঠন গড়ে তুলতে হয়, কীভাবে হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে বৈশ্বিক সমর্থন আদায় করতে হয়। এই দক্ষতাই তাদের আন্দোলনকে অতীতের ছাত্র-যুব আন্দোলনের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে।
বিশ্লেষকরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরছেন- এই আন্দোলনগুলো একে অপরের কাছ থেকে শিক্ষা নিচ্ছে। শ্রীলঙ্কার তরুণরা বাংলাদেশের আন্দোলন দেখেছে, নেপালের তরুণরা শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশকে অনুসরণ করেছে। তাদের স্লোগান, প্রতিবাদের ধরন, ডিজিটাল ক্যাম্পেইনের কৌশল- সবকিছুতেই মিল পাওয়া যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখানে এক আন্তঃদেশীয় সেতু হিসেবে কাজ করেছে। ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক বা ডিসকর্ড- এসব প্ল্যাটফর্ম তরুণদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও কৌশলকে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছড়িয়ে দিয়েছে। ফলে একটি দেশীয় আন্দোলন দ্রুতই আঞ্চলিক অনুপ্রেরণায় পরিণত হচ্ছে।
তা হলে দক্ষিণ এশিয়া কি সত্যিই জেন-জি বিপ্লবের উর্বর ক্ষেত্র? ইতিহাস বলছে, এ অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিবর্তন সাধারণত সামরিক অভ্যুত্থান, অভিজাত রাজনৈতিক পালাবদল বা বহিঃশক্তির প্রভাবে ঘটেছে। কিন্তু এবারকার পরিবর্তনের চালিকাশক্তি সম্পূর্ণ আলাদা- তরুণ প্রজন্ম। তারা রাষ্ট্রের প্রচলিত কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করছে, ডিজিটাল প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করছে। এই প্রজন্মের ক্ষোভ আর কেবল সীমিত প্রতিবাদে আটকে নেই; বরং তা শাসকগোষ্ঠীকে সরাসরি ক্ষমতাচ্যুত করার শক্তিতে রূপ নিচ্ছে।
তবে এই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ- এই তরুণ-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন কি টেকসই রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে পারবে? নাকি এগুলো কেবল মুহূর্তের বিস্ফোরণ হয়ে থেকে যাবে? নেপালের ডিসকর্ডভিত্তিক অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন হয়তো প্রতীকী, কিন্তু তা এক বাস্তব সংকেত- তরুণরা বিকল্প রাজনীতির কল্পনা করছে। শ্রীলঙ্কার আন্দোলন সরকারের পতন ঘটালেও দেশটি এখনও আর্থিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বাংলাদেশের আন্দোলন সরকার পতন ঘটিয়েছে, কিন্তু নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রশ্নে এখনও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।
রাজনৈতিক নৃবিজ্ঞানী জীবন শর্মা এ প্রসঙ্গে বলেছেন, এই আন্দোলনগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং তরুণদের দীর্ঘদিনের হতাশা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এগুলো হয়তো নিখুঁত সমাধান দিতে পারবে না, কিন্তু নিঃসন্দেহে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন এক যুগের সূচনা করেছে। তরুণরা এখন জানে, তাদের সম্মিলিত শক্তি রাষ্ট্রযন্ত্রকে কাঁপিয়ে দিতে পারে।
অতএব বলা যায়, দক্ষিণ এশিয়া এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। এখানে প্রজন্মগত সংঘাত কেবল পারিবারিক বা সামাজিক নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ও কাঠামোগত। জেন-জি প্রজন্ম প্রযুক্তিকে হাতিয়ার বানিয়ে রাজনৈতিক অভিজাতদের চ্যালেঞ্জ করছে। তারা অতীতের মতো শুধু রাজপথে নয়, বরং ডিজিটাল জগতে বিকল্প রাজনীতি রচনা করছে। এই তরুণরা ক্ষুধার্ত, বেকার, হতাশ- কিন্তু একই সঙ্গে তারা সাহসী, সংগঠিত ও উদ্ভাবনী।
দক্ষিণ এশিয়া কি জেন-জি বিপ্লবের উর্বর ক্ষেত্র? উত্তরটি হয়তো ইতিবাচক, তবে শর্ত সাপেক্ষে। এই প্রজন্মের ক্ষোভ ও আন্দোলন ইতিমধ্যেই শাসকগোষ্ঠীর পতন ঘটিয়েছে, তবে তাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামো নির্মাণ করা যায়। যদি তারা তা করতে সক্ষম হয়, তবে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি সত্যিই এক নতুন ধারায় প্রবাহিত হবে। আর যদি ব্যর্থ হয়, তবে এই আন্দোলনগুলো হয়তো কেবল অস্থায়ী বিস্ফোরণ হিসেবেই থেকে যাবে।
কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট- দক্ষিণ এশিয়ার তরুণরা আর নীরব দর্শক নয়। তারা ইতিহাসের মঞ্চে নেমে এসেছে এবং তাদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করা অসম্ভব। আগামী দিনের রাজনীতিতে এই কণ্ঠই সবচেয়ে বড় নির্ধারক হয়ে দাঁড়াবে।
এএডি/