সারা দেশের কৃষকদের মৌসুম অনুযায়ী বিভিন্ন ফসলের প্রণোদনার জন্য বিদেশ থেকে উন্নতমানের বীজ আমদানি করত সরকার। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) মাধ্যমে তা আমদানি করা হতো। পরে এ বীজ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) মাধ্যমে কৃষকের হাতে পৌঁছে দিত। কিন্তু এ বছর বিএডিসি নিজে আমদানী না করে ডিএই-কে দায়িত্ব দেওয়ায় পেয়াজ বীজ ক্রয় ও সরবরাহের ক্ষেত্রে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সরাসরি বীজ ক্রয় করায় ভাল বীজ আমদানীর পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় বাজার থেকে নিন্মমানের বীজ সংগ্রহ করে সরবরাহ করায় কৃষকরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সময়মতো বীজ না পাওয়া এবং নিন্মমানের বীজের কারণে কুষ্টিয়া, মেহেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকরা পেয়াজের বীজ রোপণ করে বিপাকে পড়েছেন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, আগে বিএডিসি দরপত্রের মাধ্যমে একসঙ্গে ৬০ থেকে ৭০ টন পেয়াজ বীজ বিদেশ থেকে আমদানী করে ল্যাবে গুনগত মান পরীক্ষার পর তা ডিএইকে দিত কৃষকদের মাঝে সরবরাহ করার জন্য। তখন দেশের ভাল ও বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশ থেকে আমদানী করতে আগ্রহী হতো। কিন্তু বিএডিসির অপরাগতায় বিশেষ করে, সংস্থাটির নতুন সদস্য পরিচালক (বীজ) মো. মজিবর রহমান যোগদানের পর এ বছর পেয়াজ বীজ ক্রয়ের দায়িত্ব বিএডিসির পরিবর্তে ডিএইকে দেওয়া হয়। ডিএই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সরাসরি বীজ সংগ্রহের কারণে নিম্নমানের বীজ দিচ্ছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
কারণ, এ বছর ১৫০টি উপজেলার জন্য ৬০ টন এন-৫৩ পেয়াজ বীজ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ১৫০টি কার্যাদেশের মাধ্যমে ক্রয় করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ৪-৫শ’ কেজি বীজ ক্রয় করা হয়েছে কোনো কোনো উপজেলার জন্য। এতে ভাল কোনো প্রতিষ্ঠান সরবরাহ দিতে আগ্রহী হয় না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ৪-৫শ’ কেজি বীজ কিনলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে আমদানি না করে স্থানীয় বাজার থেকে নিম্নমানের বীজ কিনে সরবরাহ দেয়। এতে কৃষি কর্মকর্তা এবং সরবরাহকারীরা লাভবান হলেও কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কারণ, কোনো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ১৫ থেকে ২০ টনের নিচে আমদানি করার প্রয়োজন না হলে সাধারণত এলসি খুলতে আগ্রহী হয় না। তাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের পরিবর্তে ডিএই বা বিএডিসির প্রধান কার্যালয় থেকে একসঙ্গে দরপত্রের মাধ্যমে ক্রয় করা হলে ভালো মানের বীজ পাওয়া সম্ভব।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিএডিসি ধান, পাট, আলুসহ অন্যান্য বীজ আমদানী করলেও এবছর হঠাৎ করে পেয়াজ বীজ আমদানী না করে ডিএইকে দায়িত্ব দেওয়ায় যথাসময়ে বীজ পায়নি কৃষক। তাছাড়া ডিএই-এর নিজস্ব কোনো ল্যাব না থাকায় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পক্ষে ৪-৫শ’ কেজি বীজ পরীক্ষারও কোনো ব্যবস্থা তাদের নেই। ফলে সরকার উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রণোদনার টাকা ব্যয় করলেও এবার শীত মৌসুমের আগে এন-৫৩ পেয়াজ বাজারে আসবে কম।
কারণ হিসেবে তারা বলছেন, কুষ্টিয়ার ছয়টি উপজেলায় সরকারি প্রণোদনার আওতায় প্রায় চার হাজার কৃষকের মধ্যে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজ বিতরণ করা হয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, বিতরণকৃত বীজ নিম্নমানের হওয়ায় তাদের জন্য চরম ক্ষতি হয়েছে। তারা জানান, যে বীজগুলো তাদের বিতরণ করা হয়েছে, সেগুলোর প্যাকেটে কোনো মূল্য, উৎপাদন বা মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ দেওয়া নেই। তাদের অভিযোগ, সরকারি বরাদ্দের অর্থ এই নিম্নমানের বীজ বিতরণের মাধ্যমে লোপাট করা হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত এক কৃষক জানান, অফিস থেকে যে বীজ দেওয়া হয়েছিল, তা লাগানোর পর চারা বের হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু, পরে সব চারা মরে গেছে। অন্য এক কৃষক বলেন, দানা বের হয়েছে, কিন্তু পরে আর বাড়েনি।
মেহেরপুরে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষে প্রণোদনার আওতায় কৃষকদের মাঝেও বীজ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত সময় জুনের মধ্যে বীজ দেওয়ার কথা থাকলেও তা কৃষকের হাতে পৌঁছেনি। ফলে কৃষকরা পেঁয়াজ চাষে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
জানা গেছে, এই জেলায় প্রথমে সরবরাহ করা বীজের অঙ্কুরোদগম সক্ষমতা ছিল মাত্র ৬১ ও ৬৬ শতাংশ, যেখানে সরকারের নির্ধারিত মান ছিল ৮৫ শতাংশ। এজন্য সদর ও মুজিবনগর উপজেলা কৃষি বিভাগ অনেক বীজ ফেরত পাঠিয়েছে। সংস্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বিএডিসির সদস্য পরিচালকের (বীজ) অভিজ্ঞতার অভাব এবং কয়েকজন কর্মকর্তার ভুল সিদ্ধান্তের কারনে প্রণোদনার উদ্দেশ্য ও সফলতা ভেস্তে যাচ্ছে। তাছাড়া সরকারকে বিব্রত করতে পেয়াজ বীজ নিয়ে ফ্যাসিস্ট দোসরদের কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, মন্ত্রণালয় থেকে বিএডিসিকে বীজ সংগ্রহের জন্য পত্র জারি করলেও আলোচিত কর্মকর্তার আপত্তির কারণে এ দায়িত্ব ডিএইকে দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামীতেও যদি কেন্দ্রীয়ভাবে এক সঙ্গে বীজ ক্রয় না করে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বীজ ক্রয় করা হয় তাহলে কোনো ভাল প্রতিষ্ঠানই উপজেলা পর্যায়ে গিয়ে ৪শ’ বা ৫ শ’ কেজির জন্য দরপত্র জমা দেওয়ার ঝামেলায় যেতে চাইবে না। ফলে সদ্য বিদায়ী অর্থ বছরের মতো স্থানীয় বাজার থেকেই নিম্নমানের বীজ সরবরাহ করবে সংশ্লিষ্টরা। এতে পেয়াজ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে বিএডিসির সদস্য পরিচালক (বীজ ও উদ্যান) মো. মজিবর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা কাজ করেছেন। এক্ষেত্রে তার একক কোনো ভূমিকা নেই। বীজ ক্রয় ও বিতরনের ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়টি তার জানা নেই। এর বাইরে তিনি এ বিষয়ে আর কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক (সরেজমিন উইং) মো. ওবায়দুর রহমান মন্ডল বলেন, বীজ ক্রয় ও বিতরণে কোনো অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের অভিযোগ থাকলে এ বিষয়ে খোজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
এসকে/