দেবী দুর্গা, দশভুজা, সিংহবাহিনী, মহিষাসুরমর্দিনী, জগৎ জননী। দেবী দুর্গার আগমন বলতে সাধারণত শারদীয় দুর্গাপূজার সময় দেবী দুর্গার আগমন বোঝানো হয়। এটি সনাতন ধর্মাবলম্বী বাঙালির অন্যতম প্রধান উৎসব। দেবী দুর্গার আগমনকে কেন্দ্র করে অনেক পুরাণকথা, রীতি, গান এবং কাব্য রচিত হয়েছে। মহালয়া তিথিতে চণ্ডী পাঠ এবং আগমনি গান দিয়ে দেবীর আগমনকে স্বাগত জানানো হয়। তারপর ষষ্ঠী তিথিতে বোধন এবং কলাবউ স্নান ইত্যাদি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তার প্রকৃত আগমন সম্পন্ন হয়।
পুরাণকথা অনুযায়ী দেবী দুর্গা হলেন- পার্বতী, যিনি হিমালয়ের রাজা ও রানি মেনকার কন্যা, শিবের সঙ্গে বিবাহের পর তিনি কৈলাশে স্বামীর সঙ্গে বসবাস করেন। দেবী দুর্গা প্রতিবছর শরৎকালে কৈলাশ থেকে মর্ত্যে (পৃথিবীতে) আসেন তার পিতৃগৃহে। বাঙালি হিন্দু সমাজে এটি মায়ের মেয়ের বাড়ি আসার প্রতীক। এই সময়কে আনন্দ, উৎসব ও মিলনের সময় হিসেবে দেখা হয়।
পঞ্জিকা অনুযায়ী আগমন : দুর্গাপূজার সময় পঞ্জিকা দেখে নির্ধারিত হয় দেবীর আগমন ও গমন। আগমন বলতে বোঝায়, দেবী কী বাহনে আগমন করছেন। যেমনÑহাতি, নৌকা, ঘোড়া, পালকি পদব্রজ ইত্যাদি। প্রতিটি বাহনের আলাদা আলাদা তাৎপর্য আছে।
হাতি- সুসময়, সমৃদ্ধি ও শান্তির বার্তা।
নৌকা- প্রচুর বৃষ্টি, শস্যের প্রাচুর্য, কৃষকের কল্যাণ।
ঘোড়া- রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা বা অশান্তির বার্তা।
পালকি- খরা, মহামারি, ভূমিকম্প বা দুঃসময়ের আশঙ্কা।
পদব্রজে- নানা প্রকার আশান্তি, কষ্ট, মহামারির সম্ভাবনা।
২০২৫ সালের দেবীর আগমন- বাহন : প্রচলিত ধর্মীয়/পঞ্জিকা চর্চায় দেবীর আগমন যেই ‘বার’ এ হয়, সেই অনুযায়ী বাহন নির্ধারিত হয়। উদাহরণস্বরূপ : রোববার বা সোমবার হলে দেবী হাতিতে আগমন করেন। বুধবার হলে নৌকায়। শনিবার/মঙ্গলবার হলে ঘোড়ায় এবং বৃহস্পতিবার/শুক্রবার হলে পালকিতে আসেন। এই নিয়মটি বহু পঞ্জিকা ও ধর্মচর্চাগত লেখায় উদ্ধৃত আছে। যেহেতু এ বছর মহাষষ্ঠী ২৮ সেপ্টেম্বর রোববার, প্রচলিত নিয়ম অনুসারে ২০২৫ সালে মা দুর্গার আগমন হয়েছে ‘হাতি’ বাহনে। মহালয়া : ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫। মূল দুর্গাপূজার দিনগুলো প্রথাগতভাবে ২৮ সেপ্টেম্বর মহাষষ্ঠী থেকে ২ অক্টোবর বিজয়া দশমী পর্যন্ত প্রধান দিনগুলো পালন করা হচ্ছে।
হাতি বাহনের অর্থ ও শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা : হাতি সর্বদাই রাজকীয় ক্ষমতা ও অটল শক্তির প্রতীক, যা দেবী দুর্গার মতোই দিব্য শক্তির মূর্তরূপ। হাতি বাহন সাধারণত সমৃদ্ধি, শীতলতা/সংযম, ফলপ্রসূ বৃষ্টি ও কৃষিজ সাফল্যের নির্দেশ করে অর্থাৎ ব্যাপকভাবে শুভ লক্ষণ ধরা হয়। অনেক স্থানীয় বিশ্বাসে হাতি বাহন হলে সেই বছরের কৃষি ও মানবজীবনে সাফল্য ও প্রফুল্লতার ইঙ্গিত বহন করে। কৃষিনির্ভর সমাজে হাতিকে মেঘ ও বৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে তাদের আগমন সময়মতো বৃষ্টি ও প্রচুর ফসলের সূচনা করে, যা পৃথিবীকে শস্যপূর্ণ করে তোলে। এটাও বিশ্বাস করা হয় যে যখন দেবী হাতির পিঠে চড়ে আসেন বা চলে যান, তখন পৃথিবী মহামারি, খরা বা অতিবৃষ্টির মতো বড় ধরনের দুর্যোগ থেকে রক্ষা পায়।
১. পৌরাণিক ও ধর্মীয় তাৎপর্য : শারদীয় দুর্গাপূজার সর্বপ্রধান তাৎপর্য হলো দেবী দুর্গার রূপে সনাতন ধর্মমতে শুভ শক্তির দ্বারা মহিষাসুররূপী অশুভ শক্তির পরাজয় হয়েছে। এটি প্রতিষ্ঠা করে যে অশুভ শক্তি চূড়ান্তভাবে শুভ শক্তি দ্বারা পরাজিত হয়। দেবী দুর্গা কোনো একক দেবতা নন, তিনি হলেন, সব দেবতার সম্মিলিত শক্তি। এটি শিক্ষা দেয় যে মিলিত প্রচেষ্টাই সব অকল্যাণকে পরাজিত করতে পারে। হিন্দু দর্শন অনুসারে দেবী দুর্গা হলেন, পরব্রহ্মেরই এক রূপ, যিনি সৃষ্টি, স্থিতি ও সংহারের নিয়ন্ত্রক। তিনি আদ্যাশক্তি,পরমশক্তি। দুর্গা হলেন, জগৎ জননী ও শক্তির আধার। তিনি সৃষ্টি, স্থিতি ও সংহারের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তার পূজার মাধ্যমে ভক্তরা শক্তি, সুরক্ষা ও মঙ্গল কামনা করেন। বাঙালি লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা এই সময় কৈলাশ থেকে তার সন্তানদের নিয়ে বাপের বাড়ি আসেন। এই বিষয়টি পূজায় একটি অত্যন্ত আনন্দদায়ক ও স্নেহপরায়ণ পারিবারিক আবহ যোগ করে। বিজয়া দশমীতে তার কৈলাশে ফিরে যাওয়া বাঙালির হৃদয়ে এক করুণ আবেশের সৃষ্টি করে।
২. দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য : দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধের কাহিনিটি একটি রূপক। মহিষাসুর মানুষের ষড়রিপু কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মৎস্যর দেবী দ্বারা তার বদমানুষের কুপ্রবৃত্তিগুলোকে দমন করে আত্মিক শুদ্ধি ও আত্মিক উন্নতির পুনর্জাগরণ করে। হিন্দু দর্শনে নারীশক্তিকে সৃষ্টির মৌলিক ও সক্রিয় শক্তি হিসেবে বর্ননা করা হয়েছে। এটি একটি প্রাচীন সভ্যতার দর্শন যা নারীকে কেবল ভোগের বস্তু না দেখে, জগতের স্রষ্টা ও সংহারকারী রূপে প্রতিষ্ঠিত করে। মূর্তিতত্ত্বে তিনি শিবের পত্নী, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক এবং গণেশের মা। তার মূর্তি তৈরি হয় বিশ্বকর্মার দ্বারা। এটি শক্তি উপাসনার মাধ্যমে মুক্তিলাভের শিক্ষা। শরৎকালে প্রকৃতি যখন নব্যশ্যামল হয়ে ওঠে, তখন এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এটি প্রাচীনতার নতুনতার সূচনা, সমৃদ্ধির প্রতীক।
৩. সাংস্কৃতিক সামাজিক তাৎপর্য : দুর্গাপূজার সাংস্কৃতিক তাৎপর্য অপরিসীম। দুর্গাপূজা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে বাঙালির সার্বজনীন সাংস্কৃতিক মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। বারোয়ারি পূজার মাধ্যমে সমাজের সব স্তরের মানুষ একত্রিত হয়, চাঁদা তুলে, পরিকল্পনা করে সুশৃঙ্খলভাবে উৎসব সম্পন্ন করে। সামাজিক সম্প্রীতি সাম্প্রদায়িকতার বন্ধন তৈরি করে। কুমারের মতো স্থানীয় শিল্পীদের মাটির প্রতিমা, শিল্পকর্মে পরিণত হয়। বিভিন্ন ডিজাইনের এক একটি প্যান্ডেল স্থাপত্যে শিল্পের অনন্য নিদর্শন। নতুন জামাকাপড় পরা, মেয়েদের শাড়ি পরা এবং আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যাওয়া এই উৎসবের একটি বড় আকর্ষণ। এটি সামাজিক বন্ধনকে মজবুত করে। ঘরে ঘরে আলোকসজ্জা, সংগীত, নৃত্য, নাটক : ভজন, শাস্ত্রীয় সংগীত, লোকসংগীত, নৃত্যনাট্য, শঙ্খধ্বনি, বিশেষ করে ধুনুচি নাচ ও ঢাকের বাদ্যে চারদিক মুখরিত হয়ে ওঠে।
৪. অর্থনৈতিক তাৎপর্য : দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ বটে। এর অর্থনৈতিক তাৎপর্য সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব ফেলে। দর্জি, মুচি, ফুল, ফল, কাপড়, গহনা, প্রসাধনী, মিষ্টান্ন ভান্ডার, খাবার, ইলেকট্রনিকস ইত্যাদির বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। প্রতিমা তৈরি, মণ্ডপ সাজানো, সাউন্ড সিস্টেম, আলোকসজ্জা এসব কাজে শিল্পী ও কারিগরা কর্মসংস্থান পেয়ে থাকেন। উৎসবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্তরের মানুষ একত্রিত হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে।
দেবী দুর্গা কোনো একক দেবতা নন, তিনি হলেন, সব দেবতার সম্মিলিত শক্তি। এটি শিক্ষা দেয় যে মিলিত প্রচেষ্টাই সব অকল্যাণকে পরাজিত করতে পারে। যেকোনো অশুভ শক্তি চূড়ান্তভাবে শুভ শক্তি দ্বারা পরাজিত হয়। হিন্দু দর্শন অনুসারে, দেবী দুর্গা হলেন, পরব্রহ্মেরই এক রূপ, যিনি সৃষ্টি, স্থিতি ও সংহারের নিয়ন্ত্রক। তিনি আদ্যাশক্তি,পরম শক্তি। দুর্গাপূজা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি বাঙালি সমাজ, সংস্কৃতি ও জীবনের এক সর্বব্যাপী ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ উৎসব। পারিবারিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় বন্ধন যেমন সুদৃঢ় করে, তেমনি দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে সব ধর্মের মানুষের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে উৎসবে শামিল হতে দেখা যায়। আজ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই, যেখানে বাংলা ভাষী মানুষের বাস, সেখানে দুর্গাপূজা উদযাপিত হয়। এটি বাঙালি প্রবাসীদের তাদের সংস্কৃতি ও পরিচয় ধরে রাখতে সাহায্য করছে। এটি বাঙালি সংস্কৃতির একটি ‘বৈশ্বিক ব্র্যান্ড’-এ পরিণত হয়েছে।
লেখক ও সমাজকর্মী
সময়ের আলো/জেডআই