একদিন রান্না নিয়ে তুমুল আড্ডা চলছে। সেখানে আমি শুধুই শ্রোতা। গল্পচ্ছলে এক পরিচিত বলেছিলেন, বুঝলে, তুমি যদি মানুষ হিসেবে কাউকে বিচার করতে চাও, তা হলে তার রান্নাঘর আর ফ্রিজ খুলে দেখ। মানুষটি কেমন তার পরিপূর্ণ ধারণা পেয়ে যাবে।
শুনে ভাবনায় পড়ে গেলাম! আরে এমনটাও হয় নাকি? রান্নাঘর আর ফ্রিজ নির্ধারণ করবে মানুষটি ব্যক্তি হিসেবে কেমন—ধুর! আমার অবাক চাউনি দেখে তিনি বুঝিয়ে বলেছিলেন, ড্রয়িংরুম বা ডাইনিং রুম নয়, রান্নাঘর হচ্ছে ঘরের প্রাণ। আর রান্নাঘরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ আছে ফ্রিজের। মানুষটি প্রতিবেলায় কী খাচ্ছে সেটি তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে বিষয়টিকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার জো নেই। রান্নাঘরে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে খাবার রান্না করা হচ্ছে কিনা কিংবা খাবারটি ফ্রিজে কীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে—সেটি স্পষ্ট বলে দেয় মানুষটি কেমন, তার আচার-আচরণ কেমন, নিজের ব্যাপারে এবং ভবিষ্যতের ব্যাপারে তিনি কতটা সচেতন।
আরে তাই তো! এতটা তলিয়ে দেখা হয়নি কখনো। তবে কথা তো সত্যিই। ঘরে ঘরে খাবার সংরক্ষণের একমাত্র দাওয়াই ফ্রিজ। কাঁচা মাছ-মাংস, ডিম, সবজি, ফলমূল কিংবা রান্না করা খাবার কী সংরক্ষণ করি না আমরা। কিন্তু স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে সেটি সংরক্ষণ করা হচ্ছে কি না সে ব্যাপারে তেমন সচেতন নয় অনেকে। স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে রান্না করা নিয়ে যতটা আলোচনা করা হয় তার সিকিভাগও ব্যয় করা হয় না ফ্রিজে খাদ্য সংরক্ষণের উপায় নিয়ে। আর আলোচনাই যদি না হয় তা হলে সচেতনতা বাড়বে কীভাবে!
এ বিষয়ে সময়ের আলোর পক্ষ থেকে কথা হয় ন্যাশনাল হোটেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ট্রেইনিং ইনস্টিটিউটের ফুড অ্যান্ড বেভারেজ বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক শিউলি আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ফ্রিজে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে খাবার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ৩টি ধাপ মেনে চলা ভালো। ঘণ্টা বা দিনের ওপর ভিত্তি করে এই শ্রেণিবিভাগ করা হয়। ১-৪ ঘণ্টার ভেতরে ব্যবহারযোগ্য খাবারকে বলা হয় স্বল্প সময়ে সংরক্ষিত খাদ্য। ৬-২৪ ঘণ্টার ভেতরে ব্যবহারযোগ্য খাবারকে দীর্ঘ সময়ে এবং ডিপ ফ্রিজে ১৫-৩০ দিনের ভেতরে ব্যবহারযোগ্য খাদ্যকে ফ্রোজেন ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়।
১. স্বল্প সময়ে সংরক্ষিত খাদ্য : সদ্য রান্না করা খাবার বা কেটে ফেলা ফলমূল এই ক্যাটাগরিতে পড়ে। এ ধরনের খাবারের ক্ষেত্রে আলাদা ঢাকনাযুক্ত বাটি ব্যবহার করা উচিত। তবে খাবার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সবাইকে কাচ, সিরামিক বা স্টেইনলেস স্টিলের বাক্স বা বাটি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে রান্না করা খাবারের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া তৈরি হয় না। এতে খাবারের স্বাদ ও গন্ধ অটুট থাকে।
২. দীর্ঘ সময়ে সংরক্ষিত খাদ্য : সাধারণত রান্না করা খাবার এই ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত। ফ্রিজের নরমাল সেকশনে ১-৪ ডিগ্রি তাপমাত্রায় এই খাবার সংরক্ষণ করতে হয়। স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে রান্না করা খাবার সংরক্ষণ করতে চাইলে দিন মেপে খাবার সংরক্ষণ করা খুবই জরুরি। রান্না করা খাবার ১-২ দিন, তরল দুধ ২-৩ দিন, ডিম ৭-১৫ দিন এবং দুগ্ধজাত পণ্য যেমন দই-পনির ১৫ দিনের ভেতরে ব্যবহার করে ফেলতে হবে। ভেজিটেবল বক্সে রাখা সবজি ও ফলমূল ৩-৭ দিনের ভেতরে ব্যবহার করে ফেলতে হবে। এতে খাদ্যগুণ ঠিক থাকবে।
৩. ফ্রোজেন খাদ্য : সাধারণ মাছ-মাংস ও ফ্রোজেন ফুড ফ্রিজের ডিপে সংরক্ষণ করা হয়। অনেক সময় রান্না করা খাবারও ফ্রিজের এই সেকশনে রাখা হয়। ডিপে রাখা যেকোনো মাছ ১৫-৩০ দিনের ভেতরে ব্যবহার করে ফেলতে হবে। মাংস সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা স্বাস্থ্যসম্মত। এর বেশিদিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে মাছ-মাংসের রং ফ্যাকাশে হয়ে যায়, অনেক ক্ষেত্রে রান্নার পর স্বাদ পাওয়া যায় না। এসব খাবার ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
ডিপে মাছ-মাংস রাখার ক্ষেত্রে আমাদের প্রায় সবাইকে পলিথিন ব্যবহার করতে দেখা যায়। স্বাস্থ্যগত দিক থেকে এটি ভয়াবহ চর্চা। কোনোভাবেই সাধারণ পলিথিন ব্যবহার করা যাবে না। একান্তই ব্যবহার করতে চাইলে ফুডগ্রেডেড পলিথিন ব্যবহার করতে হবে। পলিথিন ডিপের নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় মাছ-মাংসের সঙ্গে বিক্রিয়া করে। ডিপ ফ্রিজের ভেতরে রান্না করা খাবার সংরক্ষণের জন্য স্টেইনলেস স্টিলের বাক্স ব্যবহার করা উচিত।
বাংলাদেশে ডিপ ফ্রিজে দীর্ঘদিন বাটা মসলা রাখার চল আছে। কিন্তু সেটি স্বাস্থ্যকর নয়। পেঁয়াজ-আদা-রসুন বাটা ফ্রিজে সংরক্ষণ না করাই সবচেয়ে ভালো। যদি সংরক্ষণ করতেই হয় তা হলে এয়ারটাইট বক্সে ১-২ দিনের ভেতরে ব্যবহার করে ফেলতে হবে। বাটা মসলা ব্যবহারের আগে গন্ধ শুঁকে দেখতে হবে। আদা ও রসুনের রং সবুজ হয়ে গেলে সেসব ব্যবহারে স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দিতে পারে। ডিপ ফ্রিজ থেকে বের করা কোনো খাদ্যের স্বাদ, রং ও গঠন ঠিক না থাকলে সেগুলো ব্যবহার করা যাবে না। আবার ডিপ ফ্রিজে দুধ বা দুধজাতীয় খাদ্য সর্বোচ্চ তিন মাস সংরক্ষণ করা যাবে।
প্রতিবেলায় পাতে যে খাবারটি উঠে আসছে সেটি যেন পুষ্টিগুণে ও স্বাদে অনন্য থাকে সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক হওয়া জরুরি। পারিবারিক সুস্থতার সঙ্গে বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফ্রিজে খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে শিউলি আক্তারের তরফ থেকে রয়েছে আরও কিছু পরামর্শ—
১. দীর্ঘ সময় রান্না করা খাবারের খাদ্যগুণ বজায় রাখতে চাইলে ডিপ থেকে একবার গলিয়ে ফেলা (ডিফ্রস্ট করা) খাবার পুনরায় ডিপ ফ্রিজে রাখা যাবে না। এতে ভীষণ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।
২. ডিপ থেকে বের করা খাবার মাইক্রোওভেনে বা চুলায় গরম করতে গেলে ৭৫-১০০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ২ মিনিট গরম করে নিতে হবে। এতে পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ন থাকবে। প্রতিবেলা যতটুকু খাবার দরকার ততটুকুই গরম করতে হবে। দরকার ছাড়া খাবার গরম করা ঠিক না।
৩. পলিথিন ডিপ ফ্রিজে সংরক্ষিত মাছ-মাংসের সঙ্গে যেমন বিক্রিয়া করে সেই একইভাবে প্লাস্টিক বক্সে খাবার মাইক্রোওভেনে গরম করতে গেলেও একইভাবে বিক্রিয়া হয়। ফলে প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকের বক্স ফ্রিজ ও মাইক্রোওভেনে কোনোভাবেই প্লাস্টিকের বাক্স ব্যবহার করা যাবে না।
আরআর